পিতা ঋণগ্রস্ত থাকা অবস্থায় মারা গেলে সন্তানরা কি সেই ঋণ শোধ করতে বাধ্য

প্রশ্ন: পিতা যদি কোনো কোম্পানির ঋণের ব্যক্তিগত জামিনদার (গ্যারান্টর) হয়ে মারা যান এবং চুক্তিপত্রে উত্তরাধিকারীদেরও দায়বদ্ধ রাখার শর্ত থাকে তাহলে কোম্পানি ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা কি তা পরিশোধ করতে বাধ্য? সন্তানরা শোধ না করলে আখিরাতে তারা কি পাকড়াও হবে?
উত্তর: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কারো মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ধারাবাহিকভাবে চারটি বিষয় নিষ্পন্ন করা হয়:
১. দাফন-কাফনের খরচ।
২. তার নিজস্ব ঋণ ও জামিনদারির বকেয়া পরিশোধ।
৩. ওসিয়ত পূরণ (যদি কোনো ওসিয়ত করে থাকেন, তবে তা সর্বোচ্চ অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়)।
৪. অবশিষ্ট সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন।
আল্লাহ তাআলা মিরাসের আয়াতে ওসিয়ত ও ঋণ পরিশোধের এই ধারাবাহিকতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন:
مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ
“তার করা ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর।” [সূরা নিসা: ১১]
অর্থাৎ পিতার জামিনদারির দায় তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওপর বর্তায় এবং সম্পত্তি বণ্টনের আগেই তা থেকে ঋণ পরিশোধ করা সন্তানদের জন্য শরয়ি কর্তব্য। কিন্তু পিতা যদি কোনো সম্পত্তি রেখে না যান তবে সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—একজনের দায় অন্য নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর বর্তায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” [সূরা নাজম: ৩৯] এই আয়াতের আলোকে ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন যে, কারো কৃতকর্ম বা আর্থিক দায় অন্য কারো ওপর বর্তায় না—যদি না সে স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করে।
▪️ঋণের জন্য সন্তানগণ আখিরাতে পাকড়াও হবে কি?
পিতা সম্পত্তি রেখে না গেলে এবং সন্তানরা অসচ্ছলতার কারণে জামিনদারির বকেয়া বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে এর জন্য সন্তানদের আখিরাতে কোনো পাকড়াও বা গুনাহ হবে না। তবে পিতা সম্পত্তি না রেখে গেলেও সন্তানরা সামর্থ্যবান হলে নিজেদের পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং পিতার প্রতি ইহসান (সদাচরণ) হিসেবে বিবেচিত হবে। হাদিসে এসেছে, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির আত্মা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত থাকে। তাই সম্ভব হলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতাকে দায়মুক্ত করা উচিত।
সংক্ষেপে: সন্তানদের প্রথম করণীয় হলো—পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টনের আগে সেখান থেকে জামিনদারির বকেয়া ঋণ পরিশোধ করা। পিতা কোনো সম্পত্তি না রাখলে সন্তানরা নিজ সম্পদ থেকে তা শোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন এবং পরিশোধ করতে না পারলে গুনাহগারও হবেন না। তবে সামর্থ্য থাকলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতার আত্মাকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ।
▪️দেশে প্রচলিত আইন:
বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim persona low) অনুযায়ী উত্তরাধিকার পরিচালিত হয়। সেখানেও সম্পত্তি বণ্টনের আগে কাফন-দাফনের খরচ, বাকি ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত কার্যকর করার পরই অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন—উভয় ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধের স্থান সম্পত্তি বণ্টনের আগে; বণ্টনের পরে নয়। বাবার ঋণ যদি তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয় তবে প্রচলিত আইনি চর্চায়ও সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে বাকি ঋণ শোধ করতে বাধ্য নন। ঋণদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকেই পাওনা আদায় করতে পারে; ঋণ সম্পদের চেয়ে বেশি হলে উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি ত্যাগের নোটারি করে নিজেদের দায়মুক্তও রাখতে পারেন। অর্থাৎ এখানেও মূলনীতি একই: সন্তানরা কখনও তাদের নিজস্ব উপার্জিত সম্পদ থেকে বাবার ঋণ শোধ করতে আইনত বাধ্য নন; দায়বদ্ধতা মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। (তবে বিশেষ চুক্তিতে ভিন্ন শর্ত থাকলে সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উত্তম।)
▪️ফতওয়ায়ে উসাইমিন: ওয়ারিশদের কি মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব?
প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ওপর যদি ঋণ থাকে এবং সে এমন কোনো সম্পদ রেখে না যায় যা দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা যায় তাহলে তার ওয়ারিশদের ওপর কি তার পক্ষ থেকে এই ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব, নাকি নয়?
উত্তর:
لَا يَجِبُ عَلَى وَرَثَتِهِ أَنْ يُؤَدُّوا هَذَا الدَّيْنَ عَنْهُ سَوَاءٌ كَانُوا مِنَ الْأَبَاعِدِ أَوْ مِنَ الْأَقَارِبِ، لَكِنْ إِنْ كَانَ هَذَا الْمَيِّتُ وَالِدًا فَيَنْبَغِي لِأَوْلَادِهِ أَنْ يُؤَفُّوا عَنْهُ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ مِنْ بِرِّهِ، وَأَمَّا الْوُجُوبُ فَلَا يَجِبُ؛ لِأَنَّنَا لَوْ أَوْجَبْنَا هَذَا لَكُنَّا نُؤَثِّمُهُمْ بِتَرْكِ الْوَفَاءِ، وَهَذَا يُخَالِفُ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ وَلِأَنَّنَا لَوْ قُلْنَا بِوُجُوبِ وَفَاءِ الدَّيْنِ عَنِ الْمَيِّتِ الَّذِي لَمْ يَخْلُفْ تَرِكَةً لَكَانَ فِي هَذَا فَتْحُ بَابٍ لِهَؤُلَاءِ الَّذِينَ لَا يُبَالُونَ بِارْتِكَابِ الدُّيُونِ، فَيَقُولُ الْوَاحِدُ: أَنَا سَوْفَ أَتَدَيَّنُ، وَإِذَا مُتُّ فَإِنَّ أَهْلِي أَوْ وَرَثَتِي يَقْضُونَ عَنِّي الدَّيْنَ. فَلَا يُبَالِي بَعْدَ ذَلِكَ بِمَا اسْتَدَانَهُ وَأَلْحَقَهُ ذِمَّتَهُ. ثُمَّ إِنِّي أَقُولُ: إِنَّ الْمَيِّتَ إِذَا مَاتَ وَعَلَيْهِ دَيْنٌ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُؤَدِّي عَنْهُ مِنْ فَضْلِهِ وَكَرَمِهِ، فَيُرْضِي أَهْلَ الْحَقِّ.
“ওয়ারিশদের ওপর মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব নয়—চাই তারা দূরের আত্মীয় হোক বা নিকটাত্মীয়। তবে মৃত ব্যক্তি যদি বাবা হন তবে সমর্থ্য থাকলে সন্তানদের উচিত, তার ঋণ শোধ করে দেওয়া। কেননা এটি বাবার প্রতি সৎব্যবহার ও সদাচরণের অংশ। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) বলা যাবে না। কারণ, আমরা যদি একে ওয়াজিব সাব্যস্ত করি তবে ঋণ পরিশোধ না করার কারণে সন্তানদের গুনাহগার সাব্যস্ত করতে হয়; অথচ এটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর পরিপন্থী:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না” [সূরা আনআম: ১৬৪]।
তা ছাড়া, কোনো সম্পদ না রেখে যাওয়া মৃতের ঋণ পরিশোধ করাকে যদি আমরা ওয়াজিব বলে দিই তবে তা অকাতরে ঋণ নেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের জন্য এক সুবিধার পথ খুলে দেবে। তখন যে কেউ ভাববে—”আমি ঋণ নিতেই থাকি। আমি মারা গেলে আমার পরিবার বা ওয়ারিশরা তো তা শোধ করেই দেবে!” ফলে নিজের কাঁধে কত ঋণ চাপাচ্ছে, সে বিষয়ে তার আর কোনো পরোয়া থাকবে না। এর পাশাপাশি আমি আরও বলতে চাই—কোনো ব্যক্তি যদি পরিশোধ করার সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে এবং তা পরিশোধ করার আগেই মারা যায় তবে আল্লাহ তাআলাই নিজ অনুগ্রহ ও মহানুভবতায় তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ আদায় করে দেবেন এবং পাওনাদারদের সন্তুষ্ট করে দেবেন।”
ফতওয়া দাতা: আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)।
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
▪️ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করার ভয়াবহতা:
হাদিসে ঋণ পরিশোধ না করে মারা যাওয়ার পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ»
“মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।” [​সহিহ আল-জামে, হাদিস: ৬৭৭৯; সহিহ আত-তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮]
এমনকি আল্লাহর পথে নিহত শহিদেরও সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না—এমনটিও হাদিসে এসেছে। [মুসলিম]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ঋণ ও পাপের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং সাহাবিদেরও এই দোআ শিক্ষা দিতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে গুনাহ ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাই।” [বুখারি]
একবার সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি এত ঘন ঘন ঋণ থেকে আশ্রয় চান কেন?”
তিনি জবাবে বলেছিলেন: “মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।”
এ কারণেই ইসলামে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃত অভাব, চিকিৎসা, ব্যবসার বৈধ প্রয়োজন বা এমন কোনো জরুরি অবস্থায় ঋণ নেওয়া জায়েজ।
তবে বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য ঋণের বোঝা নিজের কাঁধে চাপানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
আর যদি কাউকে ঋণ নিতেই হয় তবে তার উচিত, পরিশোধের সৎ নিয়ত রাখা, সাধ্যমতো দ্রুত তা শোধ করার চেষ্টা করা এবং নিজের অবর্তমানে পরিবার যেন এই দায় থেকে বেকায়দায় না পড়ে সে বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা—যেমন ঋণের হিসাব লিখে রাখা বা পরিবারকে তা অবহিত করে রাখা। মহান আল্লাহ তৌফিক দানকারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: