নিম্নে মৃত ব্যক্তির জানাজার পর এবং দাফনের পূর্বে বা দাফনের সময় চেহারা খোলার ব্যাপারে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:
❑ ১ম: মৃতের জানাজার পর তার মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করার বিধান:
প্রশ্ন: ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে পাঠানো প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় কেউ মারা গেলে মরদেহ ঘরে থাকা অবস্থায় শোক জানাতে আসা লোকজনের সামনে উপস্থিত একজন মৃতের মুখ খুলে দেন। এরপর গোসল ও মসজিদে জানাজার নামাজ শেষ হলে আত্মীয়দের একজন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করতে করতে মৃতের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে নেন। তারপর উপস্থিত সবাই তথাকথিত ‘বিদায়ী দৃষ্টি’ বা শেষ দেখা দেখেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই কাজটির হুকুম কী? মহান আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর:
هَذَا لَا أَصْلَ لَهُ، أَقُولُ: لَيْسَ لَهُ أَصْلٌ هَذَا، وَالسُّنَّةُ أَنْ يُدْفَنَ مُغَطًّى الْكَفَنُ كُلُّهُ، وَجْهُهُ وَغَيْرُ وَجْهِهِ، السُّنَّةُ أَنْ يَكُونَ الْكَفَنُ عَامًّا، وَأَنْ لَا يُكْشَفَ وَجْهُهُ وَلَا غَيْرُهُ، أَمَّا مَا دَامَ بَيْنَهُمْ فَكَشَفُوهُ لِيُسَلِّمَ عَلَيْهِ مَنْ هُوَ مِنْ مَحَارِمِهِ إِنْ كَانَ زَوْجَتَهُ، أَوْ أَخَوَاتِهِ، أَوْ يُسَلِّمَ عَلَيْهِ الرَّجُلُ إِذَا كَانَ رَجُلًا؛ فَلَا بَأْسَ، أَوِ امْرَأَةٌ يُسَلِّمُ عَلَيْهَا مَحَارِمُهَا، أَوْ زَوْجُهَا لَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ، النَّبِيُّ ﷺ لَمَّا تُوُفِّيَ وَجَاءَ الصِّدِّيقُ مِنْ مَنْزِلِهِ كَشَفَ وَجْهَهُ وَقَبَّلَهُ، وَقَالَ: «طِبْتَ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي حَيًّا وَمَيِّتًا» عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ.
فَإِذَا كُشِفَ لِمَصْلَحَةِ تَقْبِيلِهِ، أَوِ النَّظَرِ إِلَيْهِ، وَالدُّعَاءِ لَهُ؛ فَلَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ، لَكِنْ عِنْدَ وَضْعِهِ فِي الْقَبْرِ لَا يُكْشَفُ وَجْهُهُ، بَلْ يَكُونُ مُغَطًّى الْوَجْهُ، وَجَمِيعُ الْبَدَنِ فِي الْقَبْرِ
“ইসলামের শরিয়তে এই ধরনের রীতির কোনও ভিত্তি নেই। আমি স্পষ্টভাবে বলছি—এর কোনও সুন্নাহসম্মত ভিত্তি নেই। মূল সুন্নত হলো, মৃত ব্যক্তির পুরো শরীর—মুখমণ্ডলসহ—কাফনের কাপড়ে ঢেকে দাফন করা। নিয়ম অনুযায়ী কাফন দিয়েই সম্পূর্ণ শরীর আবৃত থাকবে, মুখ বা অন্য কোনও অঙ্গ খোলা রাখা যাবে না। তবে দাফনের পূর্বে মরদেহ ঘরে থাকা অবস্থায় যদি মৃত ব্যক্তি পুরুষ হয় এবং তাকে শেষবারের মতো সালাম জানাতে বা দেখতে তার মাহরাম (যেমন: স্ত্রী, মা, বোন, খালা প্রমুখগণ) কিংবা কোনও পুরুষ আত্মীয় তার মুখমণ্ডল খোলে তবে তাতে কোনও সমস্যা নেই। একইভাবে মৃত ব্যক্তি নারী হলে তার মাহরাম পুরুষ বা স্বামী যদি তাকে সালাম জানানোর জন্য মুখ খোলে তাতেও কোনও বাধা নেই। কেননা আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ইন্তেকাল করেন তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘর থেকে এসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে তাঁকে চুম্বন করেছিলেন এবং বলেছিলেন:
«طِبْتَ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي حَيًّا وَمَيِّتًا»
“আমার মা-বাবা আপনার ওপর উৎসর্গ হোক! আপনি জীবিত ও মৃত—উভয় অবস্থাতেই পরম পবিত্র!” [সহিহ বুখারি: ৩৬৬৭]
সুতরাং মৃতের প্রতি সমবেদনা জানানো, তাকে চুম্বনের উদ্দেশ্যে, কিংবা তার দিকে তাকিয়ে দোয়ার উদ্দেশ্যে যদি মুখমণ্ডল সাময়িকভাবে উন্মুক্ত করা হয়, তবে তাতে কোনও গুনাহ নেই। কিন্তু কবরে রাখার সময় বা দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার পর অযথা মুখ খুলে রাখা যাবে না। কবরে রাখার সময় মৃতের মুখমণ্ডলসহ পুরো শরীর কাফনে ঢেকে রাখা ওয়াজিব।”
ফতওয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)।
সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব।
❑ ২য়: দাফনের আগে ও দাফনের সময় মৃত ব্যক্তির চেহারা খোলা রাখার বিধান:
প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার সময়—সুন্নত কি তার চেহারা খোলা রাখা, নাকি তার চেহারা ঢেকে রাখাই সুন্নত?
উত্তর:
الْحَمْدُ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ، أَمَّا بَعْدُ:
فَكَشْفُ وَجْهِ الْمَيِّتِ عِنْدَ دَفْنِهِ أَوْ أَيِّ جُزْءٍ مِنْ أَجْزَاءِ جِسْمِهِ لَيْسَ مِنَ السُّنَّةِ -عَلَى مَا نَعْلَمُ- بَلْ هُوَ إِلَى الْبِدْعَةِ أَقْرَبُ.
بَلْ كَرِهَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ الْكَشْفَ عَنْ وَجْهِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ مُطْلَقًا، وَقَالُوا: إِنَّ الْمَرَضَ وَالْمَوْتَ يُغَيِّرَانِ مِنْ مَحَاسِنِ الْحَيِّ الْمَعْهُودَةِ، فَإِذَا رَآهُ مَنْ لَا عِلْمَ لَهُ ظَنَّ بِهِ ظَنَّ السُّوءِ. رُوِيَ هَذَا عَنِ النَّخَعِيِّ وَابْنِ الْعَرَبِيِّ، بَلْ قَالَ النَّخَعِيُّ: لَا يَطَّلِعُ عَلَى وَجْهِ الْمَيِّتِ إِلَّا الْغَاسِلُ، ذَكَرَهُ الْحَافِظُ فِي الْفَتْحِ.
وَالصَّحِيحُ أَنَّهُ يَجُوزُ الْكَشْفُ عَنْ وَجْهِ الْمَيِّتِ قَبْلَ دَفْنِهِ وَتَقْبِيلُهُ، كَمَا جَاءَ فِي الْبُخَارِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبَّلَ وَجْهَ عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُونٍ…
وَالْحَاصِلُ أَنَّ كَشْفَ وَجْهِ الْمَيِّتِ عِنْدَ الدَّفْنِ لَيْسَ مِنَ السُّنَّةِ.
وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুলের ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিগণের ওপর। অতঃপর— দাফন করার সময় মৃত ব্যক্তির চেহারা কিংবা শরীরের কোনো অংশ খোলা রাখা—আমাদের জানামতে—সুন্নত নয়; বরং তা বিদআতের কাছাকাছি। এমনকি কোনো কোনো আলেম মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির চেহারা একেবারে খুলে রাখাকে অপছন্দ করেছেন। তারা বলেছেন, রোগ ও মৃত্যু মানুষের জীবদ্দশার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বদলে দেয়। তাই অনভিজ্ঞ কেউ মৃত ব্যক্তিকে সেই অবস্থায় দেখলে তার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করতে পারে। এই মতটি ইবরাহিম নাখঈ ও ইবনুল আরাবি (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি ইবরাহিম নাখঈ বলেছেন,
لَا يَطَّلِعُ عَلَى وَجْهِ الْمَيِّتِ إِلَّا الْغَاسِلُ
“গোসলদাতা ছাড়া অন্য কেউ যেন মৃত ব্যক্তির চেহারা না দেখে।” হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তবে সঠিক কথা হলো, দাফনের আগে মৃত ব্যক্তির চেহারা দেখা এবং তাতে চুমু দেওয়া জায়েজ। যেমনটি সহিহ আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসমান ইবনে মাযউন (রা.)-এর চেহারায় চুমু দিয়েছিলেন।
[পূর্ণ হাদিসটি নিম্নরূপ:
عن عائشةَ ، قالت : رأيتُ رسولَ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ علَيهِ وسلَّمَ يُقبِّلُ عُثمانَ بنَ مَظعونٍ وَهوَ مَيِّتٌ ، حتَّى رأيتُ الدُّموعَ تسيلُ
“উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, উসমান ইবনে মাযউন (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি তাঁকে চুমু খাচ্ছেন; এমনকি তখন আমি তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখেছি।” [সুনান আবু দাউদ, ৩১৬৩; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন] সংক্ষেপে বলা যায়, দাফনের সময় মৃত ব্যক্তির চেহারা খোলা রাখা সুন্নত নয়। [উৎস: ইসলাম ওয়েব]
আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।