ইসলাম কেবল অপরিচিত বা দূরবর্তী দরিদ্র মানুষকে দান-সদকা করার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয় না; বরং নিজ স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়ের জন্য ব্যয় করাকেও ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। সঠিক নিয়ত থাকলে পরিবারের পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি পয়সাও আল্লাহর দরবারে ‘সদকা’ হিসেবে গণ্য হয়। সংসারের দৈনন্দিন খরচকে এভাবে সওয়াবের উপায়ে রূপ দেওয়া ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য। তাই পরিবার ও স্বজনের ভরণপোষণকে ভারী বোঝা মনে না করে সওয়াবের আশায় সাধ্যানুযায়ী তা সম্পাদন করা উচিত।
❑ পরিবারের ভরণপোষণ ওয়াজিব: অবহেলা করা কবিরা গুনাহ
এক জন পুরুষের জন্য তার স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ দেওয়া শরিয়তে ওয়াজিব।
মহান আল্লাহ বলেন:
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর যার সন্তান, তার ওপর কর্তব্য, ন্যায়সংগতভাবে তাদের (মায়েদের) খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা।” [সূরা বাকারা: ২৩৩]
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
«وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ»
“আর তোমাদের ওপর তাদের (স্ত্রীদের) অধিকার হলো, ন্যায়সংগতভাবে তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা।” [জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণিত বিদায় হজের দীর্ঘ হাদিসের অংশ হিসেবে এটি সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ১২১৮) এসেছে] তা ছেড়ে দেওয়া আল্লাহর আদেশে অবহেলা ও আমানতের খেয়ানত। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে অবহেলাকারীর গুনাহ অত্যন্ত গুরুতর (কবিরা গুনাহ) বলে উল্লেখ করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ»
“একজন মানুষের গুনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপর, সে তাদের নষ্ট (অসহায়) করে ছেড়ে দেয়।” [মুসনাদ আহমাদ; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৬৯২। সহিহ (আলবানি)]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
«كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يَحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ»
“একজন মানুষের গুনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, যার খাদ্যের দায়িত্ব তার হাতে, সে তাকে তা দেওয়া থেকে বিরত রাখে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৯৬]
❑ ব্যয়ের তালিকায় সবার আগে মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলুন, তোমরা যে কল্যাণকর বস্তু ব্যয় করো, তা তো মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। আর তোমরা যেকোনো ভালো কাজ করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা বাকারা: ২১৫]
আল্লাহ তাআলা ব্যয়ের খাতগুলো সাজিয়েছেন নিকট থেকে দূরের দিকে। প্রথমে মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজন, তারপর এতিম, মিসকিন ও মুসাফির। অতএব দান শুরু হবে নিজ পরিবার থেকে, সেখান থেকেই তা বাইরের দিকে প্রসারিত হবে।
❑ সামর্থ্যের বাইরে বোঝা নয়:
তবে এই দায়িত্ব পালনে সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা বহনের প্রয়োজন নেই। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ খরচ করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا
“বিত্তবান ব্যক্তি যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে এবং যার রিজিক সংকুচিত করা হয়েছে, সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করে। আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দায়িত্ব দেন না।” [সূরা তালাক: ৭]
❑ পরিবারের জন্য অর্থ খরচ সদকা তবে নিয়ত থাকা শর্ত:
আল্লাহর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ»
“কেউ সওয়াবের আশায় নিজ পরিবারের জন্য খরচ করলে তা তার জন্য সদকা হয়।” [সহিহ বুখারি: ৫৫; সহিহ মুসলিম: ১০০২]
এখানে মূল বিষয় হলো নিয়ত। খরচের ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা ও সওয়াব লাভের নিয়ত থাকলেই তা ইবাদতে পরিণত হয়। কিন্তু কেউ যদি কেবল স্বভাবজাত দায়িত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা পারিবারিক চাপে অর্থ খরচ করে, তাহলে সে এই সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।
❑ আত্মীয়কে দানে দ্বিগুণ সওয়াব:
সাধারণ মিসকিনের চেয়ে আত্মীয়কে দানের ফজিলত আরও বেশি। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ»
“মিসকিনকে দান করলে একটি সদকার সওয়াব হয়; আর আত্মীয়কে দান করলে দুটি সওয়াব পাওয়া যায়: সদকার সওয়াব এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার সওয়াব।” [জামে তিরমিজি: ৬৫৮; সুনানে নাসায়ি: ২৫৮২; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৪]
❑ প্রখ্যাত নারী সাহাবি জয়নব (রা.)-এর অনন্য দৃষ্টান্ত:
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী জয়নব (রা.) একবার নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দান-সদকার আহ্বান শুনে প্রশ্ন করলেন, তিনি যদি তাঁর নিজস্ব সম্পদ থেকে নিজ স্বামী ও তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম সন্তানদের জন্য ব্যয় করেন, তবে কি সদকার সওয়াব লাভ করবেন? তিনি বিলাল (রা.)-এর মাধ্যমে এই প্রশ্ন নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পাঠান।
উত্তরে নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
«لَهَا أَجْرَانِ: أَجْرُ الْقَرَابَةِ، وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ»
“তার জন্য দুটি সওয়াব রয়েছে: আত্মীয়তার সওয়াব এবং সদকার সওয়াব।” [সহিহ মুসলিম: ১০০০; সহিহ বুখারি: ১৪৬৬]
এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, উপার্জনক্ষম নারীও যদি তাঁর পরিবার বা নিকটাত্মীয় এতিমদের প্রয়োজনে ব্যয় করেন, তবে তিনিও দ্বিগুণ প্রতিদানে ভূষিত হবেন।
◯ এসব আয়াত ও হাদিস থেকে মৌলিক শিক্ষা:
১. স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা ইত্যাদি পরিবারের পেছনে ব্যয় করা কেবল সামাজিক বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়; বিশুদ্ধ নিয়ত থাকলে তা একটি ইবাদতে পরিণত হয় এবং সদকার সওয়াব লাভ হয়।
২. স্বজনদের দান করলে একসঙ্গে দুটি সওয়াব অর্জিত হয়: দানের সওয়াব এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় রাখার সওয়াব।
৩. সাধারণ দানকে ইবাদতে পরিণত করার প্রধান শর্ত হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। মূলত বান্দার সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
৪. খরচ করার ক্ষেত্রে ইসলাম অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে সাধ্য ও সামর্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়।
পরিশেষে:
সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া কিংবা মা-বাবার চিকিৎসার খরচ জোগানোকে অনেকেই ক্লান্তিকর বোঝা মনে করেন। অথচ নিয়তটা যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির, তবে এসব দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ই আখিরাতের পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়।
তাই পরিবারের পেছনে যেকোনো কেনাকাটা বা খরচের মুহূর্তে মনের নিয়তটুকু একটু ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। তাহলেই দুনিয়ার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আখিরাতের ঝুলিও সমৃদ্ধ হবে, ইনশাআল্লাহ।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।