নিজেকে ও অন্যকে গালি দেওয়ার বিধান: মুখে না বলে মনে মনে গালি দিলেও কি গুনাহ হবে?
প্রশ্ন: আমি কোনো ভুল করলে নিজেকে তিরস্কার করে “পাগল”, “মূর্খ”, “অপদার্থ” বলে গালি দিই। ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিধান কী? আমি কাউকে সামনাসামনি বা মুখের ওপর গালি দেই না। কিন্তু কয়েক মাস আগে আমার একজন বিশ্বস্ত মানুষ আমার আমানতের খেয়ানত করেছে এবং আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার কথা মনে পড়লে আমার প্রচণ্ড রাগ হয় এবং আমি তাকে মনে মনে গালি দিই। এটা কি আমার জন্য বৈধ হবে?
উত্তর: নিম্নে সংক্ষেপে আপনার দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
নিজেকে “মূর্খ”, “পাগল” বা “অপদার্থ” বলা ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী, তাই এটি বর্জন করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন এবং সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। নিজের প্রতি কটু ভাষা ব্যবহার করলে এই মর্যাদার প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের সম্পর্কেও অশোভন শব্দ বলতে নিষেধ করেছেন:
«لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: خَبُثَتْ نَفْسِي، وَلَكِنْ لِيَقُلْ: لَقِسَتْ نَفْسِي»
“তোমাদের কেউ যেন না বলে, ‘আমার আত্মা খবিস (নিকৃষ্ট) হয়ে গেছে’; বরং সে বলুক, ‘আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেছে’।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৫০]
ভুল হয়ে গেলে নিজেকে তিরস্কার না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তারপর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যান।
চাইলে নিচের এই কথাটি বলতে পারেন, যা সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে:
«قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ»
“আল্লাহর নির্ধারণই হয়েছে, আর তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪]
এটি নিজের সম্পর্কে করা একধরনের নেতিবাচক ভাবনা, যা মানুষের আত্মবিশ্বাস ও মনের ভেতরের শক্তি কমিয়ে দেয়।
কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া গর্হিত কাজ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
“মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক (গুনাহ) আর তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪]
তবে এখানে গালি বলতে মুখে উচ্চারিত গালিই বোঝানো হয়েছে। যে কথা কেবল মনের ভেতরে আসে তার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে ছাড় দিয়েছেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ أَوْ حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে আসা ওয়াসওয়াসা ও মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৭]
সুতরাং বিশ্বাসঘাতকের কথা মনে পড়লে অনিচ্ছায় যে রাগ বা কটু চিন্তা আসে তার জন্য গুনাহ লেখা হবে না যতক্ষণ তা মুখে বা কাজে প্রকাশ না পায়। আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। তাই এই ক্ষোভ স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি।
আল্লাহ তাআলা মজলুমকে অন্যায়ের কথা বলার অনুমতিও দিয়েছেন:
﴿لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ﴾
“আল্লাহ মন্দ কথার প্রকাশ্য উচ্চারণ পছন্দ করেন না তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে (সে ছাড়া)।” [সুরা নিসা: ১৪৮]
এর অর্থ হলো, আপনি আইনি ও শরিয়তসম্মত পথে নিজের অধিকার আদায় করতে পারেন আর আল্লাহর কাছে বিচারও চাইতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার মনে মনে গালি দেওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা ঠিক নয়। এতে অন্তরে ঘৃণা ও অস্থিরতা জমে থাকে আর কখনো অসতর্কভাবে মুখেও বেরিয়ে যেতে পারে।
রাগের মুহূর্তে বিষয়টি আল্লাহর ওপর সঁপে দিয়ে বলুন:
﴿حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ﴾
“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।” [সুরা আলে ইমরান: ১৭৩]
সম্ভব হলে ক্ষমা করে দেওয়া সর্বোত্তম এবং এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾
“অতএব যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধন করে তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।” [সুরা শুরা: ৪০]
নিজেকে গালি দেওয়া পরিহার করা উচিত। অন্যকে মুখে গালি দেওয়া নাজায়েজ। মনের ভেতরে অনিচ্ছাকৃতভাবে আসা কথার জন্য পাকড়াও হবে না, তবে তা অভ্যাসে পরিণত না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা ও সম্ভব হলে ক্ষমা করাই উত্তম। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।