প্রশ্ন: আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার হুকুম কী?
উত্তর:
الْحَمْدُ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ، أَمَّا بَعْدُ
আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া সামগ্রিকভাবে সমগ্র উম্মাহর ওপর ফরজে কেফায়া (অর্থাৎ সমাজের পক্ষ থেকে কিছু মানুষ দায়িত্ব পালন করলে অন্যান্য সকলেই দায়িত্ব মুক্ত হবে এবং গুনাহ থেকে রক্ষা পাবে)। আবার নিজ সামর্থ্য ও দ্বীনি জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজে আইন (অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ব্যক্তিগতভাবে পালন করা অপরিহার্য দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে গুনাহগার হতে হবে)।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও যদিও তা একটি আয়াতও হয়।” [বুখারি]
অগ্রগণ্য মত অনুযায়ী, দাওয়াত দেওয়া প্রত্যেকের সাধ্যানুযায়ী ফরজ। কেননা মহান আল্লাহ এই উম্মাহকে তাঁর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” [আলে ইমরান: ১০৪]
◈ উক্ত আয়াতে “مِنْكُمْ” (তোমাদের মধ্য থেকে) বাক্যাংশটি নিয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে—এটি কি আংশিকতা (تَبْعِيض) বোঝায়, নাকি পুরো উম্মাহকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে?
✪ ইমাম তাবারি, ইমাম কুরতুবি ও আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)-এর মতে, এখানে আংশিকতা বোঝানো হয়েছে।
ইমাম কুরতুবি (রাহ.) তাঁর তাফসিরে (৪/১৬৫) উল্লেখ করেন:
وَمَنْ فِي قَوْلِهِ “مِنْكُمْ” لِلتَّبْعِيضِ، وَمَعْنَاهُ أَنَّ الْآمِرِينَ يَجِبُ أَنْ يَكُونُوا عُلَمَاءَ، وَلَيْسَ كُلُّ النَّاسِ عُلَمَاءَ. وَقِيلَ: لِبَيَانِ الْجِنْسِ، وَالْمَعْنَى: لِتَكُونُوا كُلُّكُمْ كَذَلِكَ. قُلْتُ: الْقَوْلُ الْأَوَّلُ أَصَحُّ، فَإِنَّهُ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيَ عَنِ الْمُنْكَرِ فَرْضٌ عَلَى الْكِفَايَةِ.
“مِنْكُمْ” (তোমাদের মধ্য হতে) শব্দে ব্যবহৃত “مِنْ” হরফটি তাব‘ঈদ (تبعيض) বা আংশিকতা বোঝানোর জন্য এসেছে। এর অর্থ হলো, আদেশদাতাদের অবশ্যই আলেম হওয়া আবশ্যক। আর সব মানুষ আলেম নয়।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, এখানে “مِنْ” জিনস বা প্রকার স্পষ্ট করার জন্য এসেছে; অর্থাৎ তোমরা সবাই-ই যেন এমন (সৎকাজের আদেশদাতা ও অসৎকাজের নিষেধকারী) হও।
আমি বলি, প্রথম মতটিই অধিকতর সঠিক। কেননা এটি প্রমাণ করে যে, সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ফরজে কিফায়া (অর্থাৎ উম্মাহর একটি অংশ এই দায়িত্ব পালন করলে বাকিদের পক্ষ থেকেও তা আদায় হয়ে যায়)।” প্রকৃতপক্ষে এই দুই মতের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব:
– মুসলিমদের একটি দল সার্বিকভাবে নিজেদের দাওয়াত এবং আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকারে (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ) নিয়োজিত করবে—এটি উম্মাহর ওপর ফরজে কিফায়া।
– আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াত এবং আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালন করবে—এটি তার ওপর ফরজে আইন।
যেমনটি আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
“মুমিনদের জন্য শোভনীয় নয় যে তারা সকলে একসাথে (জিহাদে) বের হয়ে যাবে। তবে তাদের প্রতিটি দল থেকে একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এলে তাদের সতর্ক করতে পারে, যেন তারা সাবধান হয়?” [সূরা তওবা: ১২২]
✪ হাফেজ ইবনে কাসির (রাহ.) সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন (১/৩৯১):
“এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, এই উম্মাহর একটি দল যেন এই বিষয়ে (দাওয়াত ও আমর বিল মা’রূফ-নাহি আনিল মুনকারের কাজে) নিয়োজিত থাকে; যদিও নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এটি উম্মাহর প্রতিটি ব্যক্তির ওপরও ওয়াজিব।”
যেমন সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
“তোমাদের কেউ যদি কোনও অন্যায় কাজ দেখতে পায় তবে সে যেন তা নিজ হাতে প্রতিহত করে। যদি সেই সামর্থ্য না থাকে তবে মুখের ভাষায় তা প্রতিহত করে। আর যদি তা-ও সামর্থ্য না থাকে তবে যেন অন্তর দিয়ে তা অপছন্দ করে। আর এটিই ইমানের সর্বনিম্ন স্তর।” [মুসলিম]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَٰلِكَ مِنَ الْإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ
“এরপর ইমানের সরিষার দানা পরিমাণ অংশও অবশিষ্ট থাকে না।” [মুসলিম]
আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক ভালো জানেন। [সূত্র: ইসলাম ওয়েব, ফতোয়া নং ২৯৯৮৭]
মোটকথা, দ্বীনের পথে আহ্বান জানানো পুরো উম্মতের ওপর মূলত দুটি স্তরে জরুরি: সামষ্টিকভাবে এটি ‘ফরজে কিফায়া’—যেখানে একটি নির্দিষ্ট দল বিশেষভাবে এই দায়িত্বে নিবেদিত থাকবেন আর ব্যক্তিগতভাবে এটি ‘ফরজে আইন’—যেখানে প্রত্যেকেই নিজের জ্ঞান ও সামর্থ্য অনুযায়ী এই দায়িত্ব বহন করবেন।
পরিশেষে সকলের উদ্দেশ্যে বলব, ইসলামের প্রচার ও প্রচার একক কোনও শ্রেণি কিংবা নির্দিষ্ট কেবল আলেম সমাজের একার দায়িত্ব নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের প্রতিটি মানুষেরই উপর এর দায়-দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব হতে পারে খুব সাধারণ একটি আয়াত অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অথবা দাওয়াতের পেছনে অর্থ, সময়, শ্রম কিংবা সামান্য একটু বুদ্ধি ও পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে—যার যতটুক সামর্থ্য রয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াহ ইলাল্লাহ তথা আল্লাহর দ্বীনের দিকে মানুষকে আহ্বান এবং তা প্রচার ও প্রসারের তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।