মানুষকে গালি দেওয়ার ইসলামী বিধান ও পরকালীন পরিণতি

মানুষকে গালি দেওয়া: ইসলামের বিধান ও পরকালীন পরিণতি
প্রশ্ন: মানুষকে গালি দেওয়ার বিধান কী? ইচ্ছাকৃতভাবে বা অসতর্কতাবশত কাউকে গালি দিলে পরকালে তার পরিণতি ও শাস্তি কী?
উত্তর: ইসলাম মানুষকে ভদ্রতা, শালীনতা, উত্তম চরিত্র এবং মুখ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। তাই তো ইসলামে গালাগালি করা ও অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ হারাম। রাগের বশে হোক কিংবা ঠাট্টাচ্ছলে কোনো অবস্থাতেই এটি বৈধ নয়। এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি পাপ এবং ক্ষতিকর সামাজিক ব্যাধি। গালির মাধ্যমে অন্যের মান সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এবং মানুষ মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যা বান্দার হক নষ্ট করার শামিল। আর আলেমদের প্রসিদ্ধ অভিমত হলো, বান্দার হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ না চেয়ে নিলে কেবল আল্লাহর কাছে তাওবা করলেই তা মাফ হয় না। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
⚖️ ইসলামের দৃষ্টিতে গালি দেওয়ার বিধান:
প্রকৃত মুমিনের চরিত্রে গালাগালি, অশ্লীলতা ও কটুভাষার কোনো স্থান নেই। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ»
“মুমিন ব্যক্তি কখনো খোঁটাখুঁটি বা গালমন্দকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীল ও কটুভাষী হয় না।” [সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭]
💥 গালি দেওয়ার পরিণতি:
১. গালি দেওয়া ফাসেকের পরিচয়:
মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপাচার। গালিদাতা এর মাধ্যমে ফাসেক বা পাপিষ্ঠদের কাতারে শামিল হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
“মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপাচার আর তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪]
২. গালিদাতাকে আখিরাতে বিচারের কাঠগড়ায় গালির বদলা নেওয়া হবে:
গালির সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো, কিয়ামতের দিন গালিদাতার নেক আমল দুনিয়াতে সে যাকে গালি দিয়েছিল সেই মজলুমকে দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে মজলুমের পাপ গালিদাতার ওপর চাপানো হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন:
«أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟» قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ. فَقَالَ: «إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا… فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ»
“তোমরা কি জানো, দেউলিয়া কে?” তাঁরা বললেন, “আমাদের মধ্যে যার কোনো দিরহাম ও আসবাবপত্র নেই, সে-ই দেউলিয়া।” তখন তিনি বললেন, “আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে…। তখন তার নেক আমল থেকে এদের পাওনা মেটানো হবে। পাওনা মেটানোর আগেই তার নেক আমল শেষ হয়ে গেলে পাওনাদারদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১]
৩. গালির জবাবে গালি: উভয়কেই শয়তানের সাথে তুলনা:
একজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর গোত্রের এক লোক তাঁকে গালি দিলে তিনি কি প্রতিশোধ নিতে পারেন? ইয়াজ ইবনে হিমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«الْمُسْتَبَّانِ شَيْطَانَانِ يَتَهَاتَرَانِ وَيَتَكَاذَبَانِ»
“পরস্পর গালাগালকারী দুজন ব্যক্তি হলো দুটি শয়তান; তারা একে অপরকে অপদস্থ করে ও মিথ্যাচার করে।” [সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৭২৬; মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭৪৮৭]
৪. গালির মাধ্যমে মুমিনকে কষ্ট দেওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا»
“যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে তাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” [সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৮]
▪️উল্লেখ্য যে, ইসলামে কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, কারো মান-সম্মান নষ্ট করা, কাউকে খারাপ উপনামে সম্বোধন করা, নোংরা উপাধি দেওয়া, বংশপরিচয়ে আঘাত দেওয়া, অতীতের পাপ টেনে তাকে কলঙ্কিত করা, অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি ভয়াবহ গুনাহ।‌ এসব বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে যথেষ্ট আলোচনা এসেছে। তাই সার্বিকভাবে এসব বিষয়ে আমাদের সাবধান হওয়া জরুরি।
🔸 মুখ ফসকে বা অসতর্কতাবশত গালি দিয়ে ফেললে করণীয়:
অসতর্কতাবশত গালি দিলেও অন্যের হক নষ্ট হয়। তাই দ্রুত দুটি কাজ করা আবশ্যক:
১. লজ্জিত অন্তরে আল্লাহর কাছে তাওবা করা:
আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন:
«وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ»
“যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা নিজেদের ওপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আর আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করতে পারে?এবং তারা জেনেশুনে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অটল থাকে না।” [সুরা আলে ইমরান: ১৩৫]
২. যাকে গালি দেওয়া হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া:
গালি দেওয়া কারো ইজ্জত-সম্মানের ওপর জুলুম করার শামিল। এর ক্ষতিপূরণ কিয়ামতের কঠিন সময়ের আগেই দুনিয়াতেই চুকিয়ে নিতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلِمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»
“কারও ওপর তার ভাইয়ের ইজ্জত-সম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের দায় থাকলে সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয় সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। (সেদিন) তার নেক আমল থাকলে জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা থেকে নেওয়া হবে। আর নেক আমল না থাকলে তার (মজলুম) সঙ্গীর পাপ থেকে নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯, ৬৫৩৪]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমাদের পাপাচার থেকে জবানকে রক্ষা করার এবং মানুষের সাথে সুন্দর আচরণের তৌফিক দান করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: