মেহেদির রং নারীর জন্য আর সুগন্ধি পুরুষের জন্য এবং নারীদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার কখন জায়েজ আর কখন জায়েজ নয়

সাধারণত নারীদের জন্য সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে মেহেদি-রঙ ব্যবহার এবং পুরুষদের জন্য আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা বৈধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهُ وَخَفِيَ لَوْنُهُ، وَطِيبُ النِّسَاءِ مَا ظَهَرَ لَوْنُهُ وَخَفِيَ رِيحُهُ»
“পুরুষের সুগন্ধি এমন হবে, যার ঘ্রাণ পাওয়া যাবে কিন্তু রং চোখে পড়বে না। আর নারীর সুগন্ধি এমন হবে, যার রং চোখে পড়বে কিন্তু ঘ্রাণ পাওয়া যাবে না।” [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২৭৮৮—হাসান সহিহ]
অর্থাৎ পুরুষ এমন খুশবু ব্যবহার করবে যেটা সুগন্ধি ছড়াবে কিন্তু তার রঙ থাকবে না। আর নারী এমন জিনিস ব্যবহার করবে যার রঙ থাকবে কিন্তু তা থেকে সুগদ্ধি ছড়াবে না।
এই হাদিস থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, সৌন্দর্যবর্ধন ও রঙের মাধ্যমে নিজেকে সাজানো নারীদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আর সুগন্ধি ছড়িয়ে দেওয়া পুরুষদের বৈশিষ্ট্য। তবে পুরুষগণ সাদা চুল ও দাড়িতে মেহেদি ব্যবহার করতে পারে। অনুরূপভাবে চিকিৎসার প্রয়োজনেও শরীরের যে কোনো স্থানে মেহেদি ব্যবহার অনুমোদিত।
❑ মহিলাদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার কখন বৈধ নয়:
কোনো নারী যদি এই উদ্দেশ্যে সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে বের হয় যে, পরপুরুষরা তার সুগন্ধ পাবে—তাহলে তা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا اسْتَعْطَرَتْ الْمَرْأَةُ فَمَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ كَذَا وَكَذَا» قَالَ قَوْلًا شَدِيدًا – يَعْنِي: زَانِيَةً
“যখন কোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো লোকদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, যাতে তারা তার সুগন্ধ পায় তখন সে এমন এমন…।” এখানে তিনি কঠোর একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—অর্থাৎ জিনা কারিনী। [আবু দাউদ (৪১৭৩), তিরমিজি (২৭৮৬)। শাইখ আলবানি (রহ.) ‘সহিহ তিরমিজি’-তে হাদিসটিকে সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন]
মুনাবি (রহ.) ‘ফাইদুল কাদির’ গ্রন্থে (১/৩৫৫) বলেন:
“’জিনা কারিনী’ বলার কারণ হলো, জিনার উপলক্ষে সে নিজেকে উন্মুক্ত করে ফেলে, জিনার উপকরণ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়, জিনার আহ্বানকারিনী হয়ে ওঠে—এ জন্যই রূপকার্থে তাকে ‘জিনা কারিনী’ বলা হয়েছে। কখনো কখনো কামপ্রবৃত্তি প্রবল হয়ে প্রকৃতপক্ষেই জিনা সংঘটিত হয়ে যেতে পারে।”
আর পুরুষদের পাশ দিয়ে তার অতিক্রম করার মতোই হলো, লোকজন চলাচল করে এমন পথে আতর-সুগন্ধি মেখে বসে থাকা যাতে লোকজন তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুগন্ধ পায়।” (সংক্ষেপে)
এ সংক্রান্ত একাধিক হাদিস রয়েছে।
❑ মহিলাদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার কখন বৈধ:
যদি কোনো মহিলা তার স্বামী বা মাহরাম পুরুষ কিংবা কেবল মহিলা অঙ্গনে থাকে অথবা প্রয়োজনে বাইরে গেলেও পরপুরুষরা তার ব্যবহৃত সুগন্ধির ঘ্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে (যেমন: নিজস্ব গাড়িতে গিয়ে মহিলা মাদরাসা, স্কুল-কলেজ বা মহিলাদের মজলিস ইত্যাদি পরপুরুষ মুক্ত স্থান গমন অথবা পরপুরুষ চলাচল করে না এমন রাস্তা দিয়ে গমনাগমন) তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ।
উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«كُنَّا نَخْرُجُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى مَكَّةَ، فَنُضَمِّدُ جِبَاهَنَا بِالسُّكِّ الْمُطَيَّبِ عِنْدَ الْإِحْرَامِ، فَإِذَا عَرِقَتْ إِحْدَانَا سَالَ عَلَى وَجْهِهَا، فَيَرَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَا يَنْهَاهَا»
“আমরা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হতাম তখন ইহরাম বাঁধার সময় আমরা আমাদের কপালে সুগন্ধিমিশ্রিত মিশক (এক প্রকার সুগন্ধি) লাগিয়ে নিতাম। অতঃপর আমাদের কারো ঘাম হলে তা তার মুখমণ্ডলে গড়িয়ে পড়ত আর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা দেখতেন। কিন্তু তাকে নিষেধ করতেন না।” [আবু দাউদ (১৮৩০)। নববি (রহ.) ‘আল মাজমু’-তে (৭/২১৯) হাদিসটিকে হাসান এবং আলবানি (রহ.) সহিহ আবু দাউদ-এ সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন]
তৎকালীন সময়ে মহিলা মুসলিম নারীগণ যখন সফর করতেন তখন পরপুরুষদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকতেন। তারা উটের পিঠে ঢাকা আসনে (হাওদা) পর্দা করে চলতেন। ফলে পরপুরুষের সামনে পড়ার বা তাদের সাথে মেলামেশার কোনো সুযোগ ছিল না।
✪ শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.) ‘মাজমুউল ফাতাওয়া’-তে (১০/৪০) বলেন:
يَجُوزُ لَهَا الطِّيبُ إِذَا كَانَ خُرُوجُهَا إِلَى مَجْمَعٍ نِسَائِيٍّ لَا تَمُرُّ فِي الطَّرِيقِ عَلَى الرِّجَالِ
“যদি সে কোনো মহিলাদের অনুষ্ঠানে যায় এবং পুরুষদের নিকট দিয়ে না যাতায়াত না করে তাহলে তার জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ।”
✪ শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর ‘জালাসাত রমাদানিয়্যাহ বা রমজানের আসর’ (১৪১৫ হিজরি সন, পঞ্চম মজলিস, পরিবার সংক্রান্ত প্রশ্নাবলি) গ্রন্থে এসেছে:
أَمَّا إِذَا كَانَتِ الْمَرْأَةُ سَتَرْكَبُ فِي السَّيَّارَةِ وَلَا يَظْهَرُ رِيحُهَا إِلَّا لِمَنْ يَحِلُّ لَهُ أَنْ تَظْهَرَ الرِّيحُ عِنْدَهُ، وَسَتَنْزِلُ فَوْرًا إِلَى مَحَلِّ عَمَلِهَا بِدُونِ أَنْ يَكُونَ هُنَاكَ رِجَالٌ حَوْلَهَا، فَهَذَا لَا بَأْسَ بِهِ، لِأَنَّهُ لَيْسَ فِي هَذَا مَحْذُورٌ، فَهِيَ فِي سَيَّارَتِهَا كَأَنَّهَا فِي بَيْتِهَا، أَمَّا إِذَا كَانَتْ سَتَمُرُّ إِلَى جَانِبِ الرِّجَالِ فَلَا يَحِلُّ لَهَا أَنْ تَتَطَيَّبَ
“তবে যদি কোনো মহিলা গাড়িতে চড়ে যায় আর তার সুগন্ধির ঘ্রাণ শুধু তাদের কাছেই পৌঁছায় যাদের জন্য তা জায়েজ (যেমন: নারী অঙ্গন, স্বামী, পূত্র, পিতা, দাদা চাচা প্রমূখ), এবং সে সরাসরি তার কর্মস্থলে নেমে যায় যেখানে তার আশেপাশে কোনো (নন মাহরাম) পুরুষ থাকে না—তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা এতে কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নেই। গাড়িতে থাকা অবস্থায় সে যেন তার নিজের ঘরেই আছে। কিন্তু যদি তাকে পুরুষদের পাশ দিয়ে যেতে হয় তাহলে তার জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ নয়।” আল্লাহ তাআলা যেন আমাদেরকে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে জীবনযাপনের তাওফিক দান করেন এবং সব ধরণের নাফরমানি ও পাপকর্ম থেকে হেফাজত করেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: