ধনীর সম্পদ আত্মসাৎ কি বৈধ? (তথাকথিত সাম্যবাদী ও মার্কসবাদীদের প্রতিবাদ)
প্রশ্ন: কুরআন ও হাদিসে কি এমন কোনো কথা আছে যে, ধনীদের সম্পদ আত্মসাৎ করা বা ধনী ব্যক্তিকে তার হক থেকে বঞ্চিত করা দোষনীয় নয়?
উত্তর: না, এমন কোনো কথা কুরআন বা হাদিসে নেই। বরং ইসলামে ধনী হোক বা দরিদ্র, যে কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা এবং কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ হারাম ও কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
❑ কারা এ ধরণের কথা বলে?
মূলতঃ উগ্র সাম্যবাদী ও চরমপন্থী মার্কসবাদীদের একটি অংশ মনে করে, ধনীদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। কার্ল মার্কসের ’উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব’ (Theory of Surplus Value)-কে তারা যুক্তি হিসেবে সামনে আনে। তাদের দাবি, ধনীদের বিপুল সম্পত্তি মূলত শ্রমিকদের রক্তঝরা পরিশ্রমের ফসল, যা তাদের ঠকিয়ে ও শোষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের মতে, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধনীদের হাতে থাকায় তারা সমাজকে বৈষম্যের জালে আটকে রাখে। এই যুক্তিতে চরমপন্থীরা মনে করে, যেভাবেই হোক ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নেওয়া অপরাধ নয়; বরং শোষিত মানুষের হাতছাড়া হওয়া হক ফিরিয়ে আনার এক বিপ্লব! কিন্তু বাস্তব দুনিয়া এই অরাজকতাকে প্রশ্রয় দেয় না। আধুনিক আইন, মানবাধিকার সংস্থা এবং ইসলামসহ পৃথিবীর কোনো ধর্মই অন্যের সম্পদ দখল সমর্থন করে না। কারও বৈধ উপার্জনে থাবা বসানো বা কাউকে জোর করে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা মারাত্মক অন্যায় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ। গরিবের জন্য ধনীদের সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার বিধান অবশ্যই আছে, যেমন জাকাত কিংবা সরকারি কর। কিন্তু এর বাইরে গায়ের জোরে কারও অর্জিত সম্পত্তিতে হাত দেওয়া স্পষ্টতই অবৈধ, অনৈতিক ও অপরাধ।
❑ ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি:
কুরআন-হাদিসের আলোকে ইসলামের দৃষ্টিতে ধনী-গরিব নির্বিশেষে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে জবর-দখল করা বা কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা হারাম, কবিরা গুনাহ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নিম্নে এ বিষয়ে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
আল্লাহ তাআলা অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বলেন,
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
“আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনেশুনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে (ঘুষ হিসেবে বা মিথ্যা মামলার মাধ্যমে) নিয়ে যেয়ো না।” [সূরা বাকারা: ১৮৮]
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজের ভাষণে বলেন:
إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا
“নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য তেমনই পবিত্র, যেমন পবিত্র আজকের এই দিন, এই মাস ও তোমাদের এই শহর।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম]
❑ ইসলামি আইনের চোখে ধনী-দরিদ্র সবাই সমান:
এক সম্ভ্রান্ত বংশের নারীর চুরির শাস্তি মওকুফের জন্য উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) সুপারিশ করলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসন্তুষ্ট হয়ে বলেন:
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর কোনো দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।” [সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫; সহিহ মুসলিম]
❑ অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের পরিণতি:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِنَّ رِجَالًا يَتَخَوَّضُونَ فِي مَالِ اللهِ بِغَيْرِ حَقٍّ، فَلَهُمُ النَّارُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“নিশ্চয়ই কিছু লোক আল্লাহর সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” [সহিহ বুখারি: ৩১১৮]
মোটকথা, কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা একবারে স্পষ্ট যে, সম্পদের মালিক ধনী হোন কিংবা দরিদ্র তাঁর স্পষ্ট অনুমতি বা শরিয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া তাঁর সম্পদ হস্তগত করা সম্পূর্ণ অবৈধ। ঠিক একইভাবে, কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করাও চরম জুলুম। আর ইসলামে জুলুম শুধু অপরাধই নয়, বরং এটি দুনিয়ায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং আখিরাতে ধ্বংসের কারণ। তথাকথিত সাম্যবাদ ও মার্কসবাদের মতো বস্তাপচা মতবাদগুলো মূলত ইসলাম, আধুনিক মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং যুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই এ ধরনের বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারাকে বর্জন ও প্রতিবাদ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।