প্রশ্ন: নবজাতকে দেখতে গিয়ে টাকা-পয়সা ও উপহার-সামগ্রী দেওয়ার বিধান কী? এগুলো কি তার বাবা-মা ব্যবহার বা খরচ করতে পারবে?
নিম্নে সংক্ষেপে এ দুটি বিষয়ে উত্তর প্রদান করা হলো:
❑ ১. নবজাতকে দেখতে গিয়ে টাকা-পয়সা ও উপহার-সামগ্রী দেওয়ার বিধান:
আমাদের সমাজে নতুন শিশুর আগমনে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা তাকে দেখতে আসেন এবং শুভেচ্ছা হিসেবে উপহার বা নগদ টাকা দেন। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নবজাতককে দেখতে এসে এমন উপহার বা টাকা-পয়সা দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। এটি হাদিয়া বা উপঢৌকনের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, আত্মীয়তার টান ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা বা লোকদেখানো মানসিকতা ছাড়া স্বেচ্ছায় এবং আন্তরিকতার সাথে এই উপহার দেওয়া হলে তাতে কোনো বাধা নেই বরং এটি একটি প্রশংসনীয় চর্চা ও চমৎকার সামাজিক রীতি।
❂ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْبَلُ الْهَدِيَّةَ وَيُثِيبُ عَلَيْهَا
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপহার গ্রহণ করতেন এবং এর বিনিময়ে উপহার দিতেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৫]
❂ নবি করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধিতে উপহার আদান-প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: تَهَادَوْا تَحَابُّوا “তোমরা একে অপরকে হাদিয়া দাও; এতে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।” [আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪] উপহার দেওয়ার মাধ্যমে নবজাতকের বাবা-মায়ের মনে আনন্দের সঞ্চার হয়। আর কোনো মুসলিমকে আনন্দিত করা ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
❂ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ، أَوْ تَكْشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً، أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো:
কোনো মুসলিমের অন্তরে আনন্দ পৌঁছে দেওয়া, অথবা তার বিপদ দূর করা, অথবা তার ক্ষুধা নিবারণ করা, অথবা তার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া।” [তাবারানি, মু’জামুল আওসাত; সহিহুত তারগিব, হাদিস: ৯৫৫]
সন্তানের জন্মের শুভক্ষণে উপহার দিয়ে তার বাবা-মায়ের হৃদয়ে যে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া হয় তা এই হাদিসের ব্যাপক অর্থের অন্তর্ভুক্ত। তবে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এমন কোনো জিনিস উপহার দেওয়া যাবে না যা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ। যেমন: মূর্তি বা প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ অবয়বযুক্ত খেলনা, মানুষ বা প্রাণীর আকৃতির পুতুল, হারাম বা অশ্লীল ছবিযুক্ত পোশাক, শরিয়তবিরোধী প্রতীক বা চিহ্নযুক্ত সামগ্রী, বাদ্যযন্ত্র এবং মিউজিকযুক্ত খেলনা ইত্যাদি।
◈ উরফ (সামাজিক রীতি):
নবজাতকের মুখ দেখে উপহার বা টাকা দেওয়ার প্রথাটি মূলত ‘উরফ’ বা সামাজিক রীতি-নীতির অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামি ফিকহের একটি স্বীকৃত উৎস। এ প্রসঙ্গে ফিকহের বিখ্যাত মূলনীতি হলো:
اَلْعَادَةُ مُحَكَّمَةٌ
“প্রথা বা রীতিনীতি শরিয়তের বিধান নির্ধারণে বিচার্য বিষয়।” [আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর] সমাজে প্রচলিত কল্যাণকর ও সুফলদায়ক যেকোনো আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি এই মূলনীতির আওতাভুক্ত [সুরা আ’রাফ-এর ১৯৯ নম্বর আয়াতের নির্দেশনার আলোকে]। শর্ত হলো—সামাজিক এই প্রথাটি শরিয়তের কোনো মৌলিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না এবং তা ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও প্রচলিত হতে হবে। যেহেতু নবজাতকের মুখ দেখে উপহার বা নগদ টাকা দেওয়ার এই প্রথায় শরিয়তবিরোধী কিছু নেই তাই একে সমাজের একটি সুন্দর ও অনুমোদিত সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে একে কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম মনে করা যাবে না; কেউ এই উপহার না দিলে তাকে দোষারোপ করা বা অসন্তুষ্ট হওয়া অনুচিত।
❑ ২. প্রদত্ত উপহারের মালিকানা কার? বাবা-মা কি তা খরচ বা ব্যবহার করতে পারে?
নবজাতককে দেখতে এসে আত্মীয়-স্বজন বা অন্যান্যরা যে উপহার বা টাকা-পয়সা দেন, তার মূল মালিক মূলত সেই সন্তানই—বিশেষ করে দাতা যদি সুনির্দিষ্টভাবে বাচ্চার কথা উল্লেখ করে থাকেন। তবে সাধারণ এসব উপহার মা-বাবা সন্তানের লালন-পালন ও তার সার্বিক কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। এমনকি মা-বাবা যদি কখনো আর্থিক সংকটে পড়েন তবে নিজেদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেও সন্তানের সম্পদ ব্যবহার করার সুযোগ শরিয়তে রয়েছে। আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, এক বেদুঈন লোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বলল, “আমার পিতা আমার সম্পদ নিয়ে নিতে চান।” তখন তিনি বললেন:
إِنَّ أَبِي يُرِيدُ أَنْ يَجْتَاحَ مَالِي، قَالَ: «أَنْتَ وَمَالُكَ لِوَالِدِكَ، إِنَّ أَطْيَبَ مَا أَكَلْتُمْ مِنْ كَسْبِكُمْ، وَإِنَّ أَمْوَالَ أَوْلَادِكُمْ مِنْ كَسْبِكُمْ، فَكُلُوهُ هَنِيئًا»
“তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতার। তোমরা যা খাও তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো তোমাদের নিজেদের উপার্জিত সম্পদ। আর তোমাদের সন্তানদের সম্পদও তোমাদের উপার্জনেরই অংশ; সুতরাং তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।” [মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬৬৭৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯২] তবে জেনে রাখা ভালো, এই অনুমতি মূলত প্রয়োজন ও প্রয়োজনাতিরিক্ত সংকটের সীমার মধ্যে। কোনো বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে সন্তানের নামে সুনির্দিষ্টভাবে প্রদত্ত সম্পদ মা-বাবার নিজেদের কাজে ব্যবহার না করাই উত্তম ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
পরিশেষে, নবজাতকের মুখ দেখে টাকা বা উপহার দেওয়া একটি সুন্দর ও অনুমোদিত সামাজিক প্রথা মাত্র; এটি স্বতন্ত্র কোনো ইবাদত বা শরিয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট নির্দেশিত বাধ্যতামূলক আমল নয়। সুতরাং কেউ সামাজিক রীতি হিসেবে এটি না করলে বা উপহার না দিলে এতে কোনো পাপ বা সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।