প্রশ্ন: এক ভাই সরকারি কারিগরি পদে একটি মাত্র শূন্য পদের জন্য আবেদন করেন। বিজ্ঞপ্তিতে ৪ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলেও তাঁর প্রকৃত অভিজ্ঞতা ছিল দেড় থেকে দুই বছর। নিজেকে সক্ষম মনে করে তিনি বাকি সময়ের জন্য ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে আবেদন করেন। প্রাথমিক বাছাই, ব্যবহারিক পরীক্ষা (যেখানে সম্ভবত তিনিই একমাত্র উত্তীর্ণ হন) ও পিএসসি-র সুপারিশের পর তিনি চাকরিতে যোগ দেন। পরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে তৎকালীন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁকে ছুটি না দিয়ে চরম হেনস্তা করেন। বাধ্য হয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে যান। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, তাই সেই সরকারি চাকরি ফিরে পেতে তিনি আবার আবেদন করার কথা ভাবছেন। তাঁর প্রশ্নগুলো হলো:
১. সেই চাকরি ও এর মাধ্যমে অর্জিত আয় কি বৈধ ছিল?
২. বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরি ফিরে পেতে আবেদন করা বা নিয়োগ পাওয়া কি বৈধ হবে?
৩. প্রথমবারের যোগদান বৈধ না হলে এখন তাঁর করণীয় কী?
উত্তর: ভুয়া সনদ বানিয়ে চাকরি নেওয়া ইসলামি শরিয়ত ও দেশের আইন, উভয় দৃষ্টিতেই অবৈধ। কারণ তা ছিল মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত চাকরি। যেহেতু জাল অভিজ্ঞতার সনদ সাবমিট করা হয়েছিল।
❑ ১. চাকরি ও আয় কি বৈধ ছিল?
চাকরি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল হারাম। কারণ নিয়োগ-বিজ্ঞপ্তির মূল শর্ত ছিল ৪ বছরের অভিজ্ঞতা কিন্তু মিথ্যা তথ্য ও জাল সনদ দিয়ে সেই শর্ত পূরণ দেখানো হয়েছে যা স্পষ্ট প্রতারণা।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ»
“তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না এবং জেনেশুনে পাপের মাধ্যমে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা শাসকদের কাছে পেশ কোরো না।” [সূরা বাকারা: ১৮৮]
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
“যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১০১]
তবে বেতনের বিষয়ে দুটি দিক বিবেচ্য:
ক. তিনি যদি বাস্তবেই উক্ত চাকরির প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পন্ন হয়ে থাকেন এবং সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাহলে তার শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বেতনকে পুরোপুরি হারাম বলা যাবে না। কিন্তু যেহেতু নিয়োগের ভিত্তিই ছিলো প্রতারণা (অভিজ্ঞতার জাল সনদ) তাই এই বেতন ‘সন্দেহযুক্ত’।
– অন্যদিকে কাজে অযোগ্যতা বা দায়িত্বে ঘাটতি থাকলে সেই অনুপাতে প্রাপ্ত বেতন হারাম হবে।
ব্যবহারিক পরীক্ষায় একমাত্র তাঁরই উত্তীর্ণ হওয়া তাঁর যোগ্যতার পক্ষে জোরালো ইঙ্গিত। কিন্তু তা আগের প্রতারণার গুনাহ মাফ করে না। সুতরাং প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার কারণে তার জন্য আলাদাভাবে তওবা করা আবশ্যক।
❑ ২. আবার নিয়োগ পেলে কি তা বৈধ হবে?
আগের সরকারের সময় তাকে ছুটি না দেওয়া ও হেনস্তা করা ছিল জুলুম সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু জুলুমের শিকার হওয়ার অজুহাতে নিজের প্রতারণা ও জালিয়াতি হালাল হয়ে যায় না। নতুন আবেদনে আগের জালিয়াতি গোপন করলে বা মিথ্যা তথ্য দিলে সেই নিয়োগও অবৈধ হবে। অবশ্য সব সত্য প্রকাশ করে আবেদন করলে এবং কর্তৃপক্ষ জেনেশুনে নিয়োগ দিলে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। তবে ৪ বছরের শর্ত পূরণ না হওয়া এবং জালিয়াতি ধরা পড়ার বাস্তবতায় নতুন করে চাকরি পাওয়া এবং আইনি ঝুঁকি এড়ানো অত্যন্ত কঠিন। সত্য প্রকাশ করে আবেদন করা সম্ভব না হলে এই চাকরি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা বাদ দেওয়াই নিরাপদ। সত্য ও ন্যায়ের রাস্তা ছেড়ে আবারও মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
❑ ৩. এখন তাঁর করণীয়:
১. নিজের গুনাহ স্বীকার করে আল্লাহর নিকট আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হতে হবে, বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমন কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
২. নতুন কোনো চাকরির আবেদনে আবারও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
৩. কর্মক্ষেত্রে নিজের অযোগ্যতার কারণে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক প্রাপ্য ছিল না বলে আশঙ্কা হয় অনুমানের ভিত্তিতে তার সমপরিমাণ সম্পদ সওয়াবের নিয়ত ছাড়া জনকল্যাণে দান করে দিতে হবে।
৪. এই প্রতারণার কারণে কোনো নির্দিষ্ট যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হয়ে থাকলে সাধ্যমতো তাঁর ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করতে হবে।
৫. নিজের প্রকৃত যোগ্যতা ও সঠিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন কর্মসংস্থানের চেষ্টা করতে হবে। অসৎ উপায়ে অর্জিত অনেক সম্পদের চেয়ে সৎ উপায়ে অর্জিত অল্প রিজিক অনেক বেশি কল্যাণকর।
মনে রাখতে হবে, সনদ জালিয়াতি একদিকে ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ, অন্য দিকে দেশের আইনেও গুরুতর অপরাধ। তাই একজন ইমানদার ব্যক্তির জন্য সব ধরণের শরিয়ত বিরোধী ও আইন বিরোধী কার্যক্রম থেকে নিবৃত থাকা জরুরি। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
──────────────────
◈ ফতওয়া: শাইখ বিন বায (রাহ.)
১. জাল সনদের ভিত্তিতে চাকরি করে প্রাপ্ত বেতনের বিধান:
প্রশ্ন: আমি একজন যুবক। আমার একটি আমেরিকান সেকেন্ডারি সনদ আছে, যা সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়িত। কিন্তু এই পরীক্ষায় আমার পরিবর্তে আমার এক বন্ধু অংশ নিয়েছিল। সনদটি পড়াশোনার জন্য নয়, কেবল সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সত্যায়িত করা হয়েছে। এখন এই চাকরি থেকে যে বেতন পাচ্ছি তার বিধান কী? এই বেতন কি সনদের সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি আমি যে কাজ করছি তার সঙ্গে?
উত্তর: এটি বড় অন্যায়, যা কিছুতেই জায়েজ নয়। এটি স্পষ্ট জালিয়াতি, মিথ্যাচার এবং অবৈধ পন্থায় অর্থ গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত। অন্যের দেওয়া পরীক্ষার সনদ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই বৈধ নয়। তাই আপনার ওপর আবশ্যক, অবিলম্বে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং এই মন্দ কাজ ছেড়ে দেওয়া। চাকরির জন্য নিজের বাস্তব যোগ্যতার ওপর নির্ভর করুন। আপনি কী কাজ করেছেন, কোথায় কেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং কাজে কতটা সফল, এ বিষয়ে যাঁরা জানেন, তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিন। নিজের কাজ, আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে নতুন করে চাকরি খুঁজুন। এই জাল সনদ আর কোথাও জমা দেবেন না। অতীতে যা ঘটেছে, তার জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করুন। তবে আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যদি আপনি যথাযথভাবে পালন করে থাকেন, কোনো খিয়ানত না করে থাকেন এবং কাজের হক পুরোপুরি আদায় করে থাকেন তাহলে কাজের বিনিময়ে যা অর্জিত হয়েছে তা আপনার জন্য বৈধ। তবে যে জালিয়াতি করেছেন, তার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: তাহলে কি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই?
উত্তর: না। তবে তাঁকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।
প্রশ্ন: তিনি কি অতীতে যে বেতন নিয়েছেন তা নিজের কাছে রাখতে পারবেন?
উত্তর: তাঁকে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। আর এই বেতন মূলত তাঁর কাজের বিনিময়েই অর্জিত।
◈ ২. শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
একজন ব্যক্তি একটি শিক্ষাগত সনদের ভিত্তিতে চাকরি করছেন। অথচ ওই সনদের পরীক্ষায় তিনি নকল (প্রতারণা) করেছিলেন। এখন তিনি তাঁর অধীনস্থদের সাক্ষ্য অনুযায়ী কাজটি ভালোভাবেই করছেন। তাঁর বেতনের বিধান কী, হালাল নাকি হারাম?
তিনি উত্তরে বলেন:
لَا حَرَجَ إِنْ شَاءَ اللهُ، عَلَيْهِ التَّوْبَةُ إِلَى اللهِ مِمَّا جَرَى مِنَ الْغِشِّ، وَهُوَ إِذَا كَانَ قَائِمًا بِالْعَمَلِ كَمَا يَنْبَغِي فَلَا حَرَجَ عَلَيْهِ مِنْ جِهَةِ كَسْبِهِ؛ لَكِنَّهُ أَخْطَأَ فِي الْغِشِّ السَّابِقِ، وَعَلَيْهِ التَّوْبَةُ إِلَى اللهِ مِنْ ذَلِكَ».
انْتَهَى مِنْ «مَجْمُوعِ فَتَاوَى ابْنِ بَازٍ» (١٩/٣١)
“ইনশাআল্লাহ কোনো অসুবিধা নেই। অতীতে যে প্রতারণা হয়েছে, তার জন্য তাঁকে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। তিনি যদি কাজটি যথাযথভাবে পালন করে থাকেন তবে তাঁর উপার্জনের দিক থেকে তাঁর ওপর কোনো দোষ নেই। তবে আগের প্রতারণাযর মাধ্যমে তিনি যে অন্যায় কাজ করেছেন এর জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা তাঁর ওপর আবশ্যক।” [মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনি বায, ১৯/৩১]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।