নারীদের মাথার চুল কাটার বিধান সম্পর্কে বিজ্ঞ আলেমদের একগুচ্ছ ফতওয়া

বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিতে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নারীদের জন্য প্রয়োজনে মাথার চুল ছোট করা জায়েজ। (যেমন: স্বামীর নিকট সৌন্দর্য অবলম্বন, অতিরিক্ত লম্বা চুলের কষ্ট লাঘব, লম্বা চুল পরিচর্যায় খরচ কমানো ইত্যাদি)। শরিয়তে এতে কোনো বাধা নেই যদি অমুসলিম নারী, নায়িকা, গায়িকা, মডেল প্রভৃতি ফাসিক নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন অবলম্বনের উদ্দেশ্য না থাকে এবং পুরুষদের মত করে চুল কাটা না হয়। কেননা হাদিসে বিপরীত লিঙ্গ ও কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বনের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে সাজসজ্জার বিষয়টি নারীদের জন্য অনুমদিত। কুরআন-সুন্নাহর দলিল ছাড়া তা নিষিদ্ধ করার সুযোগ নাই।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
“আপনি বলুন, আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে?” [সূরা আরাফ ৭:৩২]
এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, সব ধরনের সাজসজ্জা এবং রূপচর্চার ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো বৈধতা (ইবাহাত)।
আর মহিলাদের চুল কাটার বিষয়ে বিশেষভাবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ أَزْوَاجُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْخُذْنَ مِنْ رُءُوسِهِنَّ حَتَّى تَكُونَ كَالْوَفْرَةِ
“রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণ এমনভাবে মাথার চুল কাটতেন যে, তা কাঁধের কিছুটা নিচ পর্যন্ত অথবা কান বরাবর পৌঁছাত (যাকে ‘ওয়াফরা’ বলা হয়)।” [সহিহ মুসলিম, হা/৩২০]
ইমাম নওয়াবি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন:
فِيهِ دَلِيلٌ عَلَى جَوَازِ تَخْفِيفِ الشُّعُورِ لِلنِّسَاءِ
“এতে প্রমাণিত হয় যে, নারীদের চুল কেটে হালকা করা জায়েজ।” [শরহে মুসলিম, ৫/৪] উল্লেখ্য যে, নারীদের জন্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চুল মুণ্ডণ করা হারাম।
❑ আধুনিক যুগের কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের ফতওয়া:
✪ ১. আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ উসাইমিন (রহ.):
এই মুহূর্তে আমার জানা মতে এমন কোনো দলিল নেই, যা দ্বারা নারীদের চুল কাটা হারাম প্রমাণিত হয়। হারাম বলার মতটি দুর্বল, এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। মাকরূহ বলার মতটিও প্রশ্নবিদ্ধ। বরং বৈধ হওয়ার মতটিই দলিল ও মূলনীতির সবচেয়ে কাছাকাছি। কেননা রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীদের চুল কাটার হাদিস সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। [শাইখের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ-উৎস: আল ফাতাওয়া ৪/১৩৪]
✪ ২. আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.):
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়: নারীদের সামনের দিক থেকে চুল কাটা কি হারাম, যদি তা কেবল সৌন্দর্যের জন্য হয়?
তিনি উত্তরে বলেন,
لَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ، الْحَمْدُ لِلَّهِ، الْمُهِمُّ صِيَانَةُ ذَلِكَ عَنِ الْأَجْنَبِيِّ، فَإِذَا كَانَ عِنْدَمَا يَظْهَرُ الزَّوْجُ وَالنِّسَاءُ وَالْمَحَارِمُ، فَلَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ
“এতে কোনো সমস্যা নেই, আলহামদুলিল্লাহ। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তা আজনবি পুরুষদের থেকে গোপন রাখা। যদি এটি কেবল স্বামী, নারী এবং মাহরাম পুরুষদের (যাদের সাথে স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম, যেমন—পিতা, সন্তান, দাদা, চাচা, মামা প্রমুখ) সামনে প্রকাশ পায় তাহলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।”
✪ ৩. আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.):
শাইখ আলবানি ও তাঁর ছাত্রদের মাঝে নারীদের চুল কাটা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর:
প্রশ্ন: নারীদের চুল কাটার বিধান কী?
◈ শাইখ আলবানি: মুসলিম নারীর জন্য চুল হালকা করা কিংবা স্বামীর জন্য সাজসজ্জা করার উদ্দেশ্যে চুল কাটতে কোনো বাধা নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন সে পাপাচারী বা কাফির নারীদের অনুকরণ করার দিকে ঝুঁকে না পড়ে।
প্রশ্ন: চুল কাটার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কোনো সীমা আছে কি?
◈ শাইখ আলবানি: না, সর্বনিম্ন কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।
প্রশ্ন: মানে…
◈ শাইখ আলবানি: শুধু পুরুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
প্রশ্ন: মানে…
◈ শাইখ আলবানি: এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণ তাঁদের চুল কেটে কান বা কাঁধের কাছাকাছি লম্বা রাখতেন। ‘ওয়াফরা’ হলো সেই চুল, যা কাঁধ পর্যন্ত কিংবা কাঁধের কাছাকাছি হয়ে থাকে।
মুহাম্মদ হাশিম আল-হাদিয়া: লম্বা চুল তো এক অপূর্ব সৌন্দর্য, বিশেষ করে যখন নারীরা সফরসঙ্গী হন।
◈ শাইখ আলবানি: এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মূল আলোচ্য বিষয় হলো, চুল হালকা করা জায়েজ কি না। যেহেতু সহিহ মুসলিমে প্রমাণ রয়েছে যে,
كَانَ أَزْوَاجُ النَّبِيِّ ﷺ يَأْخُذْنَ مِنْ رُءُوسِهِنَّ حَتَّى تَكُونَ كَالْوَفْرَةِ»
“রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণ চুল কেটে ‘ওয়াফরা’-এর মতো রাখতেন।”
তাই আমরা আল্লাহ যেখানে কড়াকড়ি করেছেন সেখানে কড়াকড়ি করি, আর যেখানে সহজ করেছেন সেখানে সহজ করি।
আমরা তো কেবল অনুসারী; শরিয়ত যেখানে সহজ করেছে, আমরাও সেখানে সহজতা অবলম্বন করি, আর যেখানে কড়াকড়ি করেছে, সেখানে কঠোর হই। প্রকৃত ঈমান তো এটাই—
وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
“অতঃপর তারা পূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে।” [সুরা নিসা: ৬৫] [সোর্স: al-albany]
✪ ৪. ড. আল্লামা শাইখ সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান (হাফি.)
প্রশ্ন: চুল কাটার বিধান কী? জ্ঞাতব্য যে, আমার উদ্দেশ্য পুরুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া নয়।
উত্তর:
قَصُّ الشَّعْرِ إِذَا كَانَ لِحَاجَةٍ كَأَنْ يَكُونَ طَوِيلًا وَيُكَلِّفُهَا حَمْلَهُ أَوْ مَؤُونَتهُ وَهِيَ كَبِيرَةُ السِّنِّ أَوْ مَرِيضَةً وَيُكَلِّفُهَا طُولُ الشَّعْرِ فَلَا بَأْسَ أَنْ تُخَفِّفَ مِنْهُ كَمَا فَعَلَتْ بَعْضُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ وَفَاتِهِ، أَمَّا قَصُّهُ لِغَيْرِ الْحَاجَةِ بَلْ مِنْ بَابِ الْمَوْضَةِ الْحَادِثَةِ أَوْ طَلَبِ التَّجَمُّلِ فَهَذَا غَيْرُ مُسْتَحْسَنٍ، وَالَّذِي يَنْبَغِي تَرْكُهُ لِأَنَّ جَمَالَ الْمَرْأَةِ فِي بَقَاءِ شَعْرِهَا
“চুল কাটা যদি কোনো প্রয়োজনের খাতিরে হয়—যেমন চুল অনেক লম্বা হয়ে যাওয়ায় তা বহন করা বা পরিচর্যা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কিংবা নারীটি বয়স্কা বা অসুস্থ হওয়ার কারণে দীর্ঘ চুল রাখা কষ্টকর হয়—তাহলে তা হালকা করাতে কোনো সমস্যা নেই। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর তাঁর কতিপয় স্ত্রী যেমনটি করেছিলেন। পক্ষান্তরে কোনো প্রয়োজন ছাড়া নিছক আধুনিক ফ্যাশন বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে চুল কাটা প্রশংসনীয় নয়; বরং এটি বর্জন করা উচিত। কারণ নারীর আসল সৌন্দর্য তার চুলের মধ্যেই নিহিত।
ফতওয়া প্রদানে: ড. শাইখ সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ)
প্রধান স্থায়ী ফতওয়া কমিটি ও প্রধান মুফতি সৌদি আরব।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: