খাবারে মসলা হিসেবে জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহারের শরয়ি বিধান

খাবারে মসলা হিসেবে জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহারের বিধান নিয়ে ফকিহ ও আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে। একদল আলেমের মতে স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য সামান্য পরিমাণ ব্যবহার জায়েজ। অন্য একদল আলেমের মতে তা জায়েজ নয়। মূল বিতর্কটি গড়ে উঠেছে এই হাদিসের প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে, যা বেশি খেলে নেশা হয় তার অল্প পরিমাণও হারাম কি না।
উল্লেখ্য, জয়ত্রী জায়ফল গাছেরই ফলের বীজাবরণ। নেশা বা অবশতার ইল্লতও উভয়ের ক্ষেত্রে একই। তাই এখানে আলোচিত বিধান জায়ফল বা জয়ত্রী দুটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
🔹১. জায়েজ বলার পক্ষের মত:
যাঁরা স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য সামান্য জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহার জায়েজ বলেছেন, তাঁদের যুক্তি হলো:
এটি মূলত কোনো নাপাক বস্তু নয়। তবে অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে শরীরে অবসাদ বা হালকা মাদকতা তৈরি হতে পারে। তাই যতটুকু খেলে নেশা বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তৈরি হয় ততটুকু বা তার চেয়ে বেশি খাওয়া হারাম।
সাধারণ রান্নায় যে সামান্য পরিমাণ ব্যবহার করা হয় তাতে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
▪️ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনা দাইমাহ):
إِذَا كَانَ اسْتِعْمَالُ جَوْزَةِ الطِّيبِ فِي الطَّعَامِ بِكَمِّيَّةٍ قَلِيلَةٍ لَا تُؤَدِّي إِلَى السُّكْرِ أَوْ الْفُتُورِ؛ فَلَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ، أَمَّا إِذَا كَانَتْ تُؤَدِّي إِلَى السُّكْرِ أَوْ الْفُتُورِ؛ فَلَا يَجُوزُ اسْتِعْمَالُهَا.
“খাবারে যদি অত্যন্ত কম পরিমাণে জায়ফল ব্যবহার করা হয়, যা কোনো নেশা বা নিস্তেজ ভাব তৈরি করে না তবে তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু যদি তা নেশা বা নিস্তেজতার দিকে নিয়ে যায় তবে তার ব্যবহার জায়েজ হবে না।” [ফতোয়া নম্বর: ২৩৫৩৮]
▪️ ইসলামিক অর্গানাইজেশন ফর মেডিকেল সায়েন্সেস (কুয়েত):
অষ্টম ফিকহি-চিকিৎসা সেমিনারের (২২–২৪ জিলহজ ১৪১৫ হি./২২–২৪ মে ১৯৯৫ খ্রি.) সুপারিশে বলা হয়:
وَلَا حَرَجَ فِي اسْتِعْمَالِ جَوْزَةِ الطِّيبِ وَنَحْوِهَا فِي إِصْلَاحِ نَكْهَةِ الطَّعَامِ بِمَقَادِيرَ قَلِيلَةٍ لَا تُؤَدِّي إِلَى التَّفْتِيرِ أَوِ التَّخْدِيرِ.
“খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ ঠিক করার জন্য জায়ফল ও এর অনুরূপ বস্তু স্বল্প পরিমাণে ব্যবহারে কোনো বাধা নেই, যতক্ষণ তা অবশতা বা নেশার দিকে না নিয়ে যায়।”
🔹 ২. হারাম বলার পক্ষের মত:
যে আলেমগণ নাজায়েজ বলেছেন, তাঁরা এই হাদিস দিয়ে দলিল দেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ
“যা অধিক পরিমাণে সেবন করলে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।”
হাদিসটি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৬৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৮১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪৭০৩, হাদিসটি সহিহ-শাইখ আলবানি] এই হাদিসের মূলনীতির আলোকে জায়ফল বা জয়ত্রীতে যেহেতু মাদকতা সৃষ্টির উপাদান রয়েছে তাই সামান্য পরিমাণে হলেও তা ব্যবহার জায়েজ নয়।
এই মতের পক্ষে যাঁরা আছেন:
▪️ ইমাম ইবনে হাজার আল-হাইতামি (রাহিমাহুল্লাহ): তিনি শাফেয়ি ও মালেকি আলেমদের মধ্যে ইবনে দাকিকিল ঈদের (রাহ.) মত উদ্ধৃত করেন যে জায়ফল “মুসকির” বা নেশা সৃষ্টিকারী।
তিনি আরও বলেন, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলিরা এটিকে মুসকির হিসেবে একমত। (হাম্বলিদের পক্ষে তিনি ইবনে তাইমিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন।)
সবশেষে তিনি লেখেন:
تَعْلَمُ أَنَّهُ لَا مِرْيَةَ فِي تَحْرِيمِ الْجَوْزَةِ لِإِسْكَارِهَا أَوْ تَخْدِيرِهَا
“তুমি জানতে পারবে যে, জায়ফল হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তা নেশা বা অবশতা সৃষ্টি করে।” [আল-ফাতাওয়া আল-ফিকহিয়্যা আল-কুবরা; ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ১৬৪৪০-এ উদ্ধৃত]
▪️ ইসলামওয়েব ফতোয়া কেন্দ্র:
فَإِنَّهَا حَرَامٌ عَلَى الرَّاجِحِ مِنْ أَقْوَالِ أَهْلِ الْعِلْمِ؛ لِأَنَّهَا مُسْكِرَةٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
“আলেমদের মতগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য মত অনুযায়ী এটি হারাম। কারণ এটি নেশা সৃষ্টি করে আর প্রতিটি নেশাদ্রব্য হারাম।” [ইসলামওয়েব, ফতোয়া নং ৫০৮০৭]
▪️ ইসলাম প্রশ্নোত্তর (islamqa.info):
وَالْأَحْوَطُ: هُوَ الْقَوْلُ بِمَنْعِهَا وَلَوْ كَانَتْ مَخْلُوطَةً مَعَ غَيْرِهَا وَبِنِسْبَةٍ قَلِيلَةٍ
“অধিক সতর্কতামূলক মত হলো, অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত ও সামান্য অনুপাতে হলেও তা বর্জন করা।” [ফতোয়া নম্বর: ৩৯৪০৮]
🔸 ৩. উভয় পক্ষের যুক্তি:
▪️ স্বল্প পরিমাণ জায়েজ মনে করা আলেমদের যুক্তি:
উক্ত হাদিসের মূলনীতিটি মূলত সেসব বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলোর মৌলিক প্রকৃতিই নেশাদ্রব্য (যেমন মদ)। এসব ক্ষেত্রে অল্প সেবন করলেও বস্তুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেশাদ্রব্য হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু জায়ফল বা জয়ত্রী ভিন্ন জিনিস। এগুলো স্বভাবজাতভাবে মদ বা নেশাদ্রব্য নয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি মাত্রানির্ভর (dose-dependent)।
উসুলে ফিকহের একটি সাধারণ নিয়ম হলো, বিধান তার ইল্লতের ওপর নির্ভর করে:
الْحُكْمُ يَدُورُ مَعَ عِلَّتِهِ وُجُودًا وَعَدَمًا
যেহেতু সামান্য পরিমাণে নেশা বা অবশতার কোনো প্রভাবই বাস্তবে থাকে না, তাই সামান্য ব্যবহারে হারামের হুকুমও প্রযোজ্য হয় না। যেমন কিছু ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত সেবনে ক্ষতির কারণ হয়; এটিও অনেকটা সেরকম।
▪️ সম্পূর্ণ হারাম মনে করা আলেমদের যুক্তি: এই পক্ষের ফকিহগণ হাদিসের সাধারণ ও ব্যাপক অর্থকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত জায়ফল বা জয়ত্রী খেলে যেহেতু নেশা বা মতিভ্রম ঘটে, তাই এটি “নেশাদ্রব্য”-এর সংজ্ঞায় পড়ে। ফলে হাদিসের বিধান অনুযায়ী এর অল্প পরিমাণও হারাম, বাস্তবে প্রভাব প্রকাশ পাক বা না পাক। উপরন্তু হারামের পথ বন্ধ করা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁরা এটি পুরোপুরি বর্জনের পক্ষে।
🔸 ৪. আমাদের করণীয়:
যেহেতু বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মধ্যে সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছে, তাই সন্দেহমুক্ত থাকার জন্য জায়ফল বা জয়ত্রী পুরোপুরি বর্জন করা উত্তম। এটাই অধিক সতর্কতামূলক অবস্থান। তবে কেউ যদি খাবারের স্বাদ বা সুগন্ধির জন্য রান্নায় অতি সামান্য পরিমাণ জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহার করে তাকে সরাসরি হারামকারী বা গুনাহগার বলা যাবে না। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক অবগত।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: