আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, ৯, ১০, ১১, ১২ বা এর কাছাকাছি বয়সের শিশুদের সামনে পিতামাতা বা ও বড়রা বেশ উদাসীন থাকেন। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী এই বয়সি সন্তানের সামনে নিজেদের একান্ত বা রোমান্টিক আচরণ প্রকাশ করে ফেলেন। আবার অনেক নারীও এই বয়সি বালকদের সামনে পোশাক-আশাকের ব্যাপারে অসচেতন থাকেন। অথচ এই বয়সের শিশুরা কেবল শারীরিক ও মানসিকভাবে বড়ই হয় না বরং চারপাশের পরিবেশ, প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ এবং গোপনীয় বিষয়গুলো খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতে ও বুঝতে শুরু করে। আমাদের মনে রাখা আবশ্যক যে, দশ বছর বয়স বা এর কাছাকাছি বয়সী যে সমস্ত বালক নারীদের গোপন বিষয় বা স্ত্রী-সহবাস সম্পর্কে জ্ঞান রাখে বা নারীদের গোপন বিষয় ও শারীরিক গঠনের পার্থক্য বুঝতে পারে তাহলে তাদের সামনে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মতো পর্দা করা আবশ্যক। অর্থাৎ নারীদের জন্য তাদের সামনে হিজাব ও সাধারণ শরয়ি পর্দা রক্ষা করা জরুরি। কিন্তু যদি এসব বিষয়ে সে অবুঝ হয় তবে শরিয়তে কিছুটা ছাড় রয়েছে। ফিকাহবিদদের মতে, যে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকদের মধ্যে নারীদের প্রতি কোনো জৈবিক চাহিদা বা আকর্ষণ তৈরি হয়নি এবং যারা এ বিষয়ে এখনো অজ্ঞ ও অসচেতন, তাদের সামনে নারীদের পর্দার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে। তবে ফিতনার আশঙ্কা ও সতর্কতার খাতিরে বালকের বয়স নয়-দশ বছর হলে তার সামনেও পর্দা রক্ষা, সতর্কতা অবলম্বন করা এবং শালীনতা রক্ষা করা উচিত।
মহান আল্লাহ মহাগ্রন্থ কুরআনে ইরশাদ করেন:
أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ
“অথবা এমন শিশু, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে এখনো অবগত হয়নি।” [সূরা নূর: ৩১]
এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে ইবনে কাসির (রাহ.) বলেন:
«أَيْ: لِصِغَرِهِمْ لَا يَفْهَمُونَ أَحْوَالَ النِّسَاءِ وَعَوْرَاتِهِنَّ، مِنْ كَلَامِهِنَّ بِالتَّخَضُّعِ فِي الْكَلَامِ وَالْمِشْيَةِ وَالْحَرَكَاتِ وَالسَّكَنَاتِ، فَإِذَا كَانَ الطِّفْلُ صَغِيرًا دُونَ ذَلِكَ فَلَا بَأْسَ بِدُخُولِهِ عَلَى النِّسَاءِ، فَأَمَّا إِنْ كَانَ مُرَاهِقًا أَوْ قَرِيبًا مِنْهُ، بِحَيْثُ يَعْرِفُ ذَلِكَ وَيَدْرِيهِ وَيُفَرِّقُ بَيْنَ الشَّوْهَاءِ وَالْحَسْنَاءِ، فَلَا يُمَكَّنُ مِنَ الدُّخُولِ عَلَى النِّسَاءِ»
“অর্থাৎ ছোট বয়সের কারণে এই শিশুরা নারীদের অবস্থা ও গোপন বিষয়গুলো বোঝে না। নারীদের কোমল কণ্ঠে কথা বলা, চলার ভঙ্গি এবং নড়াচড়া ও স্থির থাকার ধরন সে ধরতে পারে না। তাই শিশু এতটা ছোট হলে নারীদের কাছে তার আসতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সে যদি মুরাহিক (বালেগ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা কিশোর) হয় অথবা এর কাছাকাছি বয়সের হয় ফলে এসব বুঝতে পারে এবং সুন্দরী ও অসুন্দরীর পার্থক্য করতে পারে তাহলে তাকে নারীদের কাছে যেতে দেওয়া যাবে না।”[তাফসির ইবনে কাসির, সূরা নূর: ৩১]
মোটকথা হলো, যে বালক নারীদের গোপন বিষয় ও শারীরিক গঠনের পার্থক্য বোঝে এবং এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে তার ক্ষেত্রে আয়াতে বর্ণিত ছাড় প্রযোজ্য নয়। এমন বুঝমান বালকের সামনে ফিতনা থেকে বাঁচতে নন মাহরাম পুরুষের মতোই পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। আর যে বালক এখনো এসব বিষয়ে একেবারেই অবুঝ তার সামনে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও সতর্কতার খাতিরে নয়-দশ বছর বয়স থেকেই পর্দার প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত।
❑ ফতওয়ায়ে শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.): অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের সামনে নারীর মুখমণ্ডল খোলার বিধান:
প্রশ্ন: দশ বছর বয়সী একটি বালকের সামনে কি নারীর মুখমণ্ডল খোলা জায়েজ?
উত্তর: ছেলে বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়ার আগ পর্যন্ত তার সামনে পর্দা করা ওয়াজিব নয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ
“আর তোমাদের সন্তানেরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে, তখন তারা যেন অনুমতি চায়, যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি চেয়েছে।” [সূরা নূর :৫৯]
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরই কেবল তাদের থেকে পর্দা করতে হয়। এর আগে সব সময় পর্দা করা জরুরি নয়। সাধারণত দশ বছর বয়সী বালক স্বপ্নদোষের বয়সে পৌঁছায় না (বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হয় না)। এই বয়সে কারও কারও স্বপ্নদোষ হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ছোটই থাকে। ছেলেটি যদি বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি হয় তবে সতর্কতাবশত নারী তার সামনে পর্দা করলে সেটি উত্তম। অন্যথায় পর্দা করা আবশ্যক নয়। তবে নিশ্চিতভাবে জানা গেলে ছেলেটি বালেগ বলে গণ্য হবে এবং তার সামনে পর্দা করা ফরজ হয়ে যাবে যদি:
ক. তার বয়স পনেরো বছর পূর্ণ হয়।
খ. কামভাবসহ স্বপ্নদোষ হয়।
গ. অথবা লজ্জাস্থানের চারপাশে শক্ত লোম গজায়।
(অর্থাৎ ছেলেদের ক্ষেত্রে এ তিনটি যে কোনও একটি বিষয় থাকলে তাকে শরিয়তের দৃষ্টিতে বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হবে)
✪ অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম:
অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ۚ مِنْ قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُمْ مِنَ الظَّهِيرَةِ وَمِنْ بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ۚ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَكُمْ ۚ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ ۚ طَوَّافُونَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখনো বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে প্রবেশের অনুমতি নেয়: ফজরের নামাজের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখো এবং ইশার নামাজের পরে। এই তিনটি সময় তোমাদের জন্য গোপনীয়তার সময়। এই তিন সময়ের পরে (বিনা অনুমতিতে আসায়) তোমাদের ও তাদের কোনো গুনাহ নেই। তোমাদের তো একে অপরের কাছে বারবার আসা-যাওয়া করতেই হয়।” [সূরা নূর :৫৮]
সারকথা হলো, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকেরা ওই তিন সময়ে (ফজরের আগে, দুপুরে ও ইশার পরে) ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেবে। আর বালেগ ব্যক্তি সব সময়ই অনুমতি নেবে। [সূরা নূর :৫৯]।
এর উদ্দেশ্য হলো, নারী যেন তাদের সামনে আসার আগেই নিজেকে প্রস্তুত করার ও পর্দা করার সুযোগ পান।
ছেলেটি বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি হলে তার সামনে পর্দা করা অধিক সতর্কতার অংশ। কারণ সে হয়তো বালেগ হয়ে গেছে অথচ নারী তা জানেন না। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ
“যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহমুক্ত, তা গ্রহণ করো।”[সুনানুত তিরমিজি, হাদিস ২৫১৮; সুনানুন নাসায়ি, হাদিস ৫৭১১। হাদিসটি সহিহ]
অতএব, বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বালকের সামনে নারী যদি সতর্কতাবশত নিজেকে আবৃত রাখেন তবে সেটি উত্তম ও নিরাপদ। তবে বালেগ না হওয়া পর্যন্ত তা ওয়াজিব নয়।” [binbaz]
❑ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল উসাইমিন (রাহ.)-এর ফতোয়া:
শিশুর সামনে নারীর পর্দা কখন ওয়াজিব হয়?
প্রশ্ন: হে ফজিলাতুশ শায়খ, কত বছর বয়সে পৌঁছলে শিশুর সামনে নারীর পর্দা করা ওয়াজিব হয়? এর নির্দিষ্ট বয়সসীমা কত?
উত্তরে শায়খ বলেন,
“আল্লাহ তাআলা এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করেননি। বরং যাদের সামনে সৌন্দর্য গোপন রাখা ওয়াজিব, তাদের তালিকায় তিনি বলেছেন:
أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ
“অথবা এমন শিশু, যারা নারীদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অবগত হয়নি।” [সূরা নূর :৩১]।
সুতরাং যে শিশুর সামনে পর্দা করতে হয় না, সে হলো এমন শিশু, যার নারীদের বিষয়ে কোনো জ্ঞান বা আগ্রহ নেই। এটি শিশুদের সহজাত প্রবৃত্তি ও শারীরিক বৃদ্ধির তারতম্য অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে:
– কোনো শিশু নয় বছর বয়সে পৌঁছালে নারীদের বিষয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের যা হয় তার ক্ষেত্রেও তা হতে পারে।
– আবার কোনো শিশু এগারো বছর বয়সে পৌঁছে যায় অথচ সে এসব বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায় না, এদিকে তাকায়ও না এবং তার মনও এদিকে ধাবিত হয় না।
এছাড়া পরিবেশও প্রভাব ফেলে। শিশু যদি এমন লোকদের মাঝে থাকে যারা নারীদের বিষয়ে এবং এ-জাতীয় কথাবার্তা বেশি আলোচনা করে তাহলে তার মধ্যে এই প্রবৃত্তি দ্রুত বিকশিত হয়। আর যদি সে এমন লোকদের মাঝে থাকে যারা এসব বিষয়ে আলোচনা করে না বরং অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলে তাহলে তার মধ্যে এই প্রবৃত্তি দুর্বল থাকে এবং সে এতে গুরুত্ব দেয় না।
সারকথা: আমাদের উচিত, শিশুর অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখা। যদি দেখা যায় সে নারীর দিকে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকায়, অথবা আমরা বুঝতে পারি সে এমন কিছু খোঁজে বা স্পর্শ করে, যা তার মধ্যে কামনার উপস্থিতি নির্দেশ করে তাহলে তার সামনে পর্দা করা ওয়াজিব। আর যদি সে এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে তাহলে পর্দা করা ওয়াজিব নয়। তবে নিঃসন্দেহে শিশু দশ বছর বয়সে পৌঁছালে সাধারণত তার মধ্যে এই প্রবৃত্তি বিকশিত হয়ে থাকে। (সুতরাং এ ধরণের বালকদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি)।[সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল: صوت العلماء] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।