ভূমিকম্প, টর্নেডো, পাহাড়ধস, ভূমিধস, খরা, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, দাবানল বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কোনো জাতির নির্দিষ্ট অন্যায় বা পাপের সাথে নিশ্চিতভাবে জুড়ে দেওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, অমুক দুর্যোগ তাদের অমুক পাপাচারের কারণেই ঘটেছে। কারণ এটি গায়েবের বিষয়, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এর পেছনে আল্লাহর এমন হিকমত রয়েছে, যা আমাদের অজানা। কেউ এমন কথা বললে তা হবে না-জানা বিষয়ে কথা বলার শামিল, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হতে হবে।” [সুরা ইসরা: ৩৬]
القول بأن الكوارث الطبيعية دائمًا عقاب من الله يعدّ تدخلًا في قدر الله
“প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সবসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি বলা আল্লাহর কদর (সিদ্ধান্ত)-এর ওপর এক ধরনের হস্তক্ষেপ।”
কিছু মানুষ এসব ভূমিকম্প ও এ ধরনের পরীক্ষা ও বিপদকে ভুক্তভোগীদের জন্য শাস্তি এবং তাদের ওপর আল্লাহর প্রতিশোধ ছাড়া অন্য কিছু মনে করে না। অথচ সত্য হলো, এটি অপরিহার্য নয়।
বিষয়টি এর বিপরীতও হতে পারে। আর তা মানুষের অবস্থাভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
“আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফলাদির ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” [সুরা বাকারা: ১৫৫]
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ: إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক! তার সবকিছুই কল্যাণকর। এটি মুমিন ছাড়া আর কারও জন্য নয়। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেলে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর দুঃখ-কষ্টে পড়লে সে সবর করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।”
কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়েছেন,
صَاحِبُ الْهَدْمِ شَهِيدٌ
“ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ব্যক্তি শহিদ।” [বুখারি ও মুসলিম]
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
“তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মেরই ফল। আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।” [সুরা শুরা: ৩০]
সম্ভবত তা তাদের জন্য ভীতিপ্রদর্শন ও সতর্কবার্তা, যাতে তারা ফিরে আসে। যেমন তিনি বলেন,
أَفَأَمِنَ الَّذِينَ مَكَرُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ يَخْسِفَ اللَّهُ بِهِمُ الْأَرْضَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُونَ
“যারা মন্দ চক্রান্ত করে, তারা কি এ বিষয়ে নিরাপদ হয়ে গেছে যে আল্লাহ তাদেরসহ ভূমি ধসিয়ে দেবেন, কিংবা এমন দিক থেকে তাদের ওপর আজাব আসবে, যা তারা টেরও পাবে না?” [সুরা নাহল: ৪৫]
এই মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি নিজ হিকমত অনুযায়ী যখন যা চান, তা-ই করেন। মুমিনের ওপর বিপদ এলে তা গুনাহের কাফফারা, মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ কিংবা পরীক্ষা হতে পারে। আর কাফেরদের ওপর এলে তা হতে পারে সতর্কবার্তা, যাতে তারা ফিরে আসে; আবার তা দুনিয়ার লঘু শাস্তিও হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَىٰ دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“আর অবশ্যই আমি তাদের বড় আযাবের আগে লঘু আযাব আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সুরা সাজদা: ২১]
এ ধরনের বিপর্যয় বান্দাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কবার্তাও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَخْوِيفًا
“আর আমি ভয় দেখানোর জন্যই নিদর্শন পাঠাই।” [সুরা ইসরা: ৫৯]
এমন দুর্যোগ যেকোনো মুসলিম দেশে, এমনকি মক্কা-মদিনাতেও আসতে পারে। হয়েছেও তাই। কাবা ঘরও একাধিকবার প্রকৃতিক বিপর্যায়ের শিকার হয়েছে। ইতিহাসে সাহাবিদের যুগেও মহামারি এসেছে।
তাই এ বিষয়ে মন্তব্যে সংযত থাকা জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীরা উপহাসের শিকার না হন এবং নাস্তিকরা ইসলাম নিয়ে ঠাট্টার সুযোগ না পায়। বরং আমরা নিজেরা আল্লাহর শক্তিমত্তার ব্যাপারে সতর্ক হই এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ فَافْزَعُوا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَدُعَائِهِ وَاسْتِغْفَارِهِ
“যখন তোমরা এমন কিছু দেখবে, তখন আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারের দিকে ছুটে যাও।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১০৫৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৯১২]
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো:
ভূমিকম্পের সময় ইমানদারদের করণীয় সম্পর্কে আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.) বলেন,
فَالْوَاجِبُ عَلَى جَمِيعِ الْمُكَلَّفِينَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَغَيْرِهِمْ، التَّوْبَةُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَالِاسْتِقَامَةُ عَلَى دِينِهِ، وَالْحَذَرُ مِنْ كُلِّ مَا نَهَى عَنْهُ مِنَ الشِّرْكِ وَالْمَعَاصِي
“সুতরাং সকল মুকাল্লাফ ব্যক্তির ওপর, মুসলিম হোক বা অন্য কেউ, আবশ্যক হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা, তাঁর দ্বীনের ওপর অটল থাকা এবং শিরক ও পাপাচারসহ তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বেঁচে থাকা।” [ইবনে বায (রহ.), নসীহা হাওলায যালাযিল] মহান আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের দুনিয়াবি আজাব-গজব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হেফাজত করুন, হেদায়েতের উপরে প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং অমুসলিমদেরকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখান যেন আল্লাহর গজবে নিপতিত হওয়ার আগেই তারা সত্যের পথে ফিরে আসে। আল্লাহ তওফিক দাতা।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।