প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে এবং তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটি এখন ছয় মাসের গর্ভবতী; সন্তান প্রসবে আরও চার-পাঁচ মাস বাকি। এই অবস্থায় মেয়েটির ইদ্দত কি তিন হায়েজ হবে, নাকি সন্তান প্রসব হলে ইদ্দত শেষ হবে?
উত্তর: গর্ভবতী নারীর ইদ্দত তিন হায়েজ নয় বরং তার ইদ্দত শেষ হবে, সন্তান প্রসব হওয়ার মাধ্যমে সময় কম বা বেশি যাই হোক না কেন। সুতরাং প্রসবের আরো চার-পাঁচ মাস বা তারও বেশি সময় বাকি থাকলেও এই বিধানে কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ সন্তান প্রসব হওয়ার পরেই ইদ্দত শেষ হবে।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَ
“আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।” [সুরা তালাক: ৪]
তিন হায়েজের বিধান হলো যাদের গর্ভ নেই তাদের জন্য। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে আয়াতটি সুস্পষ্ট ও সাধারণ (আম)। তাই তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীও এর অন্তর্ভুক্ত।
✪ হাদিসে এসেছে,
عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الْأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ، فَجَاءَتِ النَّبِيَّ ﷺ فَاسْتَأْذَنَتْهُ أَنْ تَنْكِحَ، فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ
“সুবাইআ আল-আসলামিয়্যা (রা.) স্বামীর মৃত্যুর কয়েক রাত পরেই সন্তান প্রসব করেন। এরপর তিনি রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বিবাহের অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন এবং তিনি বিবাহ করলেন।” [সহিহ বুখারি: ৫৩২০]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তান প্রসব হওয়ার সাথে সাথেই গর্ভবতী নারীর ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। হাদিসটি স্বামীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে এলেও আয়াতের সাধারণ অর্থের ভিত্তিতে তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। এ বিষয়ে ফকিহদের ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে।
ফতওয়ে বিন বায (রাহ.): গর্ভবতী নারীর ইদ্দতের সময়সীমা সন্তান প্রসব:
প্রশ্ন: মহান আল্লাহর বাণী:
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
“আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের সময়সীমা হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।” [সূরা তালাক: ৪]
এই বিধান কি কেবল বিধবা নারীর জন্য নির্দিষ্ট? তালাকপ্রাপ্তা নারী সন্তান প্রসব করলে তার ওপর কি আর কোনো ইদ্দত বাকি থাকে, নাকি ইদ্দত শেষ হয়ে যায়? এ ছাড়া গর্ভবতী নারীর স্বামী মারা গেলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার খোরপোষের কোনো ব্যবস্থা থাকবে কি, নাকি সে শুধু তার নির্ধারিত মিরাস বা উত্তরাধিকার-অংশই পাবে?
উত্তর: আয়াতটি ব্যাপক। এটি বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, খোলা তালাক গ্রহণকারী এবং শরিয়তসম্মত কারণে বিচারকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছিন্না নারী সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে। এদের প্রত্যেকে গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমেই ইদ্দত থেকে মুক্ত হবে। কারণ উল্লিখিত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
“আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের সময়সীমা হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।” [সূরা তালাক: ৪]
এ ছাড়া সহিহাইন তথা বুখারি ও মুসলিমে প্রমাণিত হয়েছে, সুবাইআ আল-আসলামিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর স্বামীর মৃত্যুর কয়েক রাত পরে সন্তান প্রসব করেন। তিনি এ বিষয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ফতওয়া জানতে চাইলে তিনি ফতওয়া দেন, সন্তান প্রসবের মুহূর্ত থেকেই তিনি ইদ্দত থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন এবং যখনই ইচ্ছা হবে তিনি বিয়ে করতে পারবেন বলে অনুমতি দেন। আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তও এটিই। অবশ্য পূর্বসূরি (সালাফ) আলিমদের কারো কারো কাছ থেকে একটি শায বা বিচ্ছিন্ন মত পাওয়া যায় যে, স্বামীহারা গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসব ও চার মাস দশ দিন—এই দুই মেয়াদের মধ্যে যেটি দীর্ঘতর, সেটিই পালন করবেন। তবে এ মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তা স্পষ্ট আল-কুরআনের আয়াত এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর পরিপন্থী। আর স্বামীহারা গর্ভবতী নারীর খোরপোষের বিষয়টি হলো, এই খরচের দায়িত্ব তাঁর (স্ত্রীর) নিজের ওপরই থাকবে। মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে এর জন্য আলাদা কোনো খোরপোষ দেওয়া হবে না। আলেমদের বিশুদ্ধতম মতামত অনুযায়ী এটিই শরিয়তের বিধান। আল্লাহ সবাইকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন ও তাতে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন।” [মাজাল্লাতুল জামিআতিল ইসলামিয়্যা, মদিনা মুনাওয়ারা; মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত আশ-শাইখ ইবনে বায: ২২/১৮০]
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّىٰ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
“আর তারা যদি গর্ভবতী হয় তবে সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করো।” [সুরা তালাক: ৬]
অতএব প্রসব পর্যন্ত ভরণপোষণ প্রাক্তন স্বামীর দায়িত্ব। তালাক রাজয়ি হলে ইদ্দতের মধ্যে (অর্থাৎ প্রসবের আগ পর্যন্ত) স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে (রুজু করতে) পারেন। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে ওই নারীর অন্যত্র বিবাহ করা বৈধ নয়।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।