আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক

আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক: কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর একগুচ্ছ অমূল্য দিকনির্দেশনা
প্রশ্ন: অনেক বোনই তাঁদের স্বামীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে থাকেন যে, স্বামীরা তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। স্ত্রীদের প্রতি সদাচরণের উদ্দেশ্যে স্বামীদেরকে ইসলাম কী উপদেশ দিয়েছে তা একটু জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসার ওপরই দাম্পত্য জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি নির্ভর করে। এই ভালোবাসা ও প্রেম-প্রীতিময় পরিবেশ সৃষ্টি করা স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দায়িত্ব। তাই এ ব্যাপারে উভয়কেই সচেষ্ট থাকতে হবে।
ইসলাম স্বামীদেরকে নির্দেশ দিয়েছে—স্ত্রীদের ভরণ-পোষণসহ তাঁদের সাথে সদাচরণ করতে। আর স্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছে, স্বামী অন্যায় ও গুনাহের আদেশ না দিলে বা সাধ্যাতিরিক্ত ও ক্ষতির কারণ না হলে তাঁর আনুগত্য করতে। স্ত্রীর মধ্যে আচরণগত বা দ্বীনি কোনো ত্রুটি দেখা গেলে স্বামী যথাসাধ্য ধৈর্য ধরবেন, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে তাঁকে সংশোধনের চেষ্টা করবেন এবং তাঁর হেদায়েতের জন্য দুআ করবেন।
এ বিষয়ে নিচের কুরআনের আয়াত ও কতিপয় সহিহ হাদিস উপাস্থাপন করা হলো:
মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎভাবে ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা আন-নিসা: ১৯]
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“স্ত্রীদের মাঝে পুরোপুরি ন্যায়বিচার বজায় রাখা তোমাদের সাধ্যাতীত, যদিও তোমরা তা চাও। কাজেই একজনের দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রেখো না। তোমরা যদি নিজেদের কাজকর্ম শুধরে নাও এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা নিসা: ১২৯]
১. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
“আমার কাছ থেকে নারীদের প্রতি কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো। কেননা নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি ফেলে রাখো, তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। কাজেই নারীদের ব্যাপারে কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো।” [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
২. আব্দুল্লাহ ইবনু যাম‘আ (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক খুতবায় বলেছেন—
«يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ فَيَجْلِدُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ، فَلَعَلَّهُ يُضَاجِعُهَا مِنْ آخِرِ يَوْمِهِ»
“তোমাদের কেউ কেউ তার স্ত্রীকে দাসের মতো বেত্রাঘাত করে, অথচ দিনের শেষে সে তার সাথেই শয্যা গ্রহণ করে!” [সহীহ বুখারী: ৫২০৪, সহীহ মুসলিম: ২৮৫৫]
এই হাদিসে স্ত্রীর প্রতি সহিংস আচরণ ও পরস্পরবিরোধী মনোভাবের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে—একদিকে কঠোর প্রহার, অন্যদিকে ঘনিষ্ঠতা কাম্য—এই দ্বিচারিতা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপছন্দ করেছেন।
৩. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে, নিশ্চয়ই অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৯]
৪. আমর ইবনুল আহওয়াস আল-জুশামী (রা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন—
«أَلَا وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّمَا هُنَّ عَوَانٍ عِنْدَكُمْ، لَيْسَ تَمْلِكُونَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ، إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، فَإِنْ فَعَلْنَ فَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا»
“সাবধান! নারীদের ব্যাপারে কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো, কেননা তারা তোমাদের কাছে (দায়িত্বে থাকা) বন্দিনীর মতো। এর বাইরে তাদের ওপর তোমরা আর কিছুর অধিকারী নও, যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। যদি তারা তা করে, তবে বিছানায় তাদের থেকে পৃথক থাকো এবং (প্রয়োজনে) সামান্য প্রহার করো, তীব্র নয়। অতঃপর তারা অনুগত হলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ খুঁজো না।” [সুনানে তিরমিযী: ১১৬৩; সুনানে ইবনু মাজাহ, হাদিসটি হাসান সহীহ]
৫. মুয়াবিয়া ইবনু হাইদাহ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন—হে আল্লাহর রসুল! আমাদের কারো ওপর তার স্ত্রীর কী অধিকার?
তিনি বলেন—
«أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ، وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ، وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ، وَلَا تُقَبِّحْ، وَلَا تَهْجُرْ إِلَّا فِي الْبَيْتِ»
“তুমি যখন খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরিধান করবে তখন তাকেও পরিধান করাবে, তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবে না, তাকে অশ্লীল কথা বলবে না, এবং ঘরের ভেতর ছাড়া তার থেকে দূরে থেকো না।” [সুনানে আবু দাউদ: ২১৪২; সুনানে ইবনু মাজাহ: ১৮৫০, হাদিসটি সহীহ]
৬. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ»
“মুমিনদের মধ্যে ইমানের দিক থেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।”
[সুনানে তিরমিযী: ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৮২, হাদিসটি হাসান সহীহ]
৭. ইয়াস ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«لَا تَضْرِبُوا إِمَاءَ اللَّهِ»
“তোমরা আল্লাহর বাঁদীদের (স্ত্রীদের) মারধোর করো না।”
অতঃপর উমর (রা.) এসে অভিযোগ করলেন যে, স্ত্রীরা স্বামীদের ওপর বেয়াদবি শুরু করেছে। তখন প্রহারের অনুমতি দেওয়া হলো। এরপর বহু নারী রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের কাছে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে লাগল। তখন তিনি বললেন—
«لَقَدْ طَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ، لَيْسَ أُولَئِكَ بِخِيَارِكُمْ»
“মুহাম্মদের পরিবারের কাছে বহু নারী এসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। এসব স্বামীরা তোমাদের মধ্যে ভালো লোক নয়।” [সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৬, হাদিসটি সহীহ]
৮. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«الدُّنْيَا مَتَاعٌ، وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ»
“এই পৃথিবীর জীবন নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী ভোগ-সম্ভার আর এই ভোগ-সম্ভারের মধ্যে সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ হলো একজন নেককার স্ত্রী।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৭]
[উৎস গ্রন্থ: রিয়াজুস সালেহিন]
উপরের আয়াত ও হাদিসসমূহ স্পষ্ট করে যে, স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং তার অধিকার আদায় করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো স্বামীর জন্যই স্ত্রীর সাথে সবসময় কঠোরতা প্রদর্শন করা বৈধ নয়; বরং যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে, সে-ই ইমানের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন এবং উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: