কোন নারীর কি তার স্বামীর জন্য জান্নাতে হুর না পাওয়ার দোয়া করা বৈধ

প্রশ্ন: কোনো নারী কি তার স্বামীর জান্নাতে হুর না পাওয়ার জন্য দোয়া করতে পারবেন? জানাবেন, ইনশাআল্লাহ।
উত্তর: এ ধরনের দোয়া করা জায়েজ নয়। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত জান্নাতের কোনো নিয়ামত থেকে কাউকে বঞ্চিত করার দোয়া করা দোয়ায় সীমালঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের দোয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) তাঁর ছেলেকে দোয়া করতে শুনলেন, সে আল্লাহর কাছে জান্নাতের ডান পাশের একটি সাদা প্রাসাদ চাচ্ছে। তখন তিনি তাকে বললেন, আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কারণ:
إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّهُ سَيَكُونُ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ قَوْمٌ يَعْتَدُونَ فِي الطَّهُورِ وَالدُّعَاءِ»
“আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, এই উম্মতের মধ্যে এমন একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা পবিত্রতা অর্জনে (অজুতে) ও দোয়ায় সীমালঙ্ঘন করবে।” [সহিহ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৬৪] কারও জন্য নির্ধারিত জান্নাতের কোনো নিয়ামত থেকে তাকে বঞ্চিত করার দোয়া এই সীমালঙ্ঘনেরই একটি রূপ।
▪️ জান্নাতে হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না:
মনে রাখা কর্তব্য যে, দুনিয়ায় একজন নারী তার সতীনকে অপছন্দ করেন। কারণ এখানে স্বামীর ভালোবাসা কমে যাওয়ার বা নিজের অধিকার ও কিছু বিষয় হারানোর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু জান্নাতের পরিবেশ দুনিয়ার মতো নয়। সেখানে কোনো কিছুর কমতি থাকবে না এবং সবার অন্তর হবে পাক-পবিত্র ও নির্মল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَىٰ سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ
“আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব; তারা ভাই ভাই হয়ে মুখোমুখি আসনে অবস্থান করবে।” [সূরা হিজর: ৪৭]
আল্লাহ আরও বলেন:
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“সেখানে থাকবে মন যা চায় এবং চোখ যাতে তৃপ্ত হয়। আর তোমরা সেখানে চিরকাল থাকবে।” [সূরা জুখরুফ: ৭১]
অতএব জান্নাতে স্বামীর ভালোবাসায় কমতি পড়ার বা কারও মনে ক্ষোভ জাগার কোনো সুযোগই নেই।
▪️জান্নাতে দুনিয়ার মুমিনা নারীর মর্যাদা:
জান্নাতে দুনিয়ার মুমিনা স্ত্রী মর্যাদা ও রূপ-সৌন্দর্যে হুরদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবেন। কারণ তিনি দুনিয়ায় ঈমান, নামাজ, রোজা ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করেছেন। আল্লাহ তাআলা জান্নাতি নারীদের সম্পর্কে বলেন:
إِنَّا أَنشَأْنَاهُنَّ إِنشَاءً ۝ فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا ۝ عُرُبًا أَتْرَابًا
“আমি তাদের (জান্নাতি নারীদের) বিশেষভাবে সৃষ্টি করব। অতঃপর তাদের করব কুমারী, স্বামীপ্রেমিকা ও সমবয়স্কা।” [সূরা ওয়াকিয়া: ৩৫-৩৭]
অনেক মুফাসসিরের মতে এখানে দুনিয়ার মুমিনা নারীদের কথাই বলা হয়েছে, যাঁদের জান্নাতে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে। তাই দুনিয়ার স্ত্রীর জন্য আশঙ্কার কিছু নেই। আল্লাহ তাঁকে এমন মর্যাদা ও সৌন্দর্য দান করবেন, যা দেখে তিনি পরম সন্তুষ্ট থাকবেন।
▪️শায়খ ইবনে উসাইমিন (রাহ.)-বলেছেন, নেককার নারীরা জান্নাতে হুরে ঈনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, উত্তম এবং তাঁদের স্বামীদের কাছে অধিক প্রিয় হবেন। এমনকি কেবল ভেতরের গুণাবলি বা মর্যাদাতেই নয়, বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও তাঁরা হুরে ঈনের চেয়ে উত্তম ও আকর্ষণীয় হবেন।[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ্দরব: ৪/২] সহজ কথায়, একজন মুমিন নারী যদি দুনিয়ায় নেক আমল করে জান্নাতে যান তবে জান্নাতে তাঁর রূপ, সৌন্দর্য ও মর্যাদা জান্নাতের হুরদের চেয়েও বহুগুণ বেশি হবে। অতএব জান্নাতের সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ামত থেকে কাউকে বঞ্চিত করার দোয়া না করে বরং দোয়া ও চেষ্টা করা উচিত, যেন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ইমান ও নেক আমলের মাধ্যমে জান্নাতে পৌঁছাতে পারেন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস লাভ করেন। কোন আমলগুলো আমাদের জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, সেগুলো জেনে তা পালনে সচেষ্ট থাকাই প্রকৃত করণীয়।
আল্লাহু আলাম।
🔸ফতওয়া:
জান্নাতে স্বামীর জন্য অন্য কোনো স্ত্রী বা হুর না চাওয়ার দোয়ার বিধান
▪️প্রশ্ন: একজন নারী কি এই বলে দোয়া করতে পারেন, যেন জান্নাতে তাঁর স্বামী তিনি ছাড়া অন্য কোনো স্ত্রী বা হুর না পান?
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ ও সঙ্গীদের ওপর।
এ ধরনের দোয়া করা জায়েজ নয়। কারণ এর মধ্যে দোয়ায় সীমালঙ্ঘন রয়েছে। আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে তাঁর মুমিন বান্দাদের হুরে ঈন (ডাগর ও সুন্দর চোখবিশিষ্ট জান্নাতি নারী) দানের কথা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন:
و زَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ
“আমি তাদের আয়তলোচনা হুরদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দেব।” [সুরা দুখান: ৫৪]
জান্নাতের প্রত্যেক পুরুষ অধিবাসীর জন্য কমপক্ষে দুজন করে হুরে ঈন স্ত্রী থাকবেন।
সহিহাইন (বুখারি ও মুসলিম)সহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জান্নাতবাসীদের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন:
لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ
“তাদের প্রত্যেকের জন্য হুরে ঈনদের মধ্য থেকে দুজন করে স্ত্রী থাকবেন…” আর শহিদের জন্য তো থাকবেন বাহাত্তরজন হুরে ঈন স্ত্রী। ইমাম আহমদ ও তাবারানি মারফু সনদে বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سَبْعَ خِصَالٍ
“আল্লাহর কাছে শহিদের জন্য সাতটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে…” যার মধ্যে একটি হলো:
وَيُزَوَّجُ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنَ الْحُورِ الْعِينِ
“এবং তাঁকে বাহাত্তরজন হুরে ঈন স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হবে।” [মুসনাদে আহমদ: ১৭৭৩৪, সিলসিলাতুস সাহিহাহ’ (হাদিস: ৩২১৩] আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। [ইসলাম ওয়েব]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
Share: