রোগব্যাধিতে ইমানদারের করণীয়

রোগব্যাধি মানব জীবনের একটি স্বাভাবিক বিষয়। অসুস্থ না হলে আমরা সুস্থতার নিয়ামত সম্পর্কে বুঝতে পারতাম না। অসুখ আমাদের জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়। অসুস্থতা মুমিন ব্যক্তির জন্য কল্যাণের বার্তা বয়ে আনে যদি সে এ বিষয়ে ইসলামের সঠিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারে। নিম্নে রোগব্যাধিতে একজন মুমিনের করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. রোগাক্রান্ত ব্যক্তির এ বিশ্বাস পোষণ করা কর্তব্য যে, রোগব্যাধিতে একমাত্র আরোগ্য দানকারী মহান আল্লাহ। তিনি ছাড়া অন্য কেউ রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
“(ইবরাহিম (আ.) বললেন) যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।” [সূরা শুয়ারা: ৮০]
ওষুধ-পথ্য কেবল মাধ্যম। মহান আল্লাহই এ সব ওষুধে রোগমুক্তির কার্যকারিতা দান করেছেন। ওষুধকেই মূল আরোগ্য দানকারী মনে করা শিরক। অনুরূপভাবে, অসুখ-বিসুখে তথাকথিত অলি-আউলিয়ার মাজারে ধর্না দেওয়া, মাজারে মানত করা, গণক ও ঠাকুরের শরণাপন্ন হওয়া ইত্যাদি হারাম এবং ইমান বিধ্বংসী শিরকি কাজ। সুতরাং এসব কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
২. আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করা: রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলে মুমিনের কর্তব্য, সবর বা ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। এ কারণে হাহুতাশ বা বেশি অস্থিরতা প্রকাশ করা সবর পরিপন্থী। কারণ রোগব্যাধি আল্লাহর তকদিরের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং অসুখ-বিসুখ সহ জীবনের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, বিপদাপদে আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং সবর করা ইমানের দাবী।
সবরের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
“‘আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন'” [সূরা আনফাল: ৪৬]
তিনি আরও বলেন:
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই।'” [সূরা জুমার: ১০]
সবরের পরিচয় হল:
✪ মনঃক্ষুণ্ণ না হওয়া এবং অতিরিক্ত হা-হুতাশ, কান্নাকাটি, অস্থিরতা ও বিরক্তি প্রকাশ করা না করা।
✪ মানুষের কাছে রোগব্যাধির ব্যাপারে অতিরিক্ত অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকা।
✪ এমন সব কথা ও আচরণ থেকে দূরে থাকা যা ধৈর্য হীনতার পরিচয় বহন করে।
৩. শরিয়ত সম্মত পন্থায় চিকিৎসা করা: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন: উসামা ইবনে শারিক রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে:
أَتَتْهُ أَعْرَابٌ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَتَدَاوَى قَالَ نَعَمْ يَا عِبَادَ اللَّهِ تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ شِفَاءً -أَوْ قَالَ دَوَاءً- إِلَّا دَاءً وَاحِدًا قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُوَ قَالَ الْهَرَمُ
“একবার কিছু বেদুঈন রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রসুল! আমরা কি চিকিৎসা গ্রহণ করব?’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। কারণ মহান আল্লাহ এমন কোনও রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার বা ওষুধ তিনি সৃষ্টি করেননি, কেবল একটি রোগ ব্যতীত।’
তারা জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রসুল! সেটি কী?’
তিনি বললেন, ‘বার্ধক্য’।” [সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮, সহিহুল জামে, ৭৯৩৪]
তবে সর্ব প্রকার তাবিজ, কবজ, রিং, সুতা, বালা, আংটি, শরীরে গাছ-গাছালি ঝুলিয়ে রাখা ইত্যাদি অবশ্যই বর্জনীয়। কারণ এগুলো শরিয়ত সম্মত নয় বরং কখনো কখনো তা শিরকও হতে পারে।
৪. এ বিশ্বাস রাখা যে, অসুখ হলে আল্লাহ তায়ালা ইমানদারের গুনাহ মোচন করেন এবং তাঁর নিকট তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
সহিহ মুসলিম প্রখ্যাত সাহাবি সুহাইব ইবনে সিনান রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের বিষয়টা বড়ই অদ্ভুত! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।” [সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯]
৫. রোগ-ব্যাধিতে বেশি বেশি আল্লাহর নিকট তওবা করা এবং সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি দোয়া করা। সুস্থ অবস্থায় মানুষ আল্লাহর এই নিয়ামত সম্পর্কে গাফেল থাকে। তাই অসুস্থ হলে তার সামনে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি নিজের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর নিকট তওবা করার এবং তার নিকট দোয়া ও আরাধনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তাই এ অবস্থায় বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার, দোয়া, জিকির এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার মাধ্যমে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এ সুযোগকে হাতছাড়া করা উচিত নয়।
৬. রোগশোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কামনা করাও নিষেধ আত্মহত্যা তো অনেক দূরের কথা।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ لِضُرٍّ نَزَلَ بِهِ، فَإِنْ كَانَ لَا بُدَّ فَاعِلًا، فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الۡوَفَاةُ خَيْرًا لِي
“তোমাদের কেউ যেন কোনও বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা না করে। আর যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে তার মৃত্যু কামনা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে: ‘হে আল্লাহ! আমাকে ততদিন বাঁচিয়ে রাখুন যতদিন বেঁচে থাকা আমার জন্য কল্যাণকর হয়, আর আমাকে তখন মৃত্যু দান করুন যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হয়।'” [সহিহ বুখারী: ৫৬৭১, সহিহ মুসলিম: ২৬৮০]
৭. হুঁশ থাকা অবস্থায় শরিয়ত সম্মত ওজর ছাড়া নামাজ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নাই। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) কে বলেন:
صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ
“তুমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো, যদি না পারো তবে বসে আর যদি তাও না পারো তবে শুয়ে ইশারায় পড়ো।” [সহিহ বুখারি: ১১১৭]
কিবলার দিকে মুখ করা সম্ভব না হলে যেদিকে সুবিধা হয় সেদিকে মুখ করেই সালাত আদায় করবে। মাটিতে বসা সম্ভব না হলে, চেয়ারে বা খাটে পা ঝুলিয়ে বসে সালাত আদায় করবে।
৮. ওজু করতে অক্ষম হলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا
“…যদি তোমরা পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও।” [সূরা মায়েদা: ৬]
প্রখ্যাত সাহাবি আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তায়াম্মুমের সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে বলেছেন:
إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيكَ هَكَذَا، فَضَرَبَ بِيَدَيْهِ الْأَرْضَ، ثُمَّ نَفَخَ فِيهِمَا، ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ
“তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল।” এই বলে তিনি তাঁর দুই হাত মাটিতে আঘাত করলেন। তারপর তাতে ফুঁ দিলেন এবং তা দিয়ে তাঁর মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসহ করলেন। [সহীহ বুখারী: ৩৩৮, সহীহ মুসলিম: ৩৬৮]
ওজু করার ক্ষেত্রে ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা সম্ভব না হলে গরম পানি ব্যবহার করবে। নিজে পানি ঢেলে ওজু করতে না পারলে অন্য কেউ পানি ঢেলে দিবে বা ওজু করতে সাহায্য করবে। নিজে তায়াম্মুম করতে না পারলে অন্য কেউ পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিয়ে দিবে।
৯. অসুস্থতার কারণে রোজা রাখা সম্ভব না হলে বা কষ্টসাধ্য হলে পরবর্তীতে কাজা করে নিবে।
মোটকথা, আল্লাহ তাআলা বান্দা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করবে এবং এ অবস্থায় সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করবে।
পরিশেষে দুআ করি, মহান আল্লাহ তায়ালা যেন পৃথিবীর সকল রোগাক্রান্ত মানুষকে সুস্থতা দান করেন এবং দুঃখ, কষ্ট ও দুর্দশায় নিপতিত প্রতিটি মানুষকে সাহায্য করেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: