জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়, চেনার সহজ উপায় এবং হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মতভেদ হলে করণীয়:
প্রশ্ন: দুর্বল হাদিস কাকে বলে? দুর্বল হাদিস চেনার সহজ উপায় কী? আর কোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলে করণীয় কী?
উত্তর:
উত্তর: কোন হাদিসে সহিহ বা হাসান হাদিসের এক বা একাধিক শর্ত না পাওয়া গেলে তাকে জঈফ বা দুর্বল হাদিস বলে।
ইবনুস সালাহ বলেন,
الحَدِيثُ الضَّعِيفُ: مَا فَقَدَ أَحَدَ شُرُوطِ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ: أَيْ: كُلُّ حَدِيثٍ لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ، وَكَذَا لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الحَسَنِ، فَهُوَ ضَعِيفٌ، وَهُوَ أَنْوَاعٌ تَزِيدُ عَنِ الخَمْسِينَ نَوْعًا
“যে হাদিসে সহিহ হাদিসের সব শর্ত পাওয়া যায়নি এবং হাসান হাদিসের শর্তও পূর্ণ হয়নি, সেটিই জয়িফ। জয়িফ হাদিসের প্রকার পঞ্চাশের বেশি।” [মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ, পৃ. ৪১]
জঈফ বা দুর্বল হাদিস (اَلْحَدِيثُ الضَّعِيفُ) চেনার মূল চাবিকাঠি হলো দুটি বিষয় দেখা: সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা বর্ণনাকারীর (রাবির) মধ্যে এমন ত্রুটি থাকা, যার কারণে হাদিসটি বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
কোনো হাদিস সহিহ হতে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
১. সনদের ধারাবাহিকতা
২. বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (আদালত)
৩. বর্ণনাকারীর সংরক্ষণক্ষমতা (জবত)
৪. শায (شَاذٌّ) না হওয়া, অর্থাৎ অধিক নির্ভরযোগ্য রাবির বিপরীত না হওয়া
৫. গোপন ত্রুটি (عِلَّةٌ) না থাকা
এই শর্তগুলোর এক বা একাধিক শর্ত লঙ্ঘিত হলে হাদিসটি সাধারণত জঈফ হিসেবে গণ্য হয়।
ক. সনদের ত্রুটি (اِنْقِطَاعُ السَّنَدِ)
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদিস-সংকলক পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের যে ধারা, তার মাঝখান থেকে এক বা একাধিক রাবি বাদ পড়লে হাদিসটি দুর্বল হয়।
উদাহরণ: কোনো তাবেয়ি যদি মাঝের সাহাবির নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরাতে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে তাকে মুরসাল (اَلْمُرْسَلُ) হাদিস বলে।
মুরসাল সম্পর্কে আলেমদের মতভেদ আছে। জমহুর মুহাদ্দিসের মতে মুরসাল দুর্বল। তবে হানাফি ও মালিকি ফকিহগণ নির্ভরযোগ্য তাবিঈর মুরসাল গ্রহণ করেন আর ইমাম শাফিঈ (রাহ.) কিছু শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করেন।
খ. বর্ণনাকারীর ত্রুটি (طَعْنٌ فِي الرَّاوِي):
১. স্মৃতিশক্তি ও সংরক্ষণে দুর্বলতা: রাবির স্মৃতিশক্তি প্রখর না হলে, কিংবা তিনি হাদিস ওলটপালট করে ফেললে বা অতিমাত্রায় ভুল করলে।
২. চরিত্রগত ত্রুটি: রাবি মিথ্যাবাদী, মিথ্যায় অভিযুক্ত বা পাপাচারী (ফাসিক) হলে। এর স্তরভেদ আছে:
– প্রমাণিত মিথ্যাবাদীর হাদিস মাওযূ (اَلْمَوْضُوعُ) বা জাল।
– মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবির হাদিস মাতরূক (اَلْمَتْرُوكُ) বা পরিত্যক্ত।
৩. অজ্ঞাত রাবি: রাবির পরিচয় বা অবস্থা জানা না থাকলে (اَلْمَجْهُولُ)।
৪. কিতাব বা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণে ত্রুটি: রাবি নিজের লিখিত কিতাব বা পাণ্ডুলিপি ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে।
সাধারণ মুসলিমদের পক্ষে মূল আরবি সনদ যাচাই করা কঠিন। তাই সহজ উপায় হলো মুহাদ্দিসদের রায় দেখা:
– হাদিসের কিছু কিতাবের সংস্করণে বর্তমান যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের (যেমন আল্লামা আলবানি, শায়খ শুআইব আরনাউত) হুকুম বা তাহকিক পাওয়া যায়। সেখানে হাদিসের পাশে “জঈফ” (ضَعِيفٌ) লেখা থাকলে সহজেই চেনা যায়।
– সুনানে তিরমিজিতে ইমাম তিরমিজি নিজেও অনেক হাদিসের মান উল্লেখ করেছেন।
না, হালকা দুর্বলতার কোনো হাদিস যদি একাধিক সনদে সমর্থিত হয় তবে তা হাসান লিগাইরিহি (حَسَنٌ لِغَيْرِهِ) স্তরে উন্নীত হতে পারে। তবে মারাত্মক দুর্বলতার হাদিস (যেমন মিথ্যাবাদী রাবির) একাধিক সনদেও শক্তিশালী হয় না।
কোনো হাদিসের মান নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ থাকলে একজন সাধারণ মুসলিমের করণীয়:
১. নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের মত গ্রহণ:
হাদিসের মান সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ণীত হয় না, হয় ইলমের গভীরতা ও দলিলের শক্তির ভিত্তিতে। তাই যে মুহাদ্দিসের তাহকিক অধিক নির্ভরযোগ্য ও উম্মাহর কাছে সমাদৃত, তাঁর মতকে অগ্রাধিকার দিন।
২. ইমান-আকিদা ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে সতর্কতা: এসব বিষয়ে কোনো হাদিস নিয়ে জোরালো মতভেদ থাকলে সেটির ওপর নির্ভর না করাই উত্তম। কারণ ইবাদত ও আকিদার ভিত্তি গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণিত উৎসের ওপর হওয়া উচিত।
৩. ফাজায়েলের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিস:
একদল আলেমের মতে কিছু শর্তে ফাজায়েলে (ভালো কাজের ফজিলতে) জঈফ হাদিস আমলযোগ্য। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী শর্ত তিনটি:
– (ক) দুর্বলতা মারাত্মক না হওয়া।
– (খ) হাদিসটি কোনো প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া।
– (গ) আমলের সময় এটিকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস না করা।
তবে অনেক মুহাদ্দিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রেও জঈফ হাদিস অনুযায়ী আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন, আর তাঁদের মতকেই অনেক মুহাদ্দিস অগ্রগণ্য মনে করেন। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
৪. উদার মনোভাব: এটি ইজতিহাদি (গবেষণামূলক) বিষয়। কোনো আলেম একটি হাদিসকে সহিহ বললে আর অন্যজন জঈফ বললে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক বা কাদা ছোড়াছুড়ি করা উচিত নয়। উভয় পক্ষের আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক ইলম অর্জনের এবং সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।