গৃহকর্মী ও নন-মাহরাম পুরুষের পর্দার শরয়ি বিধান ও করণীয়

গৃহকর্মী ও নন-মাহরাম পুরুষের পর্দা: শরয়ি বিধান ও করণীয়:
প্রশ্ন: বাসায় কাজ করতে আসা নারী গৃহকর্মী (বুয়া) এবং সেই বাসার নন-মাহরাম পুরুষদের মধ্যে পর্দার বিধান কী? ঘর মোছা, রান্না ও কাপড় ধোয়ার মতো কাজ পুরোপুরি পর্দা রক্ষা করে করা বেশ কষ্টকর। আবার পুরুষরা সারাক্ষণ বাইরেও থাকতে পারেন না। ফলে মাঝেমধ্যে সামনাসামনি পড়ে যাওয়া অনিবার্য। এতে কি উভয়ের গুনাহ হবে?
উত্তর: গৃহকর্মীর জন্য পর্দার আলাদা কোনও বিধান নেই। তিনি অন্যান্য নন-মাহরাম নারীর মতোই শরয়ির সাধারণ বিধানের অন্তর্ভুক্ত। তবে কাজের স্বাভাবিক প্রয়োজনে অনিচ্ছাকৃতভাবে সামনাসামনি পড়ে গেলে তাতে কোনও গুনাহ নেই। শর্ত হলো, দৃষ্টি সংযত রাখা, নির্জনতা এড়ানো এবং সাধ্যমতো সতর্কতা অবলম্বন করা।
উল্লেখ্য যে, কাজের মহিলারা বা গৃহকর্মীরা ‘স্বাধীন’ নারীদের মতোই শরিয়তের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা মূলত নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ কর্মী মাত্র। তাই তাঁদেরকে ‘দাসী’ মনে করার কোনো সুযোগ নেই যদিও এ বিষয়ে অনেকের মাঝেই ভুল ধারণা রয়েছে। সে কারণে তাঁদের সামনেও পরপুরুষদের জন্য পর্দা রক্ষা করা ফরজ। তাঁদের সাথে একান্তে সময় কাটানো, শরীর স্পর্শ করা কিংবা মাহরাম ছাড়া একাকী সফরে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সবই নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে শরিয়তের মূল নির্দেশনাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
❑ ১. দৃষ্টি সংযত রাখা নারী-পুরুষ উভয়ের উপর আবশ্যক:
পর্দার মূল ভিত্তি হলো দৃষ্টির হেফাজত। আল্লাহ তাআলা পুরুষদের নির্দেশ দিয়ে বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, যেন তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।” [সূরা নূর: ৩০]
একইভাবে নারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ
“আর মুমিন নারীদের বলুন, যেন তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে এবং যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বুক ঢেকে রাখে।” [সূরা নূর: ৩১]
❑ ২. হঠাৎ চোখ পড়ে গেলে করণীয়:
হঠাৎ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি পড়ে গেলে তা অপরাধ নয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নজর ফিরিয়ে নিতে হবে।
জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ نَظَرِ الْفُجَاءَةِ، فَأَمَرَنِي أَنْ أَصْرِفَ بَصَرِي
“আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আকস্মিক দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে আদেশ করলেন।” [সহিহ মুসলিম: ২১৫৮]
এ থেকে প্রমাণিত হয়, হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়া নিজে গুনাহ নয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে। ইচ্ছা করে বারবার তাকানো বা পলকহীন তাকিয়ে থাকা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
❑ ৩. নির্জনতা এড়ানো:
নন-মাহরাম নারী-পুরুষের একান্তে অবস্থান করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“কোনও পুরুষ যেন মাহরাম আত্মীয় ছাড়া কোনও নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে।” [সহিহ বুখারি: ৩০০৬, ৫২৩৩; সহিহ মুসলিম: ১৩৪১]
তাই ঘরে অন্য কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য না থাকলে পুরুষ ও গৃহকর্মীর একা অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য কোনও নারী বা মাহরাম সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।
❑ ৪. গৃহকর্মীর পোশাকের শালীনতা:
ঘরের ভেতরে কাজের সুবিধার জন্য বাইরের মতো বোরকা বা নিকাব পরা বাধ্যতামূলক নয়। তবে নন-মাহরাম পুরুষের সামনে আসার সময় এমন পোশাক পরতে হবে যা শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখে এবং যা পাতলা বা আঁটসাঁট নয়। চুল, ঘাড় ও হাত ভালোভাবে ঢাকা থাকা আবশ্যক। মুখমণ্ডল, হাত ও পায়ের প্রচ্ছদ ঢেকে রাখার বিষয়ে ফকিহদের মাঝে ভিন্নমত থাকলেও, অধিক সতর্কতামূলক ও বিশুদ্ধ মতে তা ঢেকে রাখা ওয়াজিব।
❑ ৫. বয়স্কা নারীদের ক্ষেত্রে শিথিলতা:
বয়সের যে পর্যায়ে নারীদের প্রতি সাধারণ পুরুষদের আকর্ষণ থাকে না তাদের ক্ষেত্রে পর্দার নিয়মে কিছু ছাড় রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّاتِي لَا يَرْجُونَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِينَةٍ ۖ وَأَنْ يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَهُنَّ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“বৃদ্ধা নারীরা, যারা বিয়ের আশা রাখে না তারা যদি সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বাড়তি বহির্বাস খুলে রাখে তবে তাদের কোনও গুনাহ নেই। তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [সূরা নূর: ৬০]
তবে তরুণী বা কম বয়সী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এই শিথিলতা প্রযোজ্য নয়।
❑ ৬. কষ্টের অজুহাতে পর্দা বর্জন করা নিষেধ:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনও সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।” [সূরা হজ: ৭৮]
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কাজের প্রয়োজনে অনিচ্ছাকৃতভাবে সামনাসামনি পড়ে যাওয়া ক্ষমার্হ। কিন্তু “পরিচালনা করা কঠিন” অজুহাতে দৃষ্টি সংযত না রাখা, নির্জনতা এড়ানোর চেষ্টা না করা কিংবা পোশাকের শালীনতা পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়। বান্দা যখন সাধ্যমতো চেষ্টা করে আল্লাহ তাআলা তখন পরিস্থিতি সহজ করে দেন।
মোটকথা, অনিচ্ছাকৃত ও প্রয়োজনীয় সামনাসামনি হওয়া গুনাহ নয়। তবে সর্বাবস্থায় দৃষ্টি সংযত রাখা, নির্জনতা বর্জন করা, পর্দা রক্ষা করা এবং কথাবার্তা ও আচরণগত শালীনতা মেনে চলা আবশ্যক। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: