সংক্ষিপ্ত উত্তর: পোস্তদানা খাওয়া মূলত জায়েজ। তবে এর কারণে যদি কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নেশা বা শারীরিক ক্ষতি হয় তবে সে ক্ষেত্রে তা হারাম বলে গণ্য হবে।
নিচে পোস্তদানার পরিচয়, ব্যবহার এবং বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়ার আলোকে তা খাওয়ার বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
❑ ১. পোস্তদানার পরিচিতি:
পোস্তদানা (ইংরেজিতে পপি সিড/poppy seed, আরবিতে খাশখাশ) হলো Papaver somniferum গাছের ছোট ও গোলাকার বীজ। এর রং সাধারণত সাদা, নীলচে-ধূসর বা কালচে হয়ে থাকে এবং এর স্বাদ মৃদু মিষ্টি ও বাদামের মতো। এই বীজ থেকে তেলও নিষ্কাশন করা হয়। মূলত এই গাছের কচি ফলের খোসায় আঁচড় কাটলে যে দুধালো রস নির্গত হয়, তা থেকেই আফিম তৈরি হয়। আফিম মাদকদ্রব্য হওয়ায় সম্পূর্ণ হারাম; কিন্তু বীজ নিজে আফিম নয়।
❑ ২. খাদ্যদ্রব্যে পোস্তদানার নানা ব্যবহার:
আমাদের দেশে বিভিন্ন রান্নায় পোস্তদানার ব্যবহার বেশ প্রচলিত। যেমন:
– পোস্তবাটা বা পোস্তর বড়া তৈরিতে।
– আলু-পোস্ত, ঝিঙে-পোস্তসহ বিভিন্ন তরকারিতে।
– ভর্তা ও মসলার মিশ্রণে খাবারের স্বাদ ও ঘনত্ব বাড়াতে।
– নানা রকম চকলেট, মিষ্টান্ন ও পিঠার পুর হিসেবে।
– রুটি, নান ও বিভিন্ন বেকারি পণ্যের ওপর ছিটিয়ে দিতে।
উল্লেখ্য, রান্নাবান্নায় ব্যবহৃত এই পোস্তদানা সাধারণত আমদানি করা হয়ে থাকে। কিছু দেশে এর আমদানি বা সঙ্গে রাখা নিয়ন্ত্রিত কিংবা নিষিদ্ধ।
❑ ৩. ইসলাম কিউএ-র প্রশ্নোত্তর:
প্রশ্ন: আমি পপি সিডের বিষয়ে জানতে চাই। এই বীজ পেস্ট্রি ও মিষ্টান্নে সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং কুয়েতের আটা-ময়দার মিলগুলোতেও পাওয়া যায়। এটি খাওয়া কি জায়েজ? কারণ অনেক রেসিপির উপকরণে পপি সিডের উল্লেখ থাকে।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর। অতঃপর:
পপি সিড হলো খাশখাশ গাছের বীজ। পেস্ট্রি ও অন্যান্য খাবারে এর ব্যবহার মূলত বৈধ, যতক্ষণ না এর কোনো ক্ষতিকর দিক প্রমাণিত হয় অথবা বেশি পরিমাণে খাওয়ার কারণে নেশার সৃষ্টি করে। যদি এমনটি ঘটে তবে তা হারাম হবে। বিখ্যাত ফিকাহ বিশ্বকোষ “আল-মাউসুআতুল আরাবিয়্যাতুল আলামিয়্যা” (Global Arabic Encyclopedia)-তে বলা হয়েছে:
«وَلَيْسَ لِبُذُورِ الْخَشْخَاشِ – وَهِيَ عَادَةً دَقِيقَةٌ – خَصَائِصُ مُخَدِّرَةٌ، وَتُبَاعُ طَعَامًا لِلطُّيُورِ، كَمَا أَنَّهَا تُنْتِجُ زَيْتًا يُسْتَخْدَمُ فِي إِعْدَادِ بَعْضِ الْأَطْعِمَةِ لِلِاسْتِهْلَاكِ الْبَشَرِيِّ. وَتُعَدُّ الْقِشْرَةُ الصُّلْبَةُ الْمُتَبَقِّيَةُ مِنْ عَصْرِ الزَّيْتِ غِذَاءً جَيِّدًا لِلْأَبْقَارِ. وَتُسْتَخْدَمُ بُذُورُ الْخَشْخَاشِ أَيْضًا مَادَّةً مُنَكِّهَةً، وَيُمْكِنُ نَثْرُهَا عَلَى الْخُبْزِ وَالرَّغِيفِ أَوْ تُسْتَخْدَمُ لِحَشْوِ الْكَعْكِ… وَيَأْتِي الْأَفْيُونُ مِنْ أَغْلِفَةٍ يَانِعَةٍ فِي نَبْتَةِ الْخَشْخَاشِ حَيْثُ تَنْمُو الْبُذُورُ. وَلِلْحُصُولِ عَلَيْهِ، يَقُومُ الْعَامِلُونَ بِخَدْشِ الْأَغْلِفَةِ فِي أَوَاخِرِ النَّهَارِ وَتُتْرَكُ الْعُصَارَةُ اللَّبَنِيَّةُ الَّتِي تَنِزُّ مِنَ الْأَغْلِفَةِ طَوَالَ اللَّيْلِ، لِتَجْمُدَ قَبْلَ أَنْ يَتِمَّ جَنْيُهَا فِي الْيَوْمِ التَّالِي».
“খাশখাশের বীজ সাধারণত অতি ক্ষুদ্র হয় এবং এর কোনো নেশাকারক বৈশিষ্ট্য নেই। এটি পাখির খাদ্য হিসেবে বিক্রি হয়। এ থেকে তেলও পাওয়া যায়, যা মানুষের খাওয়ার উপযোগী নানা খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। তেল নিংড়ানোর পর যে শক্ত খোসা অবশিষ্ট থাকে, তা গরুর জন্য চমৎকার খাদ্য। খাশখাশের বীজ স্বাদবর্ধক উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়; রুটি ও পাউরুটির ওপর তা ছিটিয়ে দেওয়া যায় অথবা কেকের ভেতরে পুর হিসেবে ব্যবহার করা হয়…
অন্যদিকে, আফিম আসে খাশখাশ গাছের কচি ফলের খোসা থেকে, যেখানে বীজ জন্মায়। আফিম সংগ্রহের জন্য শ্রমিকেরা দিনের শেষভাগে ফলের খোসায় আঁচড় কাটে। খোসা থেকে যে দুধালো রস বের হয়, তা সারা রাত রেখে দেওয়া হয় জমে যাওয়ার জন্য এবং পরদিন তা সংগ্রহ করা হয়।” [প্রশ্ন নম্বর: ১৩২১৫৭ তারিখ: ০৯ জুমাদাল উলা ১৪৩০ হিজরি, মোতাবেক ০৪ মে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ]
আফিম সম্পূর্ণ হারাম। কারণ তা ক্ষতিকর, বুদ্ধিবিনাশকারী এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, পূজার বেদি ও ভাগ্য-নির্ধারক তির তো কেবল ঘৃণিত শয়তানি কাজ। অতএব তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” [সূরা মায়িদা: ৯০]
এখানে “খামর” (الخمر) শব্দের মূল অর্থ হলো বুদ্ধি আচ্ছন্নকারী বস্তু। তাই নেশা সৃষ্টিকারী সব বস্তুই এর অন্তর্ভুক্ত।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
“প্রত্যেক নেশাকারক বস্তুই খামর (মদ) এবং প্রত্যেক নেশাকারক বস্তুই হারাম।” [সহিহ মুসলিম: ২০০৩]
আরেক হাদিসে নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ
“যার বেশি পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।” [সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৮১; জামে তিরমিজি: ১৮৬৫; আলবানি সহিহ বলেছেন]
সুতরাং আফিম বা যেকোনো মাদকদ্রব্য, যা নেশা সৃষ্টি করে, তা কুরআন ও সুন্নাহর দলিলে হারাম। তবে এই মাদক বীজ থেকে তৈরি হয় না বরং গাছের কচি খোসা থেকে সংগৃহীত হয়, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
মিশরের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে যে বীজ নিজে নেশাকারক নয়। তবে গাছের টিস্যু থেকে মাদকদ্রব্য নিষ্কাশনের সময় বীজ দূষিত হতে পারে। তাই খাদ্যে ব্যবহারের আগে তা ধুয়ে ও ভেজে নেওয়া হয়। কেউ যদি বেশি পরিমাণ বা অনির্ভরযোগ্য উৎস নিয়ে আশঙ্কা করে, তবে সতর্কতা অবলম্বন করাই উত্তম। কারণ ক্ষতি বা নেশা সৃষ্টি হলে হুকুম হারামে পরিবর্তিত হয়ে যায়।
মোটকথা, এই বীজ ব্যবহার ও বিক্রি করা জায়েজ। তবে যদি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে এটি খেলে নেশা বা শরীরের ক্ষতি হয় কেবল তখনই তা হারাম বলে গণ্য হবে। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।