কী পরিমাণ জ্ঞান ও যোগ্যতা থাকলে একজন মানুষের ওপর দ্বীনের দাওয়াতি কাজ ফরজ হয়

প্রশ্ন: কী পরিমাণ জ্ঞান ও যোগ্যতা থাকলে একজন মানুষের ওপর দ্বীনের দাওয়াতি কাজ ফরজ হয়?
উত্তর: আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করার জন্য স্বয়ং মহান আল্লাহ সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
“আপনি আপনার রবের পথে হিকমত (কৌশল ও প্রজ্ঞা) ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন।” [সূরা নাহল: ১২৫]
এই নির্দেশনার আলোকে প্রত্যেক ব্যক্তি তার শক্তি, সামর্থ্য, দক্ষতা ও অর্জিত জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করবে। যেমন:
✪ যার বক্তব্যের দক্ষতা আছে, সে সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দেবে।
✪ যার লেখার সক্ষমতা আছে, সে কলমের মাধ্যমে দাওয়াত ছড়িয়ে দেবে।
✪ বিজ্ঞ আলেমদের মূল্যবান বক্তব্য, অনূদিত নিবন্ধ ও ফতোয়া ইত্যাদি ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াও বর্তমান যুগে অত্যন্ত উপকারী একটি দাওয়াতি কাজ।
✪ যার প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কোডিং, ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা আছে সে তার এই যোগ্যতা দ্বীন প্রচারের সেবায় নিয়োজিত করবে।
✪ সম্পদশালী ব্যক্তি দাওয়াতের সার্বিক অগ্রযাত্রায় অর্থ ব্যয় করবে।
মোটকথা, যার যতটুকু জ্ঞান, যোগ্যতা, শক্তি ও সামর্থ্য আছে, সে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীন প্রচারের কাজে ব্যবহার করবে। এটি ফরজ।
❑ দাওয়াতি ময়দানে কতটুকু জ্ঞান থাকা জরুরি?
দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য সর্ববিষয়ে দক্ষ হওয়া বা মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির কিংবা বিশাল পণ্ডিত হওয়া জরুরি নয়; বরং একজন ব্যক্তি যে নির্দিষ্ট বিষয়ে দাওয়াত দিচ্ছেন, সে বিষয়ে তাঁর সুস্পষ্ট ও সঠিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটি মাত্র আয়াত হয়।” [বুখারি]
এর অর্থ হলো, শরিয়তের একটিমাত্র মৌলিক বিষয়েও যদি কারও সঠিক ও স্পষ্ট জ্ঞান থাকে তবে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেবেন।
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন,
نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأً سَمِعَ مَقَالَتِي فَوَعَاهَا، فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ، وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيهٍ
“আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত করুন, যে আমার কোনো কথা শোনার পর তা মুখস্থ ও সংরক্ষণ করল এবং যেভাবে শুনেছে হুবহু সেভাবে অন্যের কাছে পৌঁছে দিল। কেননা অনেক সময় ইলমের বাহক নিজে বড় আলেম বা ফকিহ হন না, অথচ তিনি এমন ব্যক্তির কাছে ইলম পৌঁছে দেন, যিনি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি বিজ্ঞ ও ফকিহ।”
[সুনানে তিরমিজি: ২৬৫৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩২, সুনানে দারিমি: ২২৯ — সহিহ]
◈ আল্লাহ তাআলা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দাওয়াত হতে হবে পূর্ণ জেনে-বুঝে এবং সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে:
قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
“বলুন, এটিই আমার পথ। আমি ও আমার অনুসারীগণ সুস্পষ্ট জ্ঞানের (জেনে-বুঝে প্রমাণের) ভিত্তিতেই আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই।” [সূরা ইউসুফ: ১০৮]
◈ ইসলামের সঠিক ও সুস্পষ্ট জ্ঞান ছাড়া আন্দাজে দ্বীনের কথা বলা বা ফতোয়া দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছোটো না।” [সূরা ইসরা: ৩৬]
◈ ইমাম বুখারি (রাহ.) সহিহ বুখারির بَابُ الْعِلْمِ قَبْلَ الْقَوْلِ وَالْعَمَلِ (কথা ও কাজের আগে জ্ঞানার্জন অধ্যায়ে) পরিষ্কার করেছেন যে, যেকোনো সঠিক দাওয়াত বা আমল শুরু করার আগে সঠিক ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। কেননা না জেনে দ্বীনি প্রচার বা কথা বললে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। তাই দাওয়াতি ময়দানে নামার আগে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করা একজন দাঈর জন্য অপরিহার্য শর্ত।
❑ বিশেষ নির্দেশনা:
১. আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর জন্য জানা আবশ্যক যে, দাওয়াতের প্রথম ধাপ শুরু হয় নিজেকে দিয়ে। অর্থাৎ সবার আগে নিজে সংশোধিত হবেন, ব্যক্তিজীবনে ইসলাম অনুসরণ করবেন ও তদনুযায়ী আমল করবেন। এরপর নিজ পরিবারে দাওয়াতি কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যরা কোনো অন্যায়ে লিপ্ত হলে তা সংশোধন করা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করা প্রত্যেক দায়িত্বশীলের ওপর অর্পিত আমানত।
২. যেকোনো স্থানে অন্যায় কাজ হতে দেখলে তা নিজের সাধ্য অনুযায়ী দূর করার চেষ্টা করতে হবে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
“তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তবে সে যেন তা নিজ হাতে প্রতিহত করে। যদি সেই সামর্থ্য না থাকে, তবে মুখের ভাষায় তা প্রতিহত করে। আর যদি তা-ও সামর্থ্য না থাকে, তবে যেন অন্তর দিয়ে তা অপছন্দ করে। আর এটিই ইমানের সর্বনিম্ন স্তর।” [মুসলিম]
মোটকথা, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো, আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। এ ক্ষেত্রে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে নম্রতা, ধৈর্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে হৃদয়ের আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ উপস্থাপন করা এবং নিজেও ব্যক্তিজীবনে দ্বীনের একজন জীবন্ত উদাহরণ হওয়া।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: