প্যারালাইজড (অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত) ও সংজ্ঞাহীন রোগীর ইবাদতের বিধান:
প্রশ্ন: প্যারালাইজড রোগীর ইবাদত-বন্দেগি করার পদ্ধতি কী? তার হাত-পা অচল, ব্রেইনও ঠিকমতো কাজ করে না। আবার প্রস্রাব-পায়খানা অনবরত বের হতে থাকে। এমন অবস্থায় তার নামাজ, অজু ও অন্যান্য ইবাদতের বিধান কী?
উত্তর: ইসলামের প্রতিটি বিধানই অত্যন্ত সহজ ও মানবিক। মহান আল্লাহ মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেন না। তাই অসুস্থতার প্রেক্ষাপটে রোগীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করে ইবাদতের নিয়মেও এনে দেওয়া হয়েছে অসাধারণ নমনীয়তা ও সহজতা। তাই প্যারালাইজড বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি—তাঁর মানসিক সুস্থতা (অর্থাৎ হুঁশ-জ্ঞান বা বোধশক্তি থাকা) এবং শারীরিক সক্ষমতা। নিম্নে এমন রোগীর পাক-পবিত্রতা, নামাজ ইত্যাদির বিধান সংক্সেপে আলোকপাত করা হলো:
❑ ১. প্যারালাজড রোগীর আকল (মস্তিষ্ক) সচল না থাকলে:
(ক) যদি মস্তিষ্ক সচল না থাকে তাহলে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তার জন্য নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইসলামের কোনও বিধান ফরজ নয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ»
“তিন শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি—যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; শিশু—যতক্ষণ না সে বালেগ হয়; এবং পাগল বা আকলহীন ব্যক্তি—যতক্ষণ না তার আকল ফিরে আসে।”
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৪৪০৩-ইমাম আলবানী রহ. সহিহ আবু দাউদে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।]
অতএব যদি কোনও রোগীর মস্তিষ্ক এমনভাবে অচল হয়ে যায় যে, তার চেতনা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত, সে কী করছে বা বলছে তা বুঝতে পারে না এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার সক্ষমতা থাকে না তাহলে তার ওপর নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরিয়তের বিধান কার্যকর থাকবে না।
(খ) তবে শুধু স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, শরীরের কোনও অংশ অবশ হয়ে যাওয়া বা মস্তিষ্কে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে নামাজের দায়িত্ব উঠে যাবে না। যতক্ষণ আকল ও চেতনা বিদ্যমান থাকবে ততক্ষণ সাধ্যানুযায়ী ইবাদত করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا»
“আল্লাহ কোনও ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
তিনি আরও বলেন,
«فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ»
“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]
❑ ২. মস্তিষ্ক সচল থাকলে প্যারালাইজড রোগীকেও নামাজ আদায় করতে হবে:
রোগীর হাত-পা অচল হলেও যদি তার মস্তিষ্ক সচল থাকে তাহলে তার ওপর নামাজ আদায় করা ফরজ। এক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে সক্ষম না হলে বসে পড়বেন। বসাও সম্ভব না হলে শুয়ে পড়বেন। তারপরও নামাজ পরিত্যাগ করার সুযোগ নাই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবি ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.)-কে বলেন:
«صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ»
“দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বসে। তাও সম্ভব না হলে কাত হয়ে শুয়ে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১১১৭]
অতএব প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, চেয়ারে, খাটে, বিছানায় বা মাটিতে বসে অথবা শুয়ে নামাজ আদায় করবেন। রুকু-সেজদা করা সম্ভব না হলে মাথার ইশারায় রুকু ও সিজদা করবেন। সেজদার ইশারা রুকুর চেয়ে বেশি নিচু করবেন।
❑ ৩. শরীর ও কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে থাকলে:
– রোগীর শরীর বা কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি নাপাকি লেগে থাকলে নামাজের আগে যতটুকু সম্ভব তা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
– সম্ভব হলে নাপাকি ধুয়ে দিতে হবে।
– নোংরা কাপড় পরিবর্তন করে দিতে হবে।
– এবং রোগীকে অজু করিয়ে দিতে হবে।
– পানি ব্যবহার করলে যদি রোগীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা বাস্তবিকভাবে পানি ব্যবহার করা সম্ভব না হয় তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তায়াম্মুম করাতে হবে।
সম্ভব না হলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিয়ে দিতে হবে। রোগী নিজে অজু বা তায়াম্মুম করতে না পারলে পরিবারের কোনও সদস্য বা সেবাকারী তাকে সাহায্য করবেন।
কিন্তু রোগীর অবস্থা যদি এমন হয় যে, বারবার পরিষ্কার করা অত্যন্ত কষ্টকর বা বাস্তবে সম্ভব নয় তাহলে তার সাধ্যের বাইরে কোনও কিছু করতে হবে না। কারণ আল্লাহ বলেন,
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا»
“আল্লাহ কোনও ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
❑ ৪. অনবরত প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু নির্গত হলে:
কিছু রোগীর এমন সমস্যা হয় যে প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু অনবরত বের হতে থাকে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ধরনের ব্যক্তির জন্য ইসলামি ফিকহে বিশেষ বিধান রয়েছে।
ইস্তিহাজাগ্রস্ত বা রক্তপ্রদর রোগে আক্রান্ত এক নারী রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
«إِنِّي امْرَأَةٌ أُسْتَحَاضُ فَلَا أَطْهُرُ، أَفَأَدَعُ الصَّلَاةَ؟ فَقَالَ: لَا، إِنَّ ذَلِكِ عِرْقٌ وَلَيْسَ بِالْحَيْضَةِ، فَإِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلَاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي»
“আমি এমন একজন নারী, যার ইস্তিহাজার রক্তস্রাব বন্ধ হয় না। আমি কি নামাজ ছেড়ে দেব?
তিনি বললেন, “না। এটি একটি শিরার রক্ত; হায়েজ নয়। যখন হায়েজ শুরু হবে তখন নামাজ ছেড়ে দেবে আর যখন হায়েজ শেষ হবে তখন রক্ত ধুয়ে নামাজ পড়বে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২২৮]
এই ধরনের দলিলের ভিত্তিতে ফকিহগণ অনিয়ন্ত্রিত নাপাকির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য (যেমন: যাদের অনবরত পেশাব ঝরে বা বায়ু নিষ্কাশিত হয়) বিশেষ বিধান আলোচনা করেছেন।
যেমন:
কোনও ব্যক্তির প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু এমনভাবে অনবরত বের হতে থাকে যে একটি পূর্ণ নামাজের ওয়াক্তের মধ্যে অজু করে ফরজ নামাজ আদায় করার মতো নাপাকিমুক্ত সময়ও পাওয়া না যায় তাহলে তিনি যা করবেন তা হলো:
◈ ক. প্রতি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে নতুন করে অজু করবে। এরপর সেই ওয়াক্তের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত কারণে প্রস্রাব-পায়খানা বের হলেও তার অজু নষ্ট হবে না। তবে অন্য কোনও কারণে অজু নষ্ট হলে নতুন করে অজু করতে হবে। পরবর্তী নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে আবার নতুন অজু করতে হবে।
এই অবস্থায় এক অজুতে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা যাবে না।
◈ খ. আর নাপাক কাপড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো,
– যদি তিনি জানেন যে কাপড় পরিবর্তন বা ধৌত করার পরও নামাজ পড়া অবস্থায় আবার কাপড় নাপাক হয়ে যাবে তবে প্রতি ওয়াক্তে কাপড় পরিবর্তন করা বা ধোয়া জরুরি নয়। ওই অবস্থাতেই তিনি নামাজ আদায় করতে পারবেন।
– আর যদি পেশাব এত ঘন ঘন না ঝরে—বরং কিছুটা বিরতি থাকে এবং ধোয়া বা পরিবর্তন করার পর অন্তত এতটুকু সময় পাওয়া যায় যাতে পবিত্র অবস্থায় নামাজ শেষ করা সম্ভব তবে সাধ্যানুসারে কাপড় ধুয়ে নেওয়া বা পরিবর্তন করে নেওয়া উত্তম।
তবে এতে অতিরিক্ত কষ্টকর মনে হলে ওই কাপড় পরেই নামাজ আদায় করা যাবে এবং এতে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। কারণ সাধ্যের অতিরিক্ত বিষয়ে দয়াময় আল্লাহ তাআলা ছাড় দিয়েছেন।
❑ ৫. চেতনা কখনো থাকে, কখনো থাকে না—তাহলে কী করণীয়?
যদি রোগীর চেতনা কখনো থাকে, আবার কখনো সম্পূর্ণ চলে যায় তাহলে যে সময় তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবেন সে সময়ের নামাজ তার ওপর ফরজ হবে। আর যে সময় তার আকল ও চেতনা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকবে সে সময় তার উপর শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য হবে না। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত, রোগীর অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা এবং যখন তিনি সচেতন থাকেন তখন সাধ্যানুযায়ী নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
✪✪ রোগীর সেবা করা বিরাট সোয়াবের কাজ:
এমন রোগীর সেবা-শুশ্রূষা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হতে পারে। বারবার শরীর ও কাপড় পরিষ্কার করা, অজু করানো, খাবার দেওয়া, ওষুধ দেওয়া এবং রাত-দিন পাশে থাকা—এসব কাজ ধৈর্যের সঙ্গে করা পরিবারের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত, রোগীকে বোঝা মনে না করে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত মনে করে তার সেবা করা। তার সেবা-শুশ্রূষা, যত্ন ও প্রয়োজন পূরণ করার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ইনশাআল্লাহ আল্লাহর কাছে সওয়াবের অধিকারী হবেন।
❑ সারাংশ:
(ক) প্যারালাইজড (অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হলেও সালাত মাফ নয়। তবে তার জন্য যেভাবে সহজ ও সম্ভব হয় সেভাবে আদায় করতে হবে।
(খ) আকল ও চেতনা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেলে সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তার উপর নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরিয়তের বিধান বর্তাবে না।
অতএব এ ধরণের রোগীর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—
– যদি মস্তিষ্ক সচল থাকে তাহলে সাধ্যানুযায়ী নামাজ পড়বে; অন্যথায় নয়।
– শারীরিক দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে দাঁড়ানো সম্ভব না হলে বসে, না হলে শুয়ে ইশারায় নামাজ আদায় করতে হবে।
– অনিয়ন্ত্রিত নাপাকির ক্ষেত্রে মাজুর বা অপারগের বিধান প্রযোজ্য হবে। (যার বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে)
আল্লাহ তাআলা অসুস্থ সকল মুসলিমকে শিফায়ে কামিলা ও আজিলা দান করুন এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে ধৈর্য ও উত্তম সেবার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।