মৃতদেহে ধাতব প্লেট নাট বা স্ক্রু থাকলে তা বের করা যাবে কি

প্রশ্ন: কারো শরীরের ভেতরে যদি লোহা, স্টিল বা এ জাতীয় কোনও ধাতুর তৈরি প্লেট, নাট, ও স্ক্রু থাকে এবং এমতাবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে তাহলে কি তাকে এইসব জিনিসসহই দাফন করা হবে নাকি অপারেশন করে তা শরীর থেকে বের করে নিতে হবে? এ ব্যাপারে শরিয়তের বিধান কী?
উত্তর: শরিয়তের মূলনীতি হলো, জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষেরও পূর্ণ সম্মান ও হুরমত রয়েছে। যার কারণে শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া তার দেহ কাটা-ছেড়া করা জায়েজ নাই। এ কারণে কোনও ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, তার শরীরে প্ল্যাটিনামের স্ক্রু, নাট, লোহার প্লেট ইত্যাদি আছে তাহলে শরিয়তের বিধান হলো, তাকে তা-সহই দাফন করা হবে। এগুলো বের করার জন্য শরীরে অপারেশন বা কাটা-ছেঁড়া করা জায়েজ হবে না। কারণ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ كَسْرَ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِهِ حَيًّا»
“মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার মতোই।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২০৭; সহিহ ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩২০]
অর্থাৎ গুনাহের দিক থেকে মৃত এবং জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার অপরাধ সমান। একইভাবে তাকে আঘাত করা, জখম করা কিংবা কষ্ট দেওয়াও একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এটাও সম্ভাবনা রাখে যে, যে এমনটা করবে সে গুনাহগার হবে—যদিও মৃত ব্যক্তি কোনো কষ্ট অনুভব করে না। কেননা (জীবিতের হাড় ভাঙার সাথে) যে সাদৃশ্য/তুলনা দেওয়া হয়েছে, তা কষ্টের দিক থেকে নয় বরং গুনাহর দিক থেকেই দেওয়া হয়েছে। তাহলে এর কারণ সম্ভবত এই যে, এতে মৃতের প্রতি অবমাননা প্রকাশ পায় এবং তার অবস্থা দেখে উপদেশ গ্রহণ থেকে গাফিলতি প্রকাশ পায়। কারণ মানুষের একটি হুরমাহ (সম্মান-মর্যাদা) রয়েছে, জীবিত অবস্থায়ও, মৃত অবস্থায়ও।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
“আর আমি তো আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” [সূরা ইসরা: ৭০]
আর মানুষের শরীর, গোশত ও হাড়ও এই মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আহমদের বর্ণনায় আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে এসেছে:
«أنَّ كَسْرَ عظْمِ المؤمنِ ميِّتًا مِثلُ كَسْرِه حَيًّا»
“মৃত মুমিনের হাড় ভাঙা জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভাঙার মতোই।” [মুসনাদে আহমদ: ২৪২৪২]
এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই বিশেষ মর্যাদার হকদার হলেন মৃত মুমিন। এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের শরীর অত্যন্ত সম্মানীয় এবং জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই তাকে কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। [Durar]
▪️ব্যতিক্রম কেবল তখনই যখন ধাতুটি অন্য কারও অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হয় এবং তারা তা দাবি করে আর তা বের করতে গিয়ে লাশের বড় কোনও বিকৃতি ঘটে না। কিন্তু সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জাম, যেমন: লোহার নাট, স্ক্রু কিংবা পেসমেকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে কোনও অপারেশন ছাড়াই তা-সহ দাফন সম্পন্ন করতে হবে।
❑ ফতওয়া: মৃতদেহের সাথে ধাতব প্লেট/রড যুক্ত থাকা অবস্থায় দাফন করা:
প্রশ্ন: আমার প্রশ্নটি হলো, কোনও ব্যক্তি যদি হাড় ভাঙার অস্ত্রোপচারের পর (যেখানে ধাতব প্লেট বা রড বসানো হয়েছে) মারা যান এবং তাঁর শরীরে বহিরাগতভাবে শক্ত ধাতব ফিক্সেশন বা ফ্রেম যুক্ত থাকে তবে গোসলের সময় কি আমরা এটি খুলে ফেলব যাতে তা সহ দাফন করতে না হয়? নাকি পায়ে সেটি সেভাবেই রেখে দেব যেন খোলার সময় টানাটানির কারণে তিনি কষ্ট না পান এবং তা সহই দাফন করব? কারণ আমরা জানি, জীবিত ব্যক্তি যা থেকে কষ্ট পায়, মৃত ব্যক্তিও তা থেকে কষ্ট পায় এবং মৃতদেহের হাড় ভাঙা জীবিত অবস্থায় হাড় ভাঙার মতোই। দয়া করে বিস্তারিত উত্তর জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল, তাঁর পরিবারবর্গ ও সহচরদের ওপর। আম্মা বাদ—
মৃতদেহের শরীর থেকে এই লোহার ফ্রেম বা ফিক্সেশন খুলে ফেলা জায়েজ মনে হয় না। কারণ লোহা হলো একটি পবিত্র বস্তু। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নানুসারে এটি যেহেতু গভীরভাবে শক্তভাবে বসানো রয়েছে তাই তা খোলার চেষ্টা করলে মৃতদেহের জন্য কষ্টদায়ক হবে। এমনকি এই অবস্থায় তা খুলতে গেলে অঙ্গহানি বা মৃতদেহের অবমাননা হতে পারে। অথচ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِهِ حَيًّا
“মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা, জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভাঙার মতোই।” [আহমদ, আবু দাউদ]
ফকিহগণও স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, কোনও মৃতদেহের ভাঙ্গা হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য যদি অন্য কোনও পবিত্র হাড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে তা খুলে ফেলা যাবে না।
ইমাম ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল মুগনি’ গ্রন্থে বলেন:
“وَإِنْ جُبِرَ عَظْمُهُ بِعَظْمٍ فَجُبِرَ، ثُمَّ مَاتَ لَمْ يُنْزَعْ؛ إِنْ كَانَ طَاهِرًا”. اهـ
“যদি কারো ভাঙ্গা হাড় অন্য কোনও হাড় দিয়ে জোড়া দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সে মারা যায় তবে সেই যুক্ত করা হাড়টি যদি পবিত্র হয় তবে তা আর খুলে ফেলা হবে না।”
তিনি গোসলদাতার করণীয় সম্পর্কে আরও বলেন,
“… وَيَسْتَعْمِلُ فِي كُلِّ أُمُورِهِ الرِّفْقَ بِهِ فِي تَقْلِيبِهِ وَعَرْكِ أَعْضَائِهِ وَعَصْرِ بَطْنِهِ وَتَلْيِينِ مَفَاصِلِهِ وَفِي سَائِرِ أُمُورِهِ، احْتِرَامًا لَهُ فَإِنَّهُ مُشَبَّهٌ بِالْحَيِّ فِي حُرْمَتِهِ وَلَا يَأْمَنُ إِنْ عَنُفَ بِهِ أَنْ يَنْفَصِلَ مِنْهُ عُضْوٌ فَيَكُونَ مُثْلَةً بِهِ ..” اهـ.
: “…মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনস্বরূপ তাকে উল্টানো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মর্দন করা, পেট হালকা চেপে পরিষ্কার করা, জোড়াগুলো নরম করা এবং অন্যান্য সমস্ত কাজে অত্যন্ত নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ মর্যাদার দিক থেকে মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির মতোই। গোসলের সময় কঠোরতা বা জোরাজুরি করা হলে কোনও অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, যা তার অঙ্গহানি ঘটানোর শামিল হতে পারে।” আল্লাহু আ’লাম (আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)। [ইসলাম ওয়েব]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: