শিশু-কিশোরদের প্রতি অভিভাবকদের জরুরি কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আমানত। তাই পিতা-মাতার জন্য ফরজ হলো, এই আমানত রক্ষা করা। কোনভাবেই এই আমানতের খেয়ানত করা হলে আখিরাতে তাদেরকে আল্লাহর কাঠগড়ায় বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এই ক্ষেত্রে তাদের উপরে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, তাদেরকে দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতার পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করা এবং পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা। সুতরাং সুতরাং তাদেরকে সঠিক দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আজকের শিশু-কিশোররাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই বাল্যকাল থেকে শুরু করে বয়ঃসন্ধি ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তাদের শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা অভিভাবকদের অত্যন্ত জরুরি কর্তব্য। নিচে শিশু-কিশোরদের লালন-পালন, সালাত-সিয়াম শিক্ষা, নৈতিক শিষ্টাচার এবং বয়ঃসন্ধিকালীন সচেতনতা নিয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হলো:
◈ ১. শিশু-কিশোরদের প্রতি অভিভাবকদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে শাইখ সালেহ আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ)-এর উপদেশ:
«فَإِذَا بَلَغَ الطِّفْلُ سِنَّ التَّمْيِيزِ فَإِنَّهُ حِينَئِذٍ يُؤْمَرُ وَالِدُهُ بِأَنْ يُعَلِّمَهُ وَأَنْ يُرَبِّيَهُ عَلَى الْخَيْرِ بِأَنْ يُعَلِّمَهُ الْقُرْآنَ، وَمَا تَيَسَّرَ مِنَ الْأَحَادِيثِ، وَيُعَلِّمَهُ الْأَحْكَامَ الشَّرْعِيَّةَ الَّتِي تُنَاسِبُ سِنَّ هَذَا الطِّفْلِ بِأَنْ يُعَلِّمَهُ كَيْفَ يَتَوَضَّأُ وَكَيْفَ يُصَلِّي، وَيُعَلِّمَهُ الْأَذْكَارَ عِنْدَ النَّوْمِ وَعِنْدَ الِاسْتِيقَاظِ وَعِنْدَ الْأَكْلِ وَالشُّرْبِ؛ لِأَنَّهُ إِذَا بَلَغَ سِنَّ التَّمْيِيزِ فَإِنَّهُ يَعْقِلُ مَا يُؤْمَرُ بِهِ وَمَا يُنْهَى عَنْهُ، وَكَذَلِكَ يَنْهَاهُ عَنِ الْأُمُورِ غَيْرِ الْمُنَاسِبَةِ وَيُبَيِّنُ لَهُ أَنَّ هَذِهِ الْأُمُورَ لَا يَجُوزُ لَهُ فِعْلُهَا كَالْكَذِبِ وَالنَّمِيمَةِ وَغَيْرِ ذَلِكَ، حَتَّى يَتَرَبَّى عَلَى الْخَيْرِ وَعَلَى تَرْكِ الشَّرِّ مِنَ الصِّغَرِ، وَهَذَا أَمْرٌ مُهِمٌّ جِدًّا غَفَلَ عَنْهُ بَعْضُ النَّاسِ مَعَ أَوْلَادِهِمْ»
“সন্তান যখন কিছুটা বড় হয়ে ভালো-মন্দের তফাত বুঝতে শেখে, তখন থেকেই বাবা-মায়ের উচিত তাকে দীনি শিক্ষায় গড়ে তোলা। এ সময় তাকে পবিত্র কুরআন ও সহজ কিছু হাদিস পড়ানো দরকার। পাশাপাশি অজু ও নামাজের নিয়ম এবং ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা ও খাওয়া-দাওয়ার মতো প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় দোয়া-জিকিরগুলো শিখিয়ে দেওয়া জরুরি।
যেহেতু এই বয়সে শিশুরা আদেশ-নিষেধের অর্থ বুঝতে পারে, তাই তাদের যেমন ভালো কাজের অভ্যাস করাবেন, তেমনি মিথ্যা বলা বা চোগলখুরির মতো মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখবেন এবং বুঝিয়ে বলবেন কেন এগুলো করা যাবে না। ছোটবেলা থেকেই এভাবে দীক্ষা দিলে সন্তান সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে এবং স্বভাবগতভাবেই ভালো কাজের প্রতি অনুরাগী হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বটি থেকে অনেকেই উদাসীন থাকেন, যা মোটেও ঠিক নয়।”[আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৯৭, প্রশ্ন ৪২১]
◈ ২. বাল্যকাল থেকেই নামাজের আদেশ করা:
সন্তানের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন সে আশপাশের অনেক কিছুই বুঝতে শেখে। তাই অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এই বয়স থেকেই তাকে হাতে-কলমে অজু শেখানো, নিয়মিত সালাত বা নামাজের তাগিদ দেওয়া এবং মাঝেমধ্যে সঙ্গে করে মসজিদে নিয়ে যাওয়া। আর বয়স যখন দশ বছর হয়, তখন সালাতের ব্যাপারে আরও একটু কড়াকড়ি করতে হবে; প্রয়োজনে হালকা শাসনও করা যেতে পারে। ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের কারণে সন্তানের মনে সালাতের প্রতি যেমন ভালোবাসা জন্মাবে, তেমনি তা ছেড়ে দেওয়া বা অবহেলা করার ভয়ও তৈরি হবে। ফলে সে বড় হয়ে সাবালক হলে ইনশাআল্লাহ সালাতের ব্যাপারে নিজে থেকেই যত্নশীল হয়ে উঠবে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ»
“তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও। দশ বছর হলে (নামাজ না পড়লে) এর জন্য তাদের শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।”[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫। হাদিসটি সহিহ]
◈ ৩. বাল্যকাল থেকে রোজা রাখতে অভ্যস্ত করা:
বাচ্চাদের বাল্যকাল থেকে রোজার অভ্যাস গড়ে তোলাও সাহাবিদের আমল ছিল। রুবাইয়্যি বিনতু মুআওবিয (রাদিয়াল্লাহু আনহা) আশুরার রোজা প্রসঙ্গে বলেন:
«فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الْإِفْطَارِ»
“এরপর আমরা সেই দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। আমরা তাদের জন্য উল দিয়ে খেলনা বানিয়ে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে ইফতারের সময় না হওয়া পর্যন্ত তাকে সেই খেলনা দিতাম।”[সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯৬০]
সাবালক হওয়ার আগে সালাত, সিয়াম বা ইসলামের অন্য কোনো বিধিবিধান শিশুদের ওপর ফরজ বা আবশ্যক হয় না। তবে এই বয়সের পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ বড় হওয়ার পর শরিয়তের হুকুম-আহকাম মেনে চলা তাদের জন্য অনেক সহজ করে দেয়।
◈ ৪. সৎ সঙ্গী নির্বাচন:
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ»
“মানুষ তার বন্ধুর দীনের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।”[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৩৩; জামে তিরমিজি, হাদিস ২৩৭৮। হাদিসটি হাসান]
প্রবাদ আছে, “সঙ্গীই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়।” আরও বলা হয়, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। এটা বাস্তবসম্মত কথা। বাবা-মা যদি সন্তানের ভালো বন্ধু বা সঙ্গী বেছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকেন, তবে তাঁদের অনেক বাড়তি কষ্ট ও দুশ্চিন্তা কমে যায়। একজন ভালো বন্ধু সব সময় মানুষের কল্যাণই কামনা করে; সে আল্লাহর আনুগত্যে সময় কাটাতে উদ্বুদ্ধ করে, মঙ্গলের পথ দেখায় এবং অন্যায় থেকে দূরে রাখে। পক্ষান্তরে অসৎ সঙ্গী কেবল অকল্যাণের দিকে টানে, ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে, পাপকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।
◈ ৫. নয় থেকে বারো বছর বয়সীরা চারপাশের গোপনীয় বিষয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে, আর শিশুদের কৌতূহলী মন চারপাশ থেকে সবকিছু খুব দ্রুত গ্রহণ করে। তাই এ সময় সন্তানদের সামনে মা-বাবার রোমান্টিক বা প্রাপ্তবয়স্কদের কথাবার্তা ও আচরণ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।
◈ ৬. ঘরের ভেতরে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক শালীন পোশাক বজায় রাখা উচিত। তাদের সামনে অতিরিক্ত খোলামেলা বা অশালীন পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা জরুরি, যাতে শিশুদের মনে কোনো অনভিপ্রেত কৌতূহল বা নেতিবাচক মানসিক প্রভাব না পড়ে।
◈ ৭. এই বয়সের ছেলেমেয়েদের নিজেদের মধ্যেও খোলামেলা চলাফেরা ও পারস্পরিক মেলামেশা, খেলাধুলা বা গেমস, নির্জনতা অবলম্বন করা এবং পরিবারের বড় সদস্য ছাড়া আলাদাভাবে ইউটিউবে বা টিভিতে নাটক-সিনেমা দেখা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মনে রাখা দরকার, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় আরও কম বয়সে বুঝমান ও প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তাই তাদের বিষয়টি প্রত্যেক অভিভাবকের আরও গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ রাখা অপরিহার্য। এমনকি নির্জন ঘরে একাকীও তাদের হাতে উন্মুক্তভাবে ইন্টারনেট ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
◈ ৮. ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের বয়স দশ হলে তাদের বিছানা আলাদা করে দিতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ»
“তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও। দশ বছর হলে (নামাজ না পড়লে) এর জন্য তাদের শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।”[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫। হাদিসটি সহিহ] তাই এই বয়সের বালকদের শোয়ার ঘর বা বিছানার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও আলাদা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা পরিবারের বড়দের দায়িত্ব।
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়ায় এসেছে:
«لَا يَجُوزُ لِلْأَوْلَادِ الذُّكُورِ إِذَا بَلَغُوا الْحُلُمَ، أَوْ كَانَ سِنُّهُمْ عَشْرَ سَنَوَاتٍ: أَنْ يَنَامُوا مَعَ أُمَّهَاتِهِمْ، أَوْ أَخَوَاتِهِمْ فِي مَضَاجِعِهِمْ، أَوْ فِي فُرُشِهِمْ، احْتِيَاطًا لِلْفُرُوجِ، وَبُعْدًا عَنْ إِثَارَةِ الْفِتْنَةِ، وَسَدًّا لِذَرِيعَةِ الشَّرِّ»
“ছেলেরা বালেগ হলে অথবা তাদের বয়স দশ বছর হলে তাদের জন্য মা বা বোনদের সঙ্গে একই বিছানায় বা একই শয্যায় ঘুমানো জায়েজ নয়। এটি লজ্জাস্থানের হেফাজতের স্বার্থে, ফিতনা উসকে ওঠা থেকে দূরে থাকার জন্য এবং অনিষ্টের পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে।”[ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৪০৮]
◈ ৯. ঘরে প্রবেশের অনুমতি নেওয়া:
এই বয়সের ছেলেদের ঘরে প্রবেশের সময়, বিশেষ করে মা-বোন বা নারীদের ব্যক্তিগত কক্ষে যাওয়ার আগে, অনুমতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বড়দের উচিত। পবিত্র কুরআনে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ক্ষেত্রেও তিনটি নির্দিষ্ট সময়ে (ফজরের নামাজের আগে, দুপুরের বিশ্রামের সময় এবং ইশার নামাজের পরে) বড়দের কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ۚ مِّن قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُم مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِن بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ۚ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَّكُمْ ۚ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ ۚ طَوَّافُونَ عَلَيْكُم بَعْضُكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে প্রবেশের অনুমতি নেয়: ফজরের নামাজের আগে, দুপুরে যখন তোমরা (বিশ্রামের জন্য) পোশাক খুলে রাখো এবং ইশার নামাজের পরে। এই তিনটি সময় তোমাদের জন্য গোপনীয়তার সময়। এই তিন সময়ের পর (অনুমতি ছাড়া আসা-যাওয়ায়) তোমাদের ও তাদের কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো বারবার আসা-যাওয়া করতেই হয়। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”[সুরা নূর: ৫৮]
◈ ১০. সঠিক জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা:
এই বয়সে শিশুদের মনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করে। তাই অভিভাবকদের উচিত ধমক বা তিরস্কার না করে স্নেহ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাদের শালীনতা বজায় রাখা ও সতর ঢাকার ব্যাপারে এবং মাহরাম-গাইরে মাহরাম সম্পর্কে সচেতন করা।
◈ ১১. এই বয়সের শিশুদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় ইসলামি শিষ্টাচার গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যেমন:
বড়দের দেখামাত্র সুন্দরভাবে সালাম দেওয়া, ছোটদের স্নেহ করা এবং বয়সে বড়দের যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। কারও ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া এবং বাইরে থেকে তিনবার সালাম দেওয়া; ভেতর থেকে সাড়া পেলে প্রবেশ করা, আর সাড়া না পেলে ফিরে যাওয়া। বড়দের সঙ্গে কথা বলার সময় আওয়াজ নিচু রাখা, ধীরস্থিরভাবে কথা বলা, তাদের কথার মাঝখানে অপ্রাসঙ্গিকভাবে কথা না বলা এবং সম্মানজনক সম্বোধন করা। মজলিসে বা বসার জায়গায় অন্যদের জন্য জায়গা করে দেওয়া, কারও চলাচলে বা বসায় কষ্ট হয় এমনভাবে না বসা এবং চলাফেরায় বিনয় বজায় রাখা। বিনা প্রয়োজনে অন্যের ব্যক্তিগত কক্ষে উঁকি না দেওয়া, গোপনীয় বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ না করা এবং অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিসপত্র ব্যবহার না করা। মেহমানদের সম্মান করা ইত্যাদি।
◈ ১২. ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মনে মহান আল্লাহর তাওহিদ তথা একত্ববাদের ধারণা গেঁথে দেওয়া এবং শিরক থেকে দূরে থাকার মৌলিক শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মহাগ্রন্থ কুরআনে লুকমান হাকিমের তাঁর সন্তানকে দেওয়া উপদেশগুলোর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর সন্তানকে ডেকে বলেছিলেন:
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
“স্মরণ করো, যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না; নিশ্চয়ই শিরক বড় ধরনের জুলুম।'” [সুরা লুকমান: ১৩]
কুরআনের এই সুমহান শিক্ষা ও আদব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে সুরা লুকমানের ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াত পড়ুন। তৎসঙ্গে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ এবং বিদআত থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত সুন্নাহ পালনে তাদের অভ্যস্ত করে তোলা এবং ইসলামি জীবনবোধ ও সুশিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতা গড়ে তোলাও আবশ্যক।
শিশুদের সুন্নাহ শেখানোর কয়েকটি সহজ উদাহরণ:
(১) বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে খাওয়া এবং এক প্লেটে খেতে বসলে নিজের সামনের দিক থেকে খাওয়ার অভ্যাস করানো:
উমর ইবনে আবি সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন ছোট বালক। তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
«يَا غُلَامُ، سَمِّ اللَّهَ، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ»
“হে বালক, আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছের দিক থেকে খাও।”[সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৩৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২২]
(২) শিশুদেরও সালাম দেওয়া:
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একদল শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন:
«كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَفْعَلُهُ»
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমনটি করতেন।”[সহিহ বুখারি, হাদিস ৬২৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৬৮]
বড়রা শিশুদের আগে সালাম দিলে শিশুরাও সালামে অভ্যস্ত হয়। ঘরে ঢোকার সময় এবং কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিতে বলুন।
(৩) ডান দিক থেকে শুরু করা:
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
«كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِي تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُورِهِ، وَفِي شَأْنِهِ كُلِّهِ»
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন করা এবং সব কাজেই ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন।”[সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৮]
তাই খাওয়া, পান করা, জুতা বা পোশাক পরা, অজু করা এবং কাউকে কিছু দেওয়া বা কারও কাছ থেকে নেওয়ার মতো সম্মানজনক কাজে ডান হাত বা ডান দিক ব্যবহারের চমৎকার অভ্যাসটি ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।
(৪) হাঁচির আদব:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَلْيَقُلِ: الْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلْيَقُلْ لَهُ أَخُوهُ أَوْ صَاحِبُهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ، فَإِذَا قَالَ لَهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ، فَلْيَقُلْ: يَهْدِيكُمُ اللَّهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ»
“তোমাদের কেউ হাঁচি দিলে সে যেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। তার ভাই বা সাথি যেন তাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে। এরপর সে যেন বলে ‘ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম’।”[সহিহ বুখারি, হাদিস ৬২২৪]
(৫) পাশাপাশি আরও কিছু সুন্নাহ-সম্মত আমলে অভ্যস্ত করে তোলা দরকার। যেমন: মাঝেমধ্যে নফল রোজা রাখা, নিয়মিত মিসওয়াক করা, বাথরুমে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় এবং মসজিদে আসা-যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট দোয়াগুলো পড়া। এ ছাড়া খেলাধুলা শুরু করার সময় কিংবা পড়তে ও লিখতে বসার আগে “বিসমিল্লাহ” বলে কাজ শুরু করার মতো সুন্দর অভ্যাসগুলো ছোটবেলা থেকেই তাদের ভেতরে গেঁথে দিতে হবে।
বাবা-মায়ের উচিত সোনামনিদের ছোটবেলা থেকেই এই সুন্দর কথাগুলো শিখিয়ে দেওয়া:
◈ ১৩. বাবা-মায়ের উচিত সোনামনিদের ছোটবেলা থেকেই এই সুন্দর কথাগুলো শিখিয়ে দেওয়া:
ক. আমাদের দেশের প্রচলিত নিয়ম-কানুন ও আইন মেনে চলা আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব। আইন অমান্য করা যাবে না।
খ. সমাজের যেকোনো মানুষের বিপদে-আপদে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সবসময় মানুষের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে।
গ. সবার কল্যাণে কাজ করার মনমানসিকতা তৈরি করতে হবে, যাতে আমাদের দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি না হয়।
ঘ. কখনো কাউকে নিয়ে ঠাট্টা, উপহাস বা অবহেলা করা যাবে না। সবাইকে সমান সম্মান করতে হবে।
ঙ. গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষের কষ্ট দেখলে তাদের প্রতি মায়া ও সমবেদনার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
চ. নিজের যতই সামর্থ্য বা সুযোগ থাকুক না কেন, অন্যের ধন-সম্পদের প্রতি কখনো লোভাতুল দৃষ্টি দেওয়া যাবে না। সব সময় সততা ও নৈতিকতা বজায় রেখে চলতে হবে।
◈ ১৪. সন্তান বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকা:
বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছানো ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে সচেতন হতে হলে আগে জানা দরকার, শরিয়তের দৃষ্টিতে কখন একজন বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) গণ্য হয়। কারণ বালেগ হওয়ার পর থেকেই নামাজ, রোজা ও পর্দাসহ শরয়ি বিধিবিধান পূর্ণভাবে তার ওপর বর্তায়। আবার অনেক সময় সন্তান বালেগ হয়ে গেলেও অভিভাবকেরা তা টের পান না এবং আগের মতোই অসতর্ক থাকেন। তাই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রত্যেক অভিভাবকের জন্য জরুরি।
✪ ফকিহগণের মতে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আলামত নিম্নরূপ:
ছেলেদের ক্ষেত্রে নিচের তিনটির যেকোনো একটি পাওয়া গেলে ছেলে বালেগ গণ্য হবে:
১. হিজরি বা চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী পনেরো বছর পূর্ণ হওয়া,
২. কামভাব বা উত্তেজনার সঙ্গে স্বপ্নদোষ হওয়া,
৩. লজ্জাস্থানের চারপাশে শক্ত ও কর্কশ লোম গজানো।
মেয়েদের ক্ষেত্রেও ছেলেদের উল্লিখিত তিনটি আলামতই প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি আরও একটি আলামত রয়েছে। তা হলো ঋতুস্রাব (হায়েজ) শুরু হওয়া। পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার আগে হায়েজ শুরু হলেও সে বালেগ গণ্য হবে।
✪ বালেগ হওয়ার পর শরিয়তের বিধান কার্যকর হয়:
ছেলে বা মেয়ে বালেগ হলে তার ওপর শরিয়তের যাবতীয় বিধান কার্যকর হয়। নামাজ, রোজা, পর্দাসহ সব আদেশ-নিষেধ তখন তার ওপর বর্তায়। বালেগ হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার আমলনামা লেখার কলম উঠিয়ে রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ»
“তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জেগে ওঠে; বালক, যতক্ষণ না সে বালেগ হয়; এবং পাগল, যতক্ষণ না সে জ্ঞান ফিরে পায়।”[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৪০৩; জামে তিরমিজি, হাদিস ১৪২৩। হাদিসটি সহিহ] এ কারণে সন্তান কখন বালেগ হচ্ছে, তা জানা এবং সে অনুযায়ী তাকে গড়ে তোলা অভিভাবকদের দায়িত্ব।
◈ ১৫. বিয়ের উপযুক্ত করে দ্রুত বিয়ে করানো:
আমাদের নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবকদের এ বিষয়ে সম্বোধন করেছেন। এই বয়সে তাদের “যুবক” নামে সম্বোধন করার মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে যে বিয়ের মাধ্যমে দৃষ্টিকে হারামের দিকে যাওয়া থেকে এবং লজ্জাস্থানকে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে হেফাজত করা যায়।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَبَابًا لَا نَجِدُ شَيْئًا، فَقَالَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ؛ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ»
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আমরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে যুবক অবস্থায় ছিলাম, আমাদের কিছুই ছিল না। তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের বললেন: ‘হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টিকে অধিক অবনতকারী এবং লজ্জাস্থানকে অধিক সুরক্ষাকারী। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।'”[সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৭৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০০]
মহান আল্লাহ আমাদের সন্তানদেরকে সৎ, চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: