প্রশ্ন: শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীদের চুল বেচাকেনার বিধান: ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের চুল ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান কী?
উত্তর: বর্তমানে নারীদের মাথার চুল বিক্রির প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইন-অফলাইন সর্বত্র এগুলো বেচাকেনা হচ্ছে। কেউ স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়া চুল জমিয়ে বিক্রি করেন, আবার কেউ অর্থের লোভে চুল কেটে বিক্রি করেন। এসব চুল ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় এবং উইগ, হেয়ার-এক্সটেনশন, প্রসাধনী ব্রাশ তৈরিসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।
❑ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে এই চুল বিক্রয়ের বিধান কী?
মানুষের শরীরের কোনো অংশ—যেমন কিডনি, রক্ত, চুল ইত্যাদি—বিক্রি করা জায়েজ নয়। কারণ তা মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা মানুষের শরীরকে তার কাছে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। সুতরাং অর্থের লোভে এসব বিক্রি করা বৈধ হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
“আমি তো আদমসন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, স্থলে ও সাগরে তাদের বাহন দিয়েছি, উত্তম রিযিক দিয়েছি এবং আমার সৃষ্টির অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা ইসরা: ৭০]
এই মর্যাদার দাবি হলো, মানুষের অঙ্গ বা শরীরের কোনো অংশ পণ্য হতে পারে না।
◆ মিসরের দারুল ইফতা বলেছে—
«مِنْ مُقْتَضَيَاتِ تَكْرِيمِ الْإِنْسَانِ وَاحْتِرَامِ بُنْيَانِ جَسَدِهِ حُرْمَةُ بَيْعِ جُزْءٍ مِنْهُ أَوْ عُضْوٍ مِنْ أَعْضَائِهِ، وَيَشْمَلُ ذَلِكَ الشَّعْرَ عِنْدَ جُمْهُورِ الْفُقَهَاءِ، فَالتَّعَامُلُ فِي شَعْرِ الْآدَمِيِّ بَيْعًا وَشِرَاءً حَرَامٌ شَرْعًا؛ سَوَاءٌ فِي ذَلِكَ الْمَقْصُوصُ عَنْ رَأْسِهِ أَوِ الْمُتَسَاقِطُ عَنْهُ»
“মানুষকে সম্মানিত করা এবং তার দেহকাঠামোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আবশ্যিক দাবি হলো—তার শরীরের কোনো অংশ বা অঙ্গ বিক্রি করা হারাম। অধিকাংশ ফকিহের মতে চুলও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং মানুষের চুল কেনাবেচা শরিয়তে হারাম, তা মাথা থেকে কাটা হোক বা আপনাআপনি ঝরে পড়া হোক।” [দারুল ইফতা মিসরিয়া, ফতোয়া নং ৪৩২৫, ৩ এপ্রিল ২০১৮]
◆ শাফেয়ি আলেম খতিব শিরবিনি (রাহ.) বলেন—
«وَالْآدَمِيُّ يَحْرُمُ الِانْتِفَاعُ بِهِ وَبِسَائِرِ أَجْزَائِهِ لِكَرَامَتِهِ»
“মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের কারণে তার শরীর বা এর কোনো অংশ থেকে উপকার নেওয়া হারাম।” [মুগনিল মুহতাজ: ১/৪০৬]
◆ হাম্বলি মাজহাবের প্রসিদ্ধ আলেম বুহুতি (রাহ.) বলেন—
«وَلَا يَجُوزُ اسْتِعْمَالُ شَعْرِ الْآدَمِيِّ مَعَ الْحُكْمِ بِطَهَارَتِهِ لِحُرْمَتِهِ»
“মানুষের চুল পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তার সম্মানের কারণে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়।” [কাশশাফুল কিনা: ১/৫৭]
শরিয়তের একটি সাধারণ নীতি হলো—যা ব্যবহার করা হারাম তা বেচাকেনা করাও হারাম।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا حَرَّمَ عَلَى قَوْمٍ أَكْلَ شَيْءٍ حَرَّمَ عَلَيْهِمْ ثَمَنَهُ»
“আল্লাহ যখন কোনো জাতির জন্য কোনো কিছু খাওয়া বা ভোগ করা হারাম করেন তখন তার মূল্য বা বিনিময় গ্রহণ করাও হারাম করে দেন।” [সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৮৮; মুসনাদে আহমদ: ২২২১, গায়াতুল মারাম লিল আলবানি: ৩১৮]
❑ ২. হেয়ার-এক্সটেনশন বা চুল দিয়ে অতিরিক্ত চুল জোড়া লাগানো প্রসঙ্গে:
এসব চুল সাধারণত হেয়ার-এক্সটেনশন বা পরচুলা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
«لَعَنَ اللَّهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ، وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ»
“আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন সেই নারীকে, যে চুলে অতিরিক্ত চুল জোড়া লাগায় এবং যে জোড়া লাগিয়ে নেয়; আর যে উল্কি আঁকে এবং যে আঁকিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ৫৯৩৩, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে; ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও—সহিহ বুখারি: ৫৯৪২, সহিহ মুসলিম: ২১২৪]
মুআবিয়া [রাদিয়াল্লাহু আনহু] মদিনায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে এক গুচ্ছ চুল হাতে নিয়ে বলেছিলেন—
«يَا أَهْلَ الْمَدِينَةِ، أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ؟! سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنْ مِثْلِ هَذِهِ، وَيَقُولُ: إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ حِينَ اتَّخَذَهَا نِسَاؤُهُمْ»
“হে মদিনাবাসী, তোমাদের আলেমরা কোথায়? আমি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এ ধরনের জিনিস থেকে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন, বনি ইসরাইল তখনই ধ্বংস হয়েছে, যখন তাদের নারীরা এটা গ্রহণ করেছে।” [সহিহ বুখারি: ৩৪৬৮; সহিহ মুসলিম: ২১২৪]
◆ শায়খ ইবনে বায (রাহ.) বলেন—
«وَصْلُ الشَّعْرِ لَا يَجُوزُ، وَلَا فَرْقَ بَيْنَ شَعْرِ بَنِي آدَمَ وَغَيْرِهِ مِمَّا يُوصَلُ بِهِ الشَّعْرُ؛ لِعُمُومِ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَةِ الْوَارِدَةِ فِي النَّهْيِ عَنْ ذَلِكَ»
“চুলে অতিরিক্ত চুল জোড়া দেওয়া জায়েজ নয়; তা মানুষের চুল হোক বা অন্য কিছু—এতে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ এই নিষেধ সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলো সাধারণ (ব্যাপক অর্থবোধক)।” [মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ১০/৫২]
◆ শায়খ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন—
«وَصْلُ الشَّعْرِ – شَعْرِ الرَّأْسِ – بِالشَّعْرِ، مُحَرَّمٌ، بَلْ هُوَ مِنَ الْكَبَائِرِ؛ لِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنْ فَعَلَهُ»
“মাথার চুলের সাথে বাড়তি চুল জোড়া লাগানো হারাম, বরং তা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কারণ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজের সম্পাদনকারীর ওপর অভিশাপ দিয়েছেন।” [ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব: ২/৫৮২]
উইগ বা হেয়ার-এক্সটেনশন তৈরির জন্য যে চুল বিক্রি হয় তা মূলত এই নিষিদ্ধ কাজেই ব্যবহৃত হয়। ফলে বিক্রেতা এক্ষেত্রে গুনাহের কাজে সহযোগিতাকারী হয়ে যান। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
❑ ৩. কাটা ও ঝরে পড়া চুলের ব্যাপারে সতর্কতা:
চুল ও নখ জাদুর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জাদু করা হলে ফেরেশতা জানিয়েছিলেন, লাবিদ ইবনুল আসাম কোন জিনিসে জাদু করেছিল—
«قَالَ: فِيمَا ذَا؟ قَالَ: فِي مُشُطٍ وَمُشَاطَةٍ وَجُفِّ طَلْعَةٍ ذَكَرٍ»
“জিজ্ঞাসা করা হলো, কীসে? [ফেরেশতা] বললেন, চিরুনি, চিরুনিতে ওঠা চুল এবং পুরুষ খেজুরগাছের মোচার আবরণে।” [সহিহ বুখারি: ৩১৭৫, ৬৩৯১; সহিহ মুসলিম: ২১৮৯]
এখানে “মুশাতা” [مُشَاطَة] অর্থ চুল আঁচড়ানোর সময় যে চুল উঠে আসে। এ কারণে চুল-নখ যেখানে-সেখানে না ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। তবে এটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়।
মিসরের দারুল ইফতা বলেছে—
«فَإِنَّ دَفْنَ مَا يُقْلَمُ مِنَ الْأَظْفَارِ أَوْ يُزَالُ مِنَ الشَّعْرِ مُسْتَحَبٌّ لِحُرْمَةِ الْإِنْسَانِ وَسَائِرِ أَجْزَائِهِ، وَلَيْسَ ذَلِكَ مِنْ قَبِيلِ الْوَاجِبَاتِ الَّتِي يَأْثَمُ الْإِنْسَانُ بِتَرْكِهَا»
“কাটা নখ বা মাথার চুল মাটিতে পুঁতে রাখা মুস্তাহাব; কারণ মানুষের সম্পূর্ণ সত্তা ও তার প্রতিটি অংশ সম্মানের যোগ্য। তবে এটি এমন কোনো ওয়াজিব বিষয় নয় যে তা ছেড়ে দিলে মানুষ গুনাহগার হবে।” [দারুল ইফতা মিসরিয়া, ফতোয়া নং ৮১৫৮, ২৯ নভেম্বর ২০২৩]
➧ দৃষ্টি আকর্ষণ: কেউ না জেনে বা না বুঝে আগে কখনো চুল বিক্রি করে থাকলে তার করণীয় হলো—তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করা। আর যদি এই চুল বিক্রির মাধ্যমে উপার্জিত কোনো অর্থ কাছে গচ্ছিত থাকে তবে সওয়াবের আশা না রেখে সেই টাকা দরিদ্র-অসহায় মানুষের মাঝে অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দেওয়া আবশ্যক।
উপসংহার:
মোটকথা, চুল কাটা হোক বা এমনিতে ঝরে পড়া হোক—তা বিক্রি করা জায়েজ নয়; এটি মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী। তাই কাটা বা ঝরে পড়া চুল মাটিতে পুঁতে রাখাই উত্তম। যেখানে-সেখানে ফেলা রাখা একদিকে যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অন্যদিকে এর মাধ্যমে শত্রুদের দ্বারা জাদু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।