ইসলামে কবরকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন—বন্যার পানি, ভূমিধ্বস, কিংবা হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব থেকে কবর নষ্ট হওয়া বা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শরিয়তে বৈধ। ক্ষেত্র বিশেষে কবর রক্ষার্থে ইট, সিমেন্ট, কাঠ, লোহা বা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা জায়েজ, তবে তা অবশ্যই প্রয়োজনের সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:
❑ ১. কবর চিহ্নিত রাখা ও বন্যার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে বেড়া দেওয়ার বিধান:
প্রশ্ন: কবর চিহ্নিত রাখা ও তা বন্যা থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে এক বিঘত উচ্চতার লোহার বেড়া দেওয়া কি জায়েজ? বেড়াটি খাড়া খুঁটির সাথে আড়াআড়িভাবে চারটি লোহার রড জোড়া দিয়ে তৈরি।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি। সহিহ সুন্নাহয় কবরে চুন-সুরকি লাগানো, তা উঁচু করা, তার ওপর কাঠামো তৈরি করা ও নির্মাণকাজ করা নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ হলো, কবরবাসীর ব্যাপারে মানুষ যেন ফিতনায় না পড়ে এবং তাদের প্রতি বাড়াবাড়ি করে শিরকে লিপ্ত না হয় ও তাদের উদ্দেশ্যে ইবাদত না করে বসে—যেমনটি ইতিপূর্বে ইহুদি-খ্রিস্টানরা করেছিল এবং আমাদের যুগেও কিছু মুসলিমের মধ্যে ঘটেছে। পাশাপাশি এতে অনর্থক অর্থ অপচয়েরও বিষয় আছে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি আবুল হায়্যাজ আল আসাদি (রাহ.) বর্ণনা করেন, আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) তাঁকে বলেছিলেন:
«أَلَا أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ، وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ»
“আমি কি তোমাকে সেই কাজের জন্য পাঠাব না, যে কাজের জন্য রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তুমি কোনও মূর্তি (কোনও প্রাণীর, বিশেষত মানুষ বা জীবজন্তুর, ছবি বা আকৃতিতে তৈরি ভাস্কর্যজাতীয় বস্তু) দেখলে তা মুছে ফেলবে আর কোনও উঁচু কবর দেখলে তা সমান করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম: ৯৬৯]
তবে কবরকে হিংস্র জীবজন্তু থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা বন্যা বা অন্য কোনও কারণে তা যেন বিলীন হয়ে না যায় সেজন্য বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনের পরিমাণে তা দিতে কোনও অসুবিধা নেই। কারণ প্রয়োজন যতটুকু অনুমতিও ততটুকু পর্যন্তই সীমিত থাকে। যদি এক বিঘত উচ্চতার বেড়া দিয়েই আশঙ্কিত ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় তাহলে তার চেয়ে বেশি করা যাবে না। কেবল প্রয়োজনের সীমা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
আর শুধু কবর চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে তা উঁচু করা শরিয়তসম্মত নয়; বরং এটিও নির্মাণ-নিষেধের সাধারণ নির্দেশনার আওতায় পড়বে। কারণ কবর চিহ্নিত করার জন্য এর চেয়ে কম ব্যবস্থাতেই কাজ চলে।
তবে যদি মূল উদ্দেশ্য বন্যা প্রভৃতি থেকে কবর রক্ষা করা হয় এবং কবর চিহ্নিত হওয়াটা তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ফায়দা হিসেবে আসে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তাতে কোনও অসুবিধা নেই। কেননা যা স্বতন্ত্রভাবে জায়েজ নয় তা অন্য একটি বৈধ উদ্দেশ্যের অনুগামী হিসেবে জায়েজ হয়ে যায়।” আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [সূত্র: ইসলাম ওয়েব]
❑ ২. কবর ধসে পড়ার আশঙ্কায় ইট দিয়ে কবর নির্মাণের বিধান:
শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন:
«إِذَا دَعَتِ الْحَاجَةُ بِأَنْ يَضَعَ فِي الْقَبْرِ حِجَارَةً، أَوْ لَبِنًا، أَوْ خَشَبًا، أَوْ حَدِيدًا؛ لِأَنَّ الْأَرْضَ رَدِيئَةٌ، أَوْ تَعْلُوهَا الْمِيَاهُ؛ فَلَا بَأْسَ بِهَذَا. أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ قَوِيَّةً، يَحْفِرُ فِيهَا حَفْرًا إِلَى نِصْفِ طَرَفِ الرَّجُلِ فَوْقَ السُّرَّةِ، وَيُعَمِّقُ، وَيَجْعَلُ فِي اللَّحْدِ، وَيُوضَعُ فِيهِ الْمَيِّتُ، هَذِهِ السُّنَّةُ، أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ رَخْوَةً، ضَعِيفَةً؛ فَلَا مَانِعَ أَنْ يَكُونَ فِيهَا مَا يُثَبِّتُهَا مِنْ أَلْوَاحٍ، أَوْ حَدِيدٍ، أَوْ حَجَرٍ، أَوْ طُوبٍ حَتَّى لَا تَسْقُطَ، وَحَتَّى لَا يُرْقَى الْمَيِّتُ، لَا بَأْسَ بِهَذَا»
“প্রয়োজন দেখা দিলে কবরের মধ্যে পাথর, ইট, কাঠ বা লোহা ব্যবহার করা যেতে পারে; যেমন—মাটি যদি দুর্বল হয় অথবা সেখানে পানি উঠে যায়। এতে কোনও অসুবিধা নেই। তবে মাটি যদি শক্ত হয় তাহলে একজন মানুষের নাভির ওপর পর্যন্ত গভীর করে গর্ত খুঁড়তে হবে এবং লাহাদ (বগল-কবর) তৈরি করে তাতে মৃত ব্যক্তিকে রাখতে হবে। এটাই সুন্নত। আর মাটি যদি নরম ও দুর্বল হয় তবে তা ধসে পড়া ঠেকাতে এবং মৃতদেহ উন্মুক্ত হওয়া রোধ করতে তক্তা, লোহা, পাথর বা ইট দিয়ে তা মজবুত করায় কোনো বাধা নেই। এতে কোনো অসুবিধা নেই।”
ইবনে হাজার আল-হাইসামি (রহ.) বলেন:
«إِنْ خُشِيَ نَبْشُ أَوْ حَفْرُ سَبُعٍ أَوْ هَدْمُ سَيْلٍ، لَمْ يُكْرَهِ الْبِنَاءُ وَالتَّجْصِيصُ»
“যদি আশঙ্কা থাকে যে কোনও হিংস্র প্রাণী কবর খুঁড়ে ফেলবে অথবা বন্যার পানিতে কবর ধসে পড়বে তাহলে কবরের ওপর নির্মাণকাজ করা ও চুন-সুরকি লাগানো অপছন্দনীয় হবে না।” [তুহফাতুল মুহতাজ: ৩/১৯৬] (সূত্র: islamqa.info)
এসব ফতওয়ার ভিত্তি হলো, ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ বিশেষ প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়ও সীমিত পরিসরে বৈধ হওয়া, (الضرورة/الحاجة) ও ক্ষতি রোধের নীতি (الضرر يزال)। এসব মূলনীতির আলোকে কবর ধসে লাশ উন্মুক্ত হওয়া বা নষ্ট হওয়া ঠেকানো জরুরি। এ ছাড়াও জীবিত ব্যক্তির মতো মৃত ব্যক্তির সম্মান ও দেহ অক্ষত রাখা শরিয়তে আবশ্যক। তবে অনুমতি কেবল প্রয়োজন মেটানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ; সৌন্দর্যবর্ধন বা জাকজমকের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা যাবে না।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।