প্রশ্ন: বর্তমানে অধিকাংশ গ্রোসারি ও কসমেটিক পণ্যের প্যাকেটে মানুষ, নারী ও প্রাণীর ছবি থাকে। ভেতরের পণ্য হালাল ও প্রয়োজনীয় কিন্তু প্যাকেজিংয়ে ছবি থাকে। এ অবস্থায় দোকানমালিকের জন্য এসব পণ্য বিক্রি করা কি জায়েজ হবে? তিনি কি গুনাহগার হবেন? এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?
উত্তর: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পণ্যের ভেতরের মূল উপাদান যদি হালাল, পাক-পবিত্র ও উপকারী হয় তবে প্যাকেটের গায়ে ছবি থাকার কারণে পুরো পণ্যটি হারাম হয়ে যায় না। সুতরাং প্যাকেজিংয়ে মানুষ, নারী বা প্রাণীর ছবি থাকা সত্ত্বেও ওইসব বৈধ ও প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েজ। এতে ক্রেতা, বিক্রেতা বা দোকানের মালিক গুনাহগার হবেন না। সাবান, শ্যাম্পু, তেল বা খাদ্যসামগ্রীর মতো পণ্য নিজে হালাল হলে তার ক্রয়-বিক্রয় উভয়ই জায়েজ যদিও প্যাকেটের গায়ে ছবি থাকে। কারণ ক্রেতা-বিক্রেতার উদ্দেশ্য ভেতরের পণ্য; ছবি এখানে গৌণ ও অনিচ্ছাকৃত বিষয়। এ ছাড়া পণ্য ব্যবহারের পর প্যাকেট ডাস্টবিনে বা আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হয়। তাই এখানে ছবির প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করা হয় না। ফলে এটি বড় কোনো গুনাহের কারণ নয়।যেমনটি হাদিসে ছবিযুক্ত বালিশ ব্যবহারের কথা আছে, যেখানে ছবি পদদলিত বা অবমাননাকর অবস্থায় থাকে।
◈ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) ছবিযুক্ত একটি গদি বা বালিশ কিনলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটি দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন; ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আয়েশা (রা.) তাঁর চেহারায় অপছন্দের ছাপ দেখে বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে তওবা করছি। আমি কী অপরাধ করেছি?” তিনি বললেন: «مَا بَالُ هَذِهِ النُّمْرُقَةِ؟» “এই বালিশের কী ব্যাপার?”
আয়েশা (রা.) বললেন: “আমি এটি আপনার জন্য কিনেছি, যাতে আপনি এতে বসতে পারেন ও হেলান দিতে পারেন।” তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
«إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ»
“এসব ছবির নির্মাতাদের কিয়ামতের দিন আজাব দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, ‘তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও।'”
আরও বললেন:
«إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ الصُّوَرُ لَا تَدْخُلُهُ الْمَلَائِكَةُ»
“যে ঘরে ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।”
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে,
فَأَخَذْتُهُ فَجَعَلْتُهُ مِرْفَقَتَيْنِ، فَكَانَ يَرْتَفِقُ بِهِمَا فِي الْبَيْتِ
“আয়েশা (রা.) সেটি কেটে দুটি ছোট বালিশ বানালেন আর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে সেগুলোতে হেলান দিতেন।” [সহিহ বুখারি (হাদিস ২১০৫) ও সহিহ মুসলিম (হাদিস ২১০৭)]
এ কথা অজানা নয় যে, বিভিন্ন পণ্যের গায়ে বা প্যাকেটে ছবি থাকার বিষয়টি বর্তমানে এ সমস্যা ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং এ থেকে বাঁচার উপায় নেই বললেই চলে। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘উমুমুল বালওয়া’ (এমন সাধারণ সমস্যা, যা থেকে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন) বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শরিয়ত মানুষের সমস্যাকে বিবেচনায় নেয়; অন্যথায় জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে দাঁড়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি।” [সূরা হাজ: ৭৮]
❑ এ অবস্থায় একজন সচেতন মুসলিম ব্যবসায়ী বা ক্রেতার জন্য করণীয়:
◆ ১. বাজারে একই মানের এমন পণ্য পাওয়া গেলে, যার প্যাকেটে কোনো প্রাণীর ছবি নেই সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
◆ ২. কোনো পণ্যের প্যাকেটে অত্যন্ত অশালীন বা আপত্তিকর নারীর ছবি, কিংবা বিধর্মীদের ধর্মীয় প্রতীক (ক্রুশ, দেবদেবীর ছবি ইত্যাদি) থাকল তার ওপর স্টিকার, মার্কারের কালি বা প্রাইস ট্যাগ লাগিয়ে ঢেকে দেওয়া।
◆ ৩. নিষিদ্ধ ছবিকে সম্মান প্রদর্শন করা কিংবা সাজিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকা।
❑ বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া:
✪ ১. শায়খ আল্লাম মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন:
« مَا عَمَّتْ بِهِ الْبَلْوَى الْآنَ ، مِنْ وُجُودِ الصُّوَرِ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مَا نَدَرَ ، فَتُوجَدُ فِي أَوَانِي الْأَكْلِ ، وَفِي الْكَرَاتِينِ الْحَافِظَةِ لِلْأَطْعِمَةِ ، وَفِي الْكُتُبِ ، وَفِي الصُّحُفِ ، فَتُوجَدُ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ، وَيُوجَدُ أَيْضًا صُوَرٌ مِمَّا يُؤْكَلُ : بَسْكُوتٌ عَلَى صُورَةِ سَمَكٍ ، أَوْ أَرْنَبٍ ؟
نَقُولُ : إِنِ اقْتَنَاهَا الْإِنْسَانُ لِمَا فِيهَا مِنَ الصُّوَرِ ( أَيْ لِأَجْلِ مَا فِيهَا مِنَ الصُّوَرِ ) فَلَا شَكَّ أَنَّهُ مُحَرَّمٌ , أَوْ كَانَ يَشْتَرِي الْمَجَلَّاتِ الَّتِي تُنْشَرُ فِيهَا الصُّوَرُ لِلصُّوَرِ ، فَهَذَا حَرَامٌ ، أَمَّا إِذَا كَانَتْ لِلْعِلْمِ وَالْفَائِدَةِ وَالِاطِّلَاعِ عَلَى الْأَخْبَارِ ، فَهَذِهِ أَرْجُو أَلَّا يَكُونَ بِهَا بَأْسٌ ، نَظَرًا لِلْحَرَجِ وَالْمَشَقَّةِ ، وَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : ﴿ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ﴾ ، فَهَذِهِ الصُّوَرُ لَيْسَتْ مَقْصُودَةً لِلْإِنْسَانِ حَالَ الشِّرَاءِ ، وَلَا تَهُمُّهُ ، كَمَا أَنَّ مَسْأَلَةَ الْأَوَانِي وَالْكَرَاتِينِ الَّتِي فِيهَا أَطْعِمَةٌ وَشِبْهُ ذَلِكَ ، قَدْ يُقَالُ : إِنَّ فِيهَا شَيْئًا مِنَ الِامْتِهَانِ ، فَلَا تَكُونُ مِنَ الْقِسْمِ الْمُحَرَّمِ »
“বর্তমানে এটি এমন এক সর্বব্যাপী সমস্যায় রূপ নিয়েছে যে, হাতেগোনা কিছু জিনিস বাদ দিলে প্রায় সবকিছুতেই ছবি দেখা যায়। খাবারের থালা-বাসন, খাদ্যদ্রব্যের কার্টন বা প্যাকেট, বইখাতা থেকে শুরু করে সংবাদপত্র—সবখানেই ছবি রয়েছে। এমনকি খাওয়ার জিনিসেও ছবি থাকে, যেমন: মাছ কিংবা খরগোশের আকৃতির বিস্কুট। এ বিষয়ে আমাদের কথা হলো: কেউ যদি কেবল ছবির টানে বা ছবি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এসব জিনিস ঘরে এনে রাখেন তবে তা নিঃসন্দেহে হারাম। একইভাবে কেউ যদি কেবল ছবি দেখার নিয়তেই ছবিযুক্ত ম্যাগাজিন কেনেন তবে তাও হারাম। তবে কেনাকাটা যদি জ্ঞান অর্জন, উপকার লাভ কিংবা খবর জানার উদ্দেশ্যে হয় তবে আশা করা যায় এতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এসব থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য। আর মহান আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা বা কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেননি।” [সূরা হজ: ৭৮]
তা ছাড়া এসব জিনিস কেনার সময় ছবিগুলো মানুষের মূল উদ্দেশ্য থাকে না এবং এ নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। একইভাবে ছবিযুক্ত থালা-বাসন ও কার্টনের ক্ষেত্রেও বলা যায় যে, এগুলোর কোনো সম্মান করা হয় না; বরং অবহেলা বা অবমাননাই করা হয়। সুতরাং এগুলো নিষিদ্ধ বা হারামের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” [আশ শারহুল মুমতি ২/২০৩]
✪ ২. আল্লামা শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
بَيْعُ السِّلَعِ الَّتِي فِيهَا تَصَاوِيرُ؛ فَالأَوْلَى أَنْ تَمْتَنِعَ عَنْ تَوْرِيدِ مَا فِيهِ تَصَاوِيرُ إِذَا وَجَدْتَ بَدِيلًا لَيْسَ فِيهِ تَصَاوِيرُ، فَهَذَا أَحْسَنُ. وَإِلَّا فَلَا بَأْسَ بِبَيْعِ الْكَثِيرِ مِنْهَا وَلَوْ كَانَتْ تَحْتَوِي عَلَى صُوَرٍ، لِأَنَّ الصُّوَرَ غَيْرُ مَقْصُودَةٍ؛ الْمَقْصُودُ هُوَ السِّلْعَةُ نَفْسُهَا. وَهَذِهِ الْأَغْلِفَةُ وَالظُّرُوفُ إِذَا اسْتُعْمِلَتِ السِّلْعَةُ فَإِنَّهَا تُهْدَرُ وَلَا قِيمَةَ لَهَا وَتُدَاسُ، إِذْ لَيْسَتْ مَقْصُودَةً بِالْبَيْعِ.
“যেখানে ছবিবিহীন বিকল্প পণ্য পাওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে ছবিযুক্ত পণ্য কেনাবেচা কিংবা আমদানি করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। তবে যদি কোনো বিকল্প না থাকে তাহলে পণ্যটি ছবিযুক্ত হলেও তা বেচাকেনায় কোনো বাধা নেই। কারণ এখানে ছবিগুলো আসল লক্ষ্য নয়; মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্যটি নিজে। পণ্য ব্যবহারের পর তো এর মোড়ক বা প্যাকেট ফেলে দেওয়া হয়, পায়ে মাড়ানো হয় এবং এগুলোর আলাদা কোনো মূল্য থাকে না। তা ছাড়া ক্রেতা তো আর ছবি কেনার জন্য আসেন না।” [উৎস: ইউটিউব চ্যানেল: العلامة الدكتور صالح الفوزان]
মোটকথা, ভেতরের পণ্য হালাল ও প্রয়োজনীয় হলে ছবিযুক্ত প্যাকেটের পণ্য বিক্রি জায়েজ। এতে মালিক গুনাহগার হবেন না। তবে সম্ভব হলে ছবিমুক্ত বিকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আপত্তিকর ছবি ঢেকে রাখা উত্তম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।