❑ ১. তামাক ও জর্দাযুক্ত পান খাওয়ার বিধান:
তামাক ও জর্দা তামাকজাত দ্রব্য। অধিকাংশ আলেমের মতে এগুলো হারাম। কারণ, এগুলো খবিস (নিকৃষ্ট) ও ক্ষতিকর বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।” [সূরা আরাফ: ১৫৭]
নিজের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।” [সূরা বাকারা: ১৯৫]
❑ ২. সুপারি ও চুনসহ পানের বিধান:
তামাক ছাড়া সাধারণ পানেও সুপারি ও চুন থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান IARC সুপারিকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। সুপারি চিবালে মুখের ক্যানসার ও ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (মুখ শক্ত হয়ে যাওয়া) হতে পারে। তাই তামাক ছাড়া পানও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শরিয়তের মূলনীতি হলো, যা ক্ষতিকর তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। তাই এসব থেকে বিরত থাকাই উচিত।
❑ ৩. তামাকযুক্ত পান বানিয়ে দেওয়ার হুকুম:
তামাক যেহেতু হারাম, তাই তামাকযুক্ত পান বানিয়ে দেওয়া, কিনে আনা বা তামাকপাতা প্রস্তুত করে দেওয়া গুনাহের কাজে সহযোগিতার শামিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
❑ ৪. বাবার আদেশ মানা কি জরুরি?
না, জরুরি নয়। পিতামাতার আনুগত্য কেবল বৈধ কাজে। পাপের কাজে তাঁদের আদেশ মানা যায় না।
◈ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ
“আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” [মুসনাদে আহমদ, হা. ১০৯৫; হাদিসটি সহিহ]
◈ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন:
إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“নিশ্চয়ই আনুগত্য কেবল ভালো বা বৈধ কাজেই।” [সহিহ বুখারি, হা. ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম, হা. ১৮৪০]
❑ ৫. তবে আদব রক্ষা করা ফরজ:
পাপের কাজে আদেশ না মানলেও পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে।
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
“তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বোলো না, তাদেরকে ধমকও দিয়ো না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” [সূরা ইসরা: ২৩]
◈ পাপের আদেশ না মানার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
“তারা যদি তোমাকে এমন কিছুকে আমার সাথে শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না; কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে চলবে।” [সূরা লুকমান: ১৫]
এই আয়াত থেকে মূলনীতি পরিষ্কার: পাপের আদেশ মানা যাবে না, কিন্তু পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণ সবসময় বজায় রাখতে হবে।
❑ ৬. সন্তানের করণীয়:
◈ ১. নরম ও স্নেহের সুরে বলুন, “আব্বু, আপনার অন্য সব খেদমত করব, কিন্তু এটা পারব না। আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় লাগে।”
◈ ২. রাগের সময় তর্ক করবেন না। পরিবেশ শান্ত হলে ধীরে বুঝিয়ে বলুন।
◈ ৩. বাবার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বুঝিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যাস কমানোর অনুরোধ করুন।
◈ ৪. বাবা যাঁদের সম্মান করেন, যেমন চাচা, মামা, স্থানীয় ইমাম বা পরিচিত চিকিৎসক, তাঁদের দিয়ে নরমভাবে বোঝানোর ব্যবস্থা করুন।
◈ ৫. বাবার হেদায়েত ও সুস্থতার জন্য নিয়মিত দোয়া করুন।
◈ ৬. বাবা চাইলে নিজে বানিয়ে নিতে পারেন। আপনি কেবল এই কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।
◈ ৭. আদব রক্ষা করার পরও তিনি রাগ করলে সে দায় আপনার নয়। তাঁর রাগ সহ্য করা আপনার জন্য সবরের অংশ।
❑ ৭. জোরপূর্বক বাধ্য করলে:
কেউ যদি মারধর বা গুরুতর ক্ষতির হুমকি দিয়ে পাপের কাজে বাধ্য করে, তাহলে বাধ্য ব্যক্তি ক্ষমার যোগ্য।
◈ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللهَ وَضَعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ওপর থেকে ভুলবশত কৃত কর্ম, ভুলে যাওয়া বিষয় এবং যার ওপর জোরজবরদস্তি করা হয়েছে (তার গুনাহ) তুলে নিয়েছেন।” [সুনান ইবনে মাজাহ, হা. ২০৪৫; হাদিসটি সহিহ] তবে এটি কেবল চরম বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ রাগ বা অনুরোধের ক্ষেত্রে নয়। আর জোর করার গুনাহ জোরকারীর ওপর বর্তাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতামাতার প্রতি যথাযথ সদাচরণ করার এবং সব ধরনের হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।