প্রশ্ন: বারবার কবিরা গুনাহ হয়ে গেলে করণীয় কী? আর তওবা করব করব বলে করা হয় না; বিলম্ব হয়ে যায়—এমন অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর: একই গুনাহ তওবা করার পর আবারো ঘটে গেলে প্রতিবারই নতুন করে তওবা করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, তওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু মূল শর্ত রয়েছে, যা পূরণ করা আবশ্যক।
❑ তওবার শর্তাবলী:
১. যে গুনাহ থেকে তওবা করা হচ্ছে তা পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা এবং যে কারণে সেই গুনাহে লিপ্ত হতে হয় তা থেকে নিজেকে পুরোপুরি নিবৃত্ত রাখা।
২. অতীতে ঘটে যাওয়া পাপাচারের জন্য অন্তরে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় পুনরায় সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার করা।
৪. কোনও মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করা হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়া বা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সমঝোতা করা। উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে না পেলে তার নামে সেই সম্পদ বা সমপরিমাণ অর্থ আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দেওয়া।
এই শর্তগুলো পূরণ না করে শুধু মুখে মুখে তওবা করলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।
❑ আবারও পাপকর্ম ঘটে গেলে:
শয়তানের প্ররোচনায় বা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় এভাবে শর্ত মেনে তওবা করার পরেও যদি আবারো পাপ সংঘটিত হয়ে যায় তবুও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং আবারো লজ্জিত অন্তরে তওবা করতে হবে। কারণ আল্লাহ ছাড়া পাপ ক্ষমা করার আর কেউ নেই।
মূলতঃ তওবা দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত তওবা করার সুযোগ আছে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার পূর্বে তওবা করবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।” [সহিহ মুসলিম: ২৭০৩]
অন্য হাদিসে এসেছে,
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ العَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয় (মৃত্যুর গড়গড়া শুরু হয়)।” [সুনান তিরমিজি, সহীহুল জামে: ১৯০৩]
বুখারি ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে হাদিসে কুদসিতে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
«أَذْنَبَ عَبْدٌ ذَنْبًا، فَقَالَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ. ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ، فَقَالَ: أَيْ رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: عَبْدِي أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ. ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ، اعْمَلْ مَا شِئْتَ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكَ».
“এক বান্দা গুনাহ করার পর বলল: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ তখন মহান আল্লাহ বলেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে, আবার সে জেনেছে ও বিশ্বাস রেখেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন।’
এরপর সে পুনরায় গুনাহ করে বসল এবং বলল: ‘হে আমার রব! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বললেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং জেনেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দেন।’
এরপর সে আবারও গুনাহ করল এবং বলল: ‘হে আমার রব! আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বললেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জেনেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। (যেহেতু সে অনুতপ্ত হয়ে বারবার আমার কাছেই ফিরে আসছে) তুমি যা ইচ্ছা আমল করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।'”
[সহীহ বুখারী: ৭৫০৭, সহীহ মুসলিম: ২৭৫৮]
মহান আল্লাহ তওবা কুবলের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং দান-সদকা গ্রহণ করেন।” [সূরা তাওবাহ: ১০৪]
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন,
اللَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلاَةٍ، فَانْبَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ…”
“তোমাদের কেউ মরুভূমিতে তার সওয়ারি হারিয়ে ফেলার পর (এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নিরাশ হয়ে পড়ার পর) তা ফিরে পেলে যতটা আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন—যখন সে তাঁর কাছে তওবা করে।” [সহীহ মুসলিম]
❑ পাপ করার পর তওবায় বিলম্ব করা আরেকটি পাপ:
পাপ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই তওবা করা আমাদের ওপর ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে তওবায় বিলম্ব করা আরেকটি স্বতন্ত্র পাপ যার জন্য পৃথকভাবে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা জরুরি।
তওবার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে অনতিবিলম্বে তওবার কথা বলেছেন:
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
“অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে এবং অনতিবিলম্বে তওবা করে। সুতরাং আল্লাহ এদের তওবা কবুল করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা: ১৭]
তওবা করার পরে যদি আবারও একই গুনাহের পূণাবৃত্তি ঘটে তাহলে পুনরায় তওবা করতে হবে—তা যতবারই হোক না কেন। কারণ শয়তানের মূল লক্ষ্যই থাকে মানুষকে হতাশ করে তওবার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।অথচ আল্লাহ বান্দাকে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি (পাপ) করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেন।” [সূরা যুমার: ৫৩]
মনে রাখতে হবে যে, পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমতের কাছে তা অত্যন্ত ছোট। দয়াময় আল্লাহ অতিশয় দয়ালু এবং পরম ক্ষমাশীল ।
তাছাড়া আমরা যদি পরে তওবা করব বলে তওবায় বিলম্ব করি বা অলসতা করি তাহলে এমনও হতে পারে যে, তার আগেই মৃত্যু দূত এসে হাজির হবে, হতে পারে স্বাভাবিক মৃত্যু অথবা দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মৃত্যু। তখন পাপের বোঝা কাঁধে নিয়েই হাশরের ময়দানে উঠে দাঁড়াতে হবে। তাই অনতিবিলম্বে তওবা করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা অপরিহার্য। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
◈ সংক্ষেপে যা করণীয়:
১. গুনাহ হওয়ার সাথে সাথে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা আবশ্যক। ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা জায়েজ নেই। অন্যথায় এটি স্বতন্ত্র গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে যার জন্য আলাদা ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা আবশ্যক।
২. যে পরিবেশ বা সঙ্গ মানুষের ভেতরে পাপে জড়ানোর সুযোগ তৈরি করে, তা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা আবশ্যক। পাপ প্রবণ পরিবেশ ছেড়ে যথাসম্ভব দ্রুত এমন স্থানে গিয়ে বসবাস করা উচিত, যেখানে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও ভালো মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি, যেসব মাধ্যম বা উপকরণের কারণে পাপে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়—সেগুলো বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলে কিংবা পুরোপুরি বিনষ্ট করে নিজেকে মুক্ত রাখা জরুরি।
৩. বেশি বেশি নেক আমল কররা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
– اتَّقِ اللهَ حيثُما كنتَ ، وأتبِعِ السَّيِّئةَ الحسَنةَ تَمْحُهَا ، وخالِقِ النَّاسَ بخُلُقٍ حَسنٍ
“তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করো যা মন্দকে মুছে দেবে এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।” [জামে তিরমিজি: ১৯৮৭, সহিহুত তারগিব ২৬৫৫]
৪. সৎ ও দ্বীনদার মানুষের সাথে ওঠবস রাখুন। আল্লাহর রহমতে তারা আপনাকে পাপাচার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে।
৫. আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখুন। নিরাশ হবেন না। আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা ও সুধারণা রাখা ইমানের দাবী। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাপাচার থেকে হেফাজত করুন এবং পাপাচার ঘটে গেলে অনতিবিলম্বে তওবা করে নিজেকে সংশোধন করার এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।