তাসয়ীর ও তাখয়ীর: মানুষ কি তাকদির বা নিয়তির দ্বারা বাধ্য, নাকি স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী?
এটি আকিদার অন্যতম একটি জটিল মাসআলা যে বিষয়ে সঠিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়ে অনেক মানুষ গোমরাহ হয়েছে। তাই সতর্কতার সাথে এ বিষয়টি বুঝা প্রয়োজন। নিম্নে সৌদি আরবের ফতওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির একটি ফতওয়া এবং এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসামিন (রাহ.)-এর একটি ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো। আশা করি, এর মাধ্যমে এ বিষয়ে আমাদের কাছে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ-এর সঠিক ও মধ্যপন্থী অবস্থান প্রস্ফুটিত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফিক দানকারী।
❑ ১. স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়া:
সৌদি আরবের ফতওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফাতাওয়ায় (৩/৫১৬) বলা হয়েছে:
আমাকে সংক্ষেপে ‘তাসয়ীর ও তাখয়ীর’ বিষয়টি বুঝিয়ে দিন।
উত্তর:
إِنَّ الْإِنْسَانَ مُخَيَّرٌ وَمُسَيَّرٌ، أَمَّا كَوْنُهُ مُخَيَّراً فَلأَنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ أَعْطَاهُ عَقْلاً وَسَمْعاً وَبَصֲراً وَإِرَادَةً فَهُوَ يَعْرِفُ بِذَلِكَ الْخَيْرَ مِنَ الشَّرِّ، وَالنَّافِعَ مِنَ الضَّارِّ وَيَخْتَارُ مَا يُنَاسِبُهُ، وَبِذَلِكَ تَعَلَّقَتْ بِهِ التَّكَالِيفُ مِنَ الْأَمْرِ وَالنَّهْيِ، وَاسْتَحَقَّ الثَّوَابَ عَلَى طَاعَةِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَالْعِقَابَ عَلَى مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ.
وَأَمَّا كَوْنُهُ مُسَيَّراً فَلِأَنَّهُ لَا يَخْرُجُ بِأَفْعَالِهِ وَأَقْوَالِهِ عَنْ قَدَرِ اللَّهِ وَمَشِيَّتِهِ، كَمَا قَالَ سُبْحَانَهُ: ( مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ )، وَقَالَ سُبْحَانَهُ: ( لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ . وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ )، وَقَالَ سُبْحَانَهُ: ( هُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ) الْآيَةَ.
وَفِي الْبَابِ آيَاتٌ كَثِيرَةٌ وَأَحَادِيثُ صَحِيحَةٌ كُلُّهَا تَدُلُّ عَلَى مَا ذَكَرْنَا لِمَنْ تَأَمَّلَ الْكِتَابَ وَالسُّنَّةَ.
وَبِاللَّهِ التَّوْفِيقُ وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ، وَآلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ
“মানুষ একই সাথে স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন (মুখাইয়ার) এবং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির বা নিয়তির অধীন (মুসাইয়ার)।
– স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন হওয়ার কারণ হল, আল্লাহ সুবহানাহু মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন। এর মাধ্যমেই সে ভালো-মন্দ এবং উপকারী-ক্ষতিকর বিষয়গুলো অনুধাবন করে নিজের জন্য উপযুক্ত পথ বেছে নেয়। এ কারণেই তার ওপর আদেশ-নিষেধের বিধান আরোপিত হয়েছে; আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্যের কারণে সে পুরস্কারের যোগ্য হয় এবং নাফরমানির কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয়।
– তাকদির বা নিয়তির অধীন হওয়ার কারণ হল, চাইলেও নিজের কথা ও কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির ও ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না। যেমন—আল্লাহ সুবহানাহু বলেছেন:
“مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ”
“জমিনে কিংবা তোমাদের নিজেদের মধ্যে যে কোনো বিপদ আসে তা সংঘটিত হওয়ার আগেই তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর জন্য সহজ।” [সূরা হাদীদ: ২২]।
তিনি আরও বলেছেন:
“لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ . وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ”
“তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় (সে চলতে পারে)। আর তোমরা তো ইচ্ছা করতে পারো না, যতক্ষণ না বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন” [সূরা তাকভীর: ২৮-২৯]।
এবং বলেছেন:
“هُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ”
“তিনিই তোমাদেরকে স্থলে ও জলে ভ্রমণ করান…।” [সূরা ইউনুস: ২২]
এ বিষয়ে কিতাব ও সুন্নাহতে অসংখ্য আয়াত ও সহিহ হাদিস রয়েছে যা সত্যান্বেষী ও চিন্তাশীল মাত্রই বুঝতে পারবে। আল্লাহর কাছেই তাওফিক কামনা করছি। আর আল্লাহ আমাদের নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। [ফতওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, সৌদি আরব]
সদস্যগণ: আব্দুল্লাহ ইবনে কুউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে গুদাইয়ান, আব্দুর রাজ্জাক আফীফী, আব্দুল আজীজ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বায — [সমাপ্ত]।
❑ ২. শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.):
শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: মানুষ কি তাকদির বা নিয়তির দ্বারা বাধ্য, নাকি স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী?
তিনি (রহ.) উত্তরে বলেন:
لَوْ أَرَدْتُ أَنْ أَقُولَ لِهَذَا السَّائِلِ: هَلْ أَنْتَ مُسَيَّرٌ حِينَ أَلْقَيْتَ هَذَا السُّؤَالَ أَوْ أَلْقَيْتَهُ بِاخْتِيَارِكَ؟ فِي عِلْمِي أَنَّهُ سَيَقُولُ: أَلْقَيْتُهُ بِاخْتِيَارِي.
إِذاً فَالْإِنْسَانُ يَفْعَلُ مَا يَفْعَلُهُ بِاخْتِيَارِهِ لَا شَكَّ. فَالْإِنْسَانُ يَذْهَبُ وَيَرْجِعُ، وَيُصَلِّي وَيَتَوَضَّأُ، وَيَصُومُ وَيُزَكِّي وَيَحُجُّ، وَيَبِيعُ وَيَشْتَرِي، وَيَتَزَوَّجُ وَيُزَوِّجُ، وَكُلُّ ذَلِكَ بِاخْتِيَارِهِ، لَا أَحَدَ يُجْبِرُهُ عَلَى ذَلِكَ.
وَلِهَذَا تَجِدُهُ يَخْتَارُ أَحَدَ شَيْئَيْنِ عَلَى الْآخَرِ: يَخْتَارُ مَثَلًا أَنْ يَدْخُلَ فِي كُلِّيَّةِ الشَّرِيعَةِ دُونَ أَنْ يَدْخُلَ فِي كُلِّيَّةِ الْهَنْدَسَةِ مَثَلًا وَالْجَامِعَةُ وَاحِدَةٌ، مَنِ الَّذِي أَجْبَرَهُ عَلَى هَذَا؟ هَلْ أَحَدٌ أَجْبَرَهُ؟ هُوَ بِاخْتِيَارِهِ فِي الْوَاقِعِ.
وَلَوْلَا أَنَّ الْإِنْسَانَ يَفْعَلُ بِاخْتِيَارِهِ لَكَانَتْ عُقُوبَتُهُ عَلَى الذُّنُوبِ ظُلْماً، وَاللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى مُنَزَّهٌ عَنِ الظُّلْمِ، وَمَا أَكْثَرَ الْآيَاتِ الَّتِي يُضِيفُ فِيهَا اللَّهُ تَعَالَى الْأَعْمَالَ إِلَى الْإِنْسَانِ: ( فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْراً يَرَهُ * وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرّاً يَرَهُ )، ( فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ )، ( مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ). وَالْآيَاتُ فِي هَذَا كَثِيرَةٌ، وَالْعَقْلُ شَاهِدٌ بِهَذَا.
وَلَا يُمْكِنُ أَنْ تَسْتَقِيمَ قَدَمُ عَاقِلٍ عَلَى الْقَوْلِ بِأَنَّ الْإِنْسَانَ مُجْبَرٌ أَبَداً؛ لِأَنَّ هَذَا يُكَذِّبُهُ الْحِسُّ فَضْلًا عَنِ الشَّرْعِ.
وَلَكِنْ يَبْقَى النَّظَرُ: هَلْ هَذَا الِاخْتِيَارُ مُسْتَقِلٌّ عَنْ إِرَادَةِ اللَّهِ؟
وَالْجَوَابُ: لَا، إِنَّكَ مَا أَرَدْتَ شَيْئاً إِلَّا عَلِمْنَا بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَرَادَهُ مِنْ قَبْلُ؛ لِقَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: ( لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ * وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ). فَإِذَا أَرَادَ الْإِنْسَانُ أَنْ يَأْكُلَ، فَأَكَلَ، عَلِمْنَا أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدْ أَرَادَ قَبْلَ إِرَادَتِهِ، أَنْ يُرِيدَ الْأَكْلَ، فَيَأْكُلَ، وَإِذَا أَرَادَ الْإِنْسَانُ أَنْ يَبِيعَ وَيَشْتَرِيَ، وَاشْتَرَى وَبَاعَ، عَلِمْنَا أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدْ أَرَادَ ذَلِكَ، أَيْ: أَرَادَ مِنْهُ أَنْ يُرِيدَ وَيَبِيعَ وَيَشْتَرِيَ، وَهَلُمَّ جَرّاً؛ فَإِرَادَةُ اللَّهِ سَابِقَةٌ، وَإِرَادَةُ الْمَخْلُوقِ هِيَ اللَّاحِقَةُ الْمُبَاشِرَةُ.
وَنَحْنُ لَا نَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَرَادَ بِنَا شَيْئاً إِلَّا حِينَ يَقَعُ، وَلِهَذَا لَا يَكُونُ فِي هَذَا الْقَوْلِ الَّذِي قُلْتُهُ الْآنَ حُجَّةٌ لِلْعَاصِي الَّذِي يَعْصِي اللَّهَ وَيَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَرَادَ ذَلِكَ.
لِأَنَّنَا نَقُولُ لَهُ: مَا الَّذِي أَعْلَمَكَ أَنَّ اللَّهَ أَرَادَ؟ أَنْتَ لَا يُمْكِنُ أَنْ تَعْلَمَ أَنَّ اللَّهَ أَرَادَ إِلَّا إِذَا فَعَلْتَ، وَفِعْلُكَ وَاقِعٌ بِاخْتِيَارِكَ لَا شَكَّ، وَلِهَذَا لَمْ نَجِدْ هَذِهِ الْكَلِمَةَ (مُسَيَّرٌ أَوْ مُخَيَّرٌ)، مَا رَأَيْتُهَا فِي كَلَامِ السَّلَابِقَةِ الْأَوَّلِينَ أَبَداً -بَلِ السَّابِقِينَ الْأَوَّلِينَ-، لَكِنَّهَا قَالَهَا بَعْضُ الْمُحْدِثِينَ، فَسَارَتْ بَيْنَ النَّاسِ لِأَنَّهَا كَلِمَةٌ رَنَّانَةٌ، وَإِلَّا فَمِنَ الْمَعْلُومِ أَنَّ الْإِنْسَانَ مُخَيَّرٌ: ( فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ )، وَكُفْرُ الْإِنْسَانِ بِاخْتِيَارِهِ، وَإِيمَانُهُ بِاخْتِيَارِهِ…
وَعَلَى هَذَا فَنَقُولُ: الْإِنْسَانُ مُخَيَّرٌ، بِمَعْنَى: أَنَّهُ يَفْعَلُ الشَّيْءَ بِاخْتِيَارِهِ، لَكِنَّنَا نَعْلَمُ أَنَّهُ إِذَا اخْتَارَ شَيْئاً وَفَعَلَهُ، فَهُوَ بِإِرَادَةِ اللَّهِ السَّابِقَةِ عَلَيْهِ.
نَعَمْ هُنَاكَ أَشْيَاءُ لَيْسَتْ بِاخْتِيَارِ الْإِنْسَانِ: لَوْ سَافَرَ الْإِنْسَانُ مَثَلًا، وَأَصَابَهُ حَادِثٌ، هَذَا بِغَيْرِ اخْتِيَارِهِ، لَوْ أَنَّ الْإِنْسَانَ عَمِلَ عَمَلًا نَاسِياً، هَذَا بِغَيْرِ اخْتِيَارِهِ، وَلِهَذَا لَا يُؤَاخِذُ اللَّهُ عَلَى النِّسْيَانِ وَلَا عَلَى الْخَطَأِ وَلَا عَلَى فِعْلِ النَّائِمِ؛ لِأَنَّهُ غَيْرُ مُخْتَارٍ.
“আমি যদি এই প্রশ্নকারীকে জিজ্ঞাসা করি—”আপনি কি বাধ্য হয়ে এই প্রশ্নটি করলেন, নাকি নিজের ইচ্ছায় করলেন?”—তবে নিশ্চিতভাবেই সে বলবে, “আমি নিজের ইচ্ছাতেই এটি করেছি।”
তাহলে বোঝা গেল, মানুষ যা কিছু করে তা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই করে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষ যাতায়াত করে, সালাত আদায় করে, ওজু করে, রোজা রাখে, জাকাত দেয়, হজ করে, বেচাকেনা করে, বিয়ে করে—এসবের প্রতিটি কাজ সে নিজের ইচ্ছায় করে; কেউ তাকে এগুলোতে বাধ্য করে না। এ কারণেই দেখা যায়, সে দুটি বিকল্পের মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেয়। যেমন: একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ দিয়ে শরিয়াহ অনুষদ বেছে নেয়। এক্ষেত্রে কে তাকে বাধ্য করেছে? কেউ কি জোর করেছে? আদতে সে নিজের ইচ্ছাতেই এটি করেছে। মানুষ যদি নিজের ইচ্ছায় কাজ না করত তবে পাপের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া চরম অবিচার হতো; অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাবতীয় জুলুম থেকে পবিত্র।
এমন কত আয়াতই না রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাআলা কাজগুলোকে সরাসরি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন:
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْراً يَرَهُ * وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرّاً يَرَهُ
“যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তাও দেখতে পাবে।” [সূরা যিলযাল: ৭-৮]
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
“যে ইচ্ছা করে সে ইমান আনুক আর যে ইচ্ছা করে সে কুফরি করুক।” [সূরা কাহফ: ২৯]
مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
“তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ কেউ আখিরাত চায়।” [সূরা আলে ইমরান: ১৫২]।
এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং সুস্থ বিবেকও এর সাক্ষ্য দেয়। কোনো বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে এ কথা ভাবা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, মানুষ প্রতিটি কাজে সম্পূর্ণ বাধ্য বা নিস্প্রভ। কারণ শরিয়ত তো দূরের কথা, সাধারণ অনুভূতি ও বাস্তবতাই এর মিথ্যা প্রমাণ করে। তবে এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়: এই স্বাধীন ইচ্ছা কি আল্লাহর ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র? উত্তর হলো: না। তুমি যা কিছুই ইচ্ছা করো না কেন তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ইচ্ছার বাইরে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ * وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
“তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় (সে চলতে পারে)। আর তোমরা তো ইচ্ছা করতে পারো না, যতক্ষণ না বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন” [সূরা তাকভীর: ২৮-২৯]
সুতরাং মানুষ যখন খেতে ইচ্ছা করে এবং খায়। তখন আমরা বুঝি যে তার ইচ্ছার আগেই আল্লাহ তাআলা তা ইচ্ছা করেছিলেন। একইভাবে মানুষ যখন বেচাকেনার ইচ্ছা করে এবং তা সম্পন্ন করে, তখনো আল্লাহর পূর্ববর্তী ইচ্ছাই এর পেছনে কাজ করে। অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা অগ্রবর্তী আর মানুষের ইচ্ছা তার ঠিক পরের ও সরাসরি ফলাফল। তবে আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে কী রেখেছেন তা তো কোনো ঘটনা ঘটার আগে আমরা জানতে পারি না। তাই কোনো পাপাচারী ব্যক্তি এই অজুহাত দিতে পারে না যে—”আল্লাহ তো এটাই চেয়েছিলেন, তাই আমি অপরাধ করেছি!” কারণ আমরা তাকে পাল্টা প্রশ্ন করব: “তুমি কীভাবে জানলে যে আল্লাহ এটি চেয়েছেন? তুমি তো কেবল তখনোই জানতে পারলে যখন তুমি কাজটি নিজে করলে আর তোমার সেই কাজটি তো নিঃসন্দেহে তোমার নিজের ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়েছে।” এ কারণেই ‘মুসাইয়ার’ (নিয়তির কড়া কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা) বা ‘মুখাইয়ার’—এই পরিভাষাগুলো সালাফদের যুগে ছিল না। পরবর্তীকালের কিছু লোক মুখে মুখে আকর্ষণীয় করার জন্য এসব শব্দ চালু করেছে। আসল কথা হলো, মানুষ স্পষ্টতই স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
“যে ইচ্ছা করে সে ইমান আনুক আর যে ইচ্ছা করে সে কুফরি করুক।” [সূরা কাহফ: ২৯]।
মানুষের কুফরি যেমন তার নিজের ইচ্ছায় হয়, তেমনি তার ইমানও তার নিজের ইচ্ছাধীন। সংক্ষেপে আমাদের বক্তব্য হলো, মানুষ স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। অর্থাৎ সে নিজের ইচ্ছাতেই তার কর্ম সম্পাদন করে। তবে তার এই নির্বাচন ও কর্ম আল্লাহর পূর্ববর্তী ইচ্ছার অধীনস্থ। অবশ্য কিছু বিষয় রয়েছে যা মানুষের ইচ্ছার বাইরে ঘটে: যেমন—সফরে যাওয়ার পর কোনো দুর্ঘটনা ঘটা বা ভুলবশত কোনো কাজ করে ফেলা। এসব ক্ষেত্রে মানুষের কোনো হাত থাকে না। আর এ কারণেই আল্লাহ ভুলবশত, অনিচ্ছাকৃত বা ঘুমন্ত অবস্থায় সংঘটিত কাজের জন্য মানুষকে পাকড়াও করেন না। কারণ সেখানে সে স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী ছিল না। [সূত্র: ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব, ১৩/২২-শামেলা] [সোর্স islamqa info]
➧ সারাংশ: মানুষ তার ভালো-মন্দ কাজ, ইবাদত কিংবা পাপাচার—সবকিছুই নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পন্ন করে। এজন্যই সে তার কাজের জন্য পুরস্কার বা শাস্তির মুখোমুখি হয়। কিন্তু মানুষের এই স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মপ্রচেষ্টা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদির ও তাঁর ইচ্ছার বাইরে নয়। অর্থাৎ মানুষ যা ইচ্ছা করে এবং সম্পাদন করে তা আল্লাহর পূর্ববর্তী জ্ঞানের এবং ইচ্ছার অধীনই সংঘটিত হয়। এককথায়, মানুষ একাধারে স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী এবং আল্লাহর তাকদিরে ও ই্চ্ছারও অধীন। এটাই হল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ-এর সঠিক আকিদা যা জাবরিয়্যাহ (মানুষ সম্পূর্ণ বাধ্য, কোনো ইখতিয়ার নেই) এবং কাদারিয়্যাহ/মুতাযিলা (আল্লাহর পূর্ব ইলম ও তাকদির অস্বীকারকারী)— উভয় বিভ্রান্ত ফিরকার মাঝামাঝি সঠিক অবস্থান। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।