কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ এবং একজন আদর্শ স্বামীর বৈশিষ্ট্য

প্রশ্ন: একজন স্বামী কি সবসময় স্ত্রীর সাথে কঠোরভাবে আচরণ করতে পারে? স্ত্রী যদি কোনও অবাধ্যতাই না করে বরং অনুগত থাকে সেক্ষেত্রে স্বামীর জন্য সবসময় কড়া বা শক্ত ভাষায় কথা বলা কি কোনোভাবে বৈধ হতে পারে? অনেকে মনে করে, পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে কঠোর হতে হবে। একজন পুরুষের স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ তার উত্তম ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হতে পারে?
উত্তর: দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও সম্মান। তাই স্বামী বা স্ত্রী—কারও জন্যই একে অপরের সাথে সারাক্ষণ কর্কশ বা কঠোর মেজাজে কথা বলা ঠিক নয়। বিশেষ করে স্ত্রী যদি অনুগত হন এবং কোনও ভুল বা অবাধ্যতা না করেন তবে তার সাথে কঠোর আচরণ করা একেবারেই অনুচিত। “পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে মেজাজ দেখিয়ে চলতে হবে”—এই চিন্তাটি একটি ভুল ধারণা, সামাজিক কুসংস্কার এবং ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা নিসা: ১৯]
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي»
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫-হাদিসটি সহীহ]
এই হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন—তিনি পরিবারের সাথে সবচেয়ে চমৎকার আচরণ করতেন, যা প্রতিটি স্বামীর জন্যই অনুসরণীয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»
“কোনও মুমিন পুরুষ যেন কোনও মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণভাবে অপছন্দ না করে। কারণ তার একটি আচরণ বা অভ্যাস খারাপ লাগলেও অন্য কোনও আচরণ বা গুণে সে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮]
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন—
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
“তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ গ্রহণ করো। কারণ নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি তা একবারে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি এমনি ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। তাই নারীদের সাথে ভালো আচরণ করার উপদেশ মেনে চলো।” [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, স্ত্রীর স্বভাবগত কিছু দুর্বলতা থাকতেই পারে—সেগুলো নিয়ে অনর্থক কঠোর না হয়ে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সংসার পরিচালনা করাই একজন দায়িত্বশীল স্বামীর পরিচয়।
❑ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য:
একজন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যেমন আচরণ করবে:
১. কথায় কথায় রাগ না দেখিয়ে স্ত্রীর সাথে শান্ত, ভদ্র ও স্নেহমাখা ভাষায় কথা বলবে; কঠিন ভাষায় বকাঝকা ও গালাগালি করবে না এবং মেজাজ দেখিয়ে চড়া গলায় কথা বলবে না।
২. মানুষমাত্রই ভুল হয়। তাই স্ত্রীর ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে বড় করে না দেখে হাসিমুখে ও ধৈর্যের সাথে তা শুধরে দেওয়ার এবং সুন্দর আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করবে।
৩. স্ত্রী সংসার ও পরিবারের জন্য যা কিছু করে তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো এবং মন খুলে তার কাজের মূল্যায়ন ও প্রশংসা করবে।
৪. স্ত্রীর সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনায় তার প্রকৃত সঙ্গী হবে। তার মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকবে এবং তার মানসিক অবস্থা ও অনুভূতির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিবে।
৫. স্ত্রীকে কেবল গৃহস্থালি কাজে সীমাবদ্ধ বা অধীনস্থ মনে না করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সমান অংশীদার (লাইফ পার্টনার) হিসেবে সম্মান করা।
৬. স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনও দুর্বলতা কিংবা পারিবারিক মনোমালিন্যের বিষয় অন্যের কাছে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যেই তা সমাধান করবে। কখনোই লোক সম্মুখে, বিশেষ করে তার মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের কাছে তাকে কখনও অপমান বা ছোট না করবে না।
৭. সারাদিনের ব্যস্ততার ফাঁকেও স্ত্রীর জন্য কিছুটা সময় বের করা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা এবং একান্তে সুন্দর কিছু মুহূর্ত (quality time) কাটানো।
৮. স্ত্রীর বাবা-মা, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের নিজের পরিবারের মতোই সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া।
৯. মাঝেমধ্যে তার পছন্দের ছোটখাটো উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবে (যেমন: সুন্দর পোশাক, অলঙ্কার, তার বিশেষ কোনও চাহিদা পূরণ ইত্যাদি) এবং সম্ভব হলে গুনাহ মুক্ত পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া বা তার পছন্দের খাবার খাওয়ানো।
১০. পরিবারের ছোট-বড় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তার সাথে আলোচনা করা।
❑ কঠোরতা কখন প্রযোজ্য?
স্ত্রী যদি স্পষ্ট কোনও অবাধ্যতা করে, শরিয়তের বিধান অমান্য করে বা পরিবারের কোনও ক্ষতি করে তবুও ইসলাম শুরুতেই কঠোর হতে বলে না। কুরআন আমাদের ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে বলেছে—প্রথমে বুঝিয়ে বলা, তারপর শয্যা পৃথক করা, আর একদম শেষ উপায় হিসেবে সামান্য শাসন (যাতে কোনও আঘাত বা দাগ না লাগে)। [দেখুন: তবে তা-ও শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য, রাগের বশে বা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণ, নম্রতা ও ধৈর্য প্রদর্শনই ইসলামের শিক্ষা। আর আমাদের প্রিয় নবি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এর সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনের তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: