বারবার সংঘটিত গুনাহ থেকে তওবার বিধান

প্রশ্ন: এক বোন জানতে চেয়েছেন: শাইখ, শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন এক নারীর বিধান জানতে চাই, যিনি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, আর কখনো গুনাহ করবেন না। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ওয়াদা ভেঙে তিনি পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হন। এরপর তিনি আবারও আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এ ধরনের তওবা কি আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, মানুষ যদি তওবা করে তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে—চাই সেই গুনাহ বারবারই সংঘটিত হয়ে থাকুক না কেন। মানুষ যদি গুনাহ করার পর তওবা করে, আবার গুনাহে লিপ্ত হয়ে পুনরায় তওবা করে—যখনই সে তার তওবায় সত্যনিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ হবে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন।
❑ তওবাতুন নাসূহ (একনিষ্ঠ তওবা)-এর শর্ত হলো:
১. অতীতের গুনাহের জন্য অন্তরে অনুশোচনা ও অনুতাপ থাকা।
২. ভবিষ্যতে তা পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
৩. আল্লাহর ভয় ও তাঁর মহত্ত্বের প্রতি সম্মান রেখে সেই গুনাহ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।
এভাবে তওবা করলে তা অবশ্যই শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা সে পূর্বে যতবারই একই গুনাহ করে তওবা করে থাকুক না কেন। কেননা মানুষ (গুনাহে পতিত হওয়ার) ঝুঁকিপ্রবণ সত্তা—সে হয়তো কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়বে, এরপর তওবা করবে; আবার প্রলোভনে পড়ে গুনাহ করে পুনরায় অনুতপ্ত হয়ে তওবা করবে। যেমন: কেউ হয়তো ব্যভিচারের মতো পাপে জড়িয়ে পড়ার পর আল্লাহর কাছে তওবা করল, কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সেই পরীক্ষায় পতিত হয়ে গুনাহ করে ফেলল এবং পুনরায় তওবা করল—সত্যিকার অর্থে তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। মদ্যপান, গীবত বা অন্য যেকোনো গুনাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সারকথা হলো, তওবা যদি বারবারও করতে হয় এবং তাতে যদি আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠতা থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা কবুল করেন। এ বিষয়ে সহীহ হাদিসসমূহ প্রমাণিত রয়েছে এবং পবিত্র কুরআনও এর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
✪ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“আর হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” [সূরা নূর: ৩১]
✪ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও ইরশাদ করেন:
أَفَلا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ
“তবুও কি তারা আল্লাহর কাছে তওবা করবে না এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না?” [সূরা মায়েদাহ: ৭৪]
✪ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ তওবা করো।” [সূরা তাহরীম: ৮]
✪ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার বিষয়ে বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ جَلَّ وَعَلَا يَقُولُ لِعَبْدِهِ: إِذَا أَذْنَبَ عَبْدِي ثُمَّ اسْتَغْفَرَنِي غَفَرْتُ ذُنُوبَهُ، ثُمَّ عَادَ فَاسْتَغْفَرَنِي غَفَرْتُ لَهُ»
“আমার বান্দা গুনাহ করার পর যখন আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিই। এরপর সে যদি পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হয়ে আবার আমার কাছে ক্ষমা চায়, আমি আবারও তাকে ক্ষমা করে দিই।” [সহীহ বুখারী: ৭৫০৭; সহীহ মুসলিম: ২৭৫৮]
সুতরাং তওবায় যদি আন্তরিকতা ও সততা থাকে, তবে তা বারবার হওয়াটা কোনো বাধা নয়।
তবে তওবা নিয়ে প্রতারণা বা ভণ্ডামি করা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। যদি মুখে তওবার কথা বলে অন্তরে গুনাহ ত্যাগের সত্যিকারের ইচ্ছা না থাকে, তবে তা এক মহা মুনকার ও মারাত্মক বিপদের কারণ। কিন্তু বান্দা যদি প্রকৃতপক্ষে সত্যনিষ্ঠ হয়—অর্থাৎ আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে গুনাহ ছেড়ে দেয় কিন্তু পরবর্তীতে দুর্বলতার কারণে পুনরায় সেই পাপে জড়িয়ে পড়ার পর আবারও খাঁটি মনে তওবা করে তা বর্জন করে—তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অবশ্যই তার তওবা কবুল করবেন।
উপস্থাপক: শাইখ, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতোয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহ.)। (সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।
Share: