রোগব্যাধি দুঃখকষ্ট ও বিপদাপদে মুমিন বান্দাদের জন্য সীমাহীন মর্যাদা ও সুসংবাদ

দুনিয়ার জীবন মানেই তো সুখ-দুঃখ আর চড়াই-উতরাইয়ের এক দীর্ঘ সফর। এই চলার পথে রোগব্যাধি, দুঃখকষ্ট ও নানা বিপদাপদ মানুষের নিত্যসঙ্গী। যে কোনও সময় মুমিন জীবনের দিগন্ত জুড়ে দুঃখ-দুর্দশা, রোগশোক ও কষ্টের কালো মেঘে জমে যেতে পারে। কিন্তু মুমিনের জীবনে এ মেঘমালা কখনো কখনো অবারিত কল্যাণের বৃষ্টি হয়ে অঝর ধারায় বর্ষিত হতে পারে। যা তার জীবনের পাপপঙ্গীলতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয় এবং সীমাহীন কল্যাণের বার্তা নিয়ে হাজির হয় আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য। তাই এসব রোগ-শোক ও দুঃখকষ্ট মুমিন জীবনে কখন কীভাবে কল্যাণ ও সুসংবাদের বার্তাবাহী হয় এবং সেগুলো কী কী তা নিম্নে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হলো:
❑ রোগব্যাধি কখন বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়?
ইমানদারের জীবনে কোনও ক্ষতি বা পরাজয় বলে কিছু নেই; তার প্রতিটি মুহূর্তই পরম প্রাপ্তির। সে যখন ভালো কিছু পায় তখন শুকরিয়া আদায় করে। আর যখন কোনও রোগব্যাধি, ক্ষতি বা বিপদের মুখোমুখি হয় তখন সে বিন্দু পরিমাণ হতাশ হয় না। বরং আল্লাহর তকদিরের ফয়সালাকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে চরম ধৈর্য ধারণ করে এবং তাঁরই ওপর ভরসা করে অবিচল থাকে। আর ঠিক তখনই এই রোগব্যাধি ও দুঃখকষ্ট তার জীবনের জন্য অভিশাপ বা নিছক কষ্ট হয়ে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল রহমত ও বরকতের কারণ হয়ে ধরা দেয়। রোগব্যাধি কখন বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়—এ বিষয়টি কয়েকটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা হলো:
◈ ১. একজন ইমানদার ব্যক্তি যদি রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্থ হয় তাহলে তা তার জন্য আখিরাতের জন্য বিশাল কল্যাণ বয়ে আনে যদি সে এতে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ অভিমূখী হয় এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتُْم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ – أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফলাতের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা নিজেদের ওপর কোনও বিপদ এলে বলে, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব)। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমা ও রহমত এবং তারাই হলো হেদায়েত প্রাপ্ত।” [সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭]
◈ ২. মুমিন ব্যক্তির প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর:
মুমিন ব্যক্তির প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুদিনেও সে শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণকর। আর বিপদ-আপদে সে সবর করে, যা তার জন্যও কল্যাণকর।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের বিষয়টি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এই বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তার ভালো কিছু হলে সে শোকর আদায় করে। ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর তার কোনও অকল্যাণ বা মুসিবত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯; সহিহ]
◈ ৩. রোগব্যাধি ও বিপদাপদের বিশেষ দুআ ও পুরস্কার:
যেকোনো বালা-মুসিবত বা রোগব্যাধিতে পড়ার সময় এই দোয়া পাঠ করার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাআলা উত্তম প্রতিদান দান করেন। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ، فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللَّهُ: {إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ}، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا، إِلَّا أَخْلَفَ اللَّهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا
“কোনও মুসলিমের ওপর বিপদ আসার পর সে যদি আল্লাহ তাআলার শেখানো এই দোয়া পড়ে—’ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মা আজুরনি ফী মুসীবাতি ওয়া আখলিফ লী খাইরান মিনহা’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর চেয়ে উত্তম বিকল্প আমাকে দান করুন)—তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১৮; সহিহ]
◈ ৪. রোগব্যাধি মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে:
সুস্থতা ও প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষের মধ্যে আত্মম্ভরিতা, অহংকার ও গাফলতি তৈরি করে। কিন্তু রোগব্যাধি বা সামান্য অসুস্থতা মানুষকে অহংকার ভেঙে আল্লাহর দরবারে বিনীত হতে শেখায়। নিজের জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। অসুস্থ ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে যখন একজন বান্দা কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকেন এবং অতীতের ভুলত্রুটির জন্য তওবা করেন তখন এই কষ্ট তার জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
❑ রোগব্যাধিতে ধৈর্য ধারণের অর্থ কী?
এখানে সবর বা ধৈর্যের অর্থ হল, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশ না করা, মানসিকভাবে অস্থিরতায় না ভোগা, ভেঙে না পড়া এবং মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ না করা। বরং সর্বাবস্থায় তাকদির বা নিয়তির প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহ যে অবস্থায় রেখেছেন সেই অবস্থার জন্য তাঁর প্রশংসা করা। এমনকি এই অসুস্থতাকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির একটি সুযোগ মনে করে আরও বেশি আল্লাহমুখী হওয়া। তবে রোগব্যাধি ও বিপদাপদে ধৈর্য ধারণের অর্থ এই নয় যে, চিকিৎসা থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং সাধ্যমতো শরিয়তসম্মত উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নত। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে সর্বশ্রেষ্ঠ ধৈর্যশীল হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন রোগে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন, আরোগ্যের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং রোগ প্রতিরোধের নানা পদ্ধতির কথাও বলে গেছেন।
❑ অসুস্থতার কারণে ইবাদত কমে যাওয়া কি ইমানের দুর্বলতা?
অসুস্থতার কারণে ইবাদত কমে যাওয়া ইমানের দুর্বলতা নয়। এটি একটি ওজর। ওজরের কারণে অসুস্থ ব্যক্তি যদি সাধ্য অনুযায়ী ফরজ ইবাদতগুলো (বিশেষভাবে সালাত) সম্পাদন করতে পারে; সুন্নত বা নফল ইবাদত করতে নাও পরে তারপরও দয়াময় আল্লাহ আখিরাতে তার জন্য বিশাল পুরস্কার রেখেছেন আল হামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, ইমানি দুর্বলতা তখনই গণ্য হবে যখন একজন মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থাতে শরিয়ত অনুমোদিত ওজর ছাড়াই আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে থাকে কিংবা ইবাদতের ব্যাপারে অলসতা ও অবহেলা করে বা আল্লাহর তকদিরে উপরে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
❑ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলে বান্দা যেসব মর্যাদা ও পুরস্কার লাভ করে:
নিম্নে হাদিসের আলোকে কোন ইমানদার ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হলে তার জন্য যেসব মর্যাদা, শুভ সংবাদ ও পুরস্কার রয়েছে সেগুলো অতিসংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. অসুস্থ ব্যক্তি আখিরাতে এমন মর্যাদা লাভ করে যা কেবল আমল দ্বারা সম্ভব ছিল না:
রোগের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করলে বান্দা এমন উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে যায় যা সে কেবল নিজের আমলের মাধ্যমে অর্জন করতে পারত না। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللهِ مَنْزِلَةٌ، لَمْ يَبْلُغْهَا بِعَمَلِهِ ابْتَلَاهُ اللهُ فِي جَسَدِهِ، أَوْ فِي مَالِهِ، أَوْ فِي وَلَدِهِ ثُمَّ صَبَّرَهُ عَلَى ذَلِكَ حَتَّى يُبْلِغَهُ الْمَنْزِلَةَ الَّتِي سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللهِ تَعَالَى
“যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে আমলের মাধ্যমে লাভ করতে সক্ষম ছিল না, তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ বা সন্তানকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে ধৈর্য ধারণের সক্ষমতা দান করে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন।” [আহমদ, হাদিস ২২৩৩৮; আবু দাউদ, হাদিস ৩০৯০, সহিহ]
✪ ২. রোগব্যাধি, দুঃখকষ্ট এবং বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মোচন করেন:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
“কোনও মুসলিমের ওপর যে ক্লান্তি, রোগব্যাধি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট কিংবা মনোবেদনা আসে, এমনকি একটি কাঁটাও যদি তাকে বিদ্ধ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৭৩]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ
“কোনও মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হলে বা তার চেয়ে ছোট কোনও আঘাত লাগলে, এর বিনিময়ে তার এক স্তর মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি গুনাহ ক্ষমা করা হয়।” [মুসলিম, হাদিস ২৫৭২; সহিহুল জামে, হাদিস ১৬৬০]
✪ ৩. কেউ যদি অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে তাহলে তার আবাসে থাকা বা সুস্থ অবস্থার ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায় লিখে দেওয়া হয়:
আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا
“বান্দা যখন অসুস্থ হয় কিংবা সফরে বের হয়, তখন তার জন্য তেমন আমলই লিখে দেওয়া হয়, যেমনটি সে মুকিম অবস্থায় ও সুস্থ থাকাকালীন করত।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৯৯৬]
✪ ৪. আখিরাতে ইর্ষণীয় পুরস্কার লাভ:
কিয়ামতের দিন বিপদগ্রস্তদের প্রতিদান দেখে সুস্থ ব্যক্তিরাও আফসোস করবে যে, দুনিয়াতে যদি তাদেরও এমন কষ্ট হতো!
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
يَوَدُّ أَهْلُ العَافِيَةِ يَوْمَ القِيَامَةِ حِيْنَ يُعْطَى أَهْلُ البَلَاءِ الثَّوَابَ لَوْ أَنَّ جُلُودَهُمْ كَانَتْ قُرِضَتْ فِي الدُّنْيَا بِالـمَقَارِيْضِ
“কিয়ামতের দিন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিদান দেওয়া হলে দুনিয়ার বিপদমুক্ত মানুষেরা আফসোস করে বলবে: হায়! দুনিয়াতে যদি কাঁচি দিয়ে আমাদের শরীরের চামড়া কেটে টুকরো টুকরো করা হতো!” [তিরমিজি, হাদিস ২৪০২, হাসান]
✪ ৫. কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি:
নির্দিষ্ট কিছু রোগে মৃত্যুবরণকারীকে কবরের আজাব দেওয়া হয় না। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ قَتَلَهُ بَطْنُهُ لَمْ يُعَذَّبْ فِيْ قَبْرِهِ
“পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে কবরের শাস্তি দেওয়া হবে না।” [তিরমিজি, হাদিস ১০৬৪; সহিহুত তারগিব, হাদিস ১৪১০; সহিহুল জামে, হাদিস ৬৪৬১, সহিহ]
✪ ৬. শহিদের মর্যাদা লাভ:
আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া ছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু রোগে মৃত্যুবরণকারী শহিদের মর্যাদা লাভ করে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
الشَّهَادَةُ سَبْعٌ سِوَى الْقَتْلِ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ: الْمَطْعُوْنُ شَهِيْدٌ، وَالْغَرِقُ شَهِيْدٌ، وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيْدٌ، وَالْمَبْطُوْنُ شَهِيْدٌ، وَصَاحِبُ الْحَرِيْقِ شَهِيْدٌ، وَالَّذِيْ يَمُوْتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيْدٌ، وَالْمَرْأَةُ تَمُوْتُ بِجُمْعٍ شَهِيْدٌ
“আল্লাহর রাস্তায় নিহত ব্যক্তি ছাড়াও আরও সাত ধরনের শহিদ রয়েছে: মহামারীতে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, প্লুরিসি বা বুকে ব্যথা জনিত রোগে মৃত ব্যক্তি, পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, দেয়াল ধসে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং সন্তান প্রসবের মৃত বা গর্ভকালীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী।” [আবু দাউদ, হাদিস ৩১১১; মিশকাত, হাদিস ১৫৬১, সহিহ]
✪ ৭. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম:
রোগ ও বিপদে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ عِظَمَ الجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ البَلَاءِ، وَإِنَّ اللهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
“বড় পরীক্ষার সঙ্গেই রয়েছে বড় প্রতিদান। আল্লাহ যখন কোনও জাতিকে ভালোবাসেন তখন তাদের বিভিন্ন বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যারা এতে সন্তুষ্ট থাকে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর যারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।” [তিরমিজি, হাদিস ২৩৯৬; সহিহাহ, হাদিস ১৬৪, হাসান]
✪ ৮. জ্বর ও শারীরিক উষ্ণতা পাপ মোচনের মাধ্যম:
সামান্য জ্বর বা শারীরিক কষ্টও মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত হিসেবে আসে, যা তার গুনাহগুলোকে ঝরিয়ে দেয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْحُمَّى حَظُّ كُلِّ مُؤْمِنٍ مِنَ النَّارِ
“নিশ্চয়ই জ্বর হলো জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিটি মুমিনের নির্ধারিত অংশ (অর্থাৎ দুনিয়াতে জ্বর হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দাকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দেন)।” [মুসনাদ আহমদ, হাদিস ৪৬৪; সহিহুল জামে, হাদিস ৩৭০৫]
অর্থাৎ জ্বর মুমিনের গুনাহ এমনভাবে মুছে দেয় যে, এর বিনিময়ে সে আখিরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যায়। দুনিয়ার এই সামান্য কষ্টটুকুই যেন তার জন্য জাহান্নামের প্রাপ্য অংশ পূরণ করে দেয়। ফলে আখেরাতে তাকে আর সেই আগুনের মুখোমুখি হতে হয় না। জ্বরের ব্যাপারে অন্য একটি হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«لا تَسُبِّي الحُمَّى؛ فإنَّها تُذْهِبُ خَطَايَا بَنِي آدَمَ، كَمَا يُذْهِبُ الكِيرُ خَبَثَ الحَدِيدِ»
“জ্বরকে গালি দিও না। কারণ জ্বর মানুষের গুনাহগুলো এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন ভাবে হাপর (কামারের আগুনের চুলা) লোহাকে পুড়িয়ে তার মরচে ও ময়লা দূর করে দেয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৫]
অন্য একটি হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رضي الله عنه قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يُوعَكُ، فَقُلْتُ: إِنَّكَ تُوعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا؟ قَالَ: أَجَلْ، إِنِّي أُوعَكُ كَمَا يُوعَكُ رَجُلَانِ مِنْكُمْ. قُلْتُ: ذَلِكَ أَنَّ لَكَ أَجْرَيْنِ؟ قَالَ: أَجَلْ، ذَلِكَ كَذَلِكَ، مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى، مَرَضٌ فَمَا سِوَاهُ، إِلَّا حَطَّ اللهُ بِهِ سَيِّئَاتِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ وَرَقَهَا
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, একদিন আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে গেলাম, তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন।
আমি বললাম: আপনার তো প্রচণ্ড জ্বর?
তিনি বললেন: হ্যাঁ, তোমাদের দুজন মানুষ যতটা জ্বরে আক্রান্ত হয় আমি একাই ততটা জ্বরে আক্রান্ত হই।
আমি বললাম: তাহলে তো আপনার দ্বিগুণ সওয়াব হবে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই। কোনও মুসলিমের রোগ বা অন্য যেকোনো কষ্ট হলে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহগুলো এমনভাবে ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতা ঝরায়। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৬০, ৫৬৬৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭১]
✪ ৯. মৃগী রোগের মর্যাদা:
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ قَالَ: قَالَ لِي ابْنُ عَبَّاسٍ رضي الله عنهما: أَلَا أُرِيكَ امْرَأَةً مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ؟ قُلْتُ: بَلَى. قَالَ: هَذِهِ الْمَرْأَةُ السَّوْدَاءُ أَتَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ: إِنِّي أُصْرَعُ وَإِنِّي أَتَكَشَّفُ، فَادْعُ اللهَ لِي. قَالَ: إِنْ شِئْتِ صَبَرْتِ وَلَكِ الْجَنَّةُ، وَإِنْ شِئْتِ دَعَوْتُ اللهَ أَنْ يُعَافِيَكِ. فَقَالَتْ: أَصْبِرُ. فَقَالَتْ: إِنِّي أَتَكَشَّفُ فَادْعُ اللهَ أَنْ لَا أَتَكَشَّفَ. فَدَعَا لَهَا
আতা ইবনে আবি রাবাহ বলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে বললেন:
আমি কি তোমাকে জান্নাতি একজন নারী দেখাব না?
আমি বললাম: হ্যাঁ।
তিনি বললেন: এই কালো বর্ণের নারী, যিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বলেছিলেন, আমার মৃগীরোগ আছে আর এতে আমার শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
তিনি বললেন: তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ কর তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর তুমি চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।
মহিলা বললেন: আমি ধৈর্য ধারণ করব। এরপর তিনি বললেন, তবে এতে আমার শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। আপনি দোয়া করুন যেন তা না হয়।
তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার জন্য দোয়া করলেন। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৬]
এই মহিলার পরিচয় সম্পর্কে ইমাম মুস্তাগফির রচিত ‘কিতাবুস সাহাবাহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একজন হাবশি (ইথিওপিয়ান) নারী। তার নাম সুআইরাহ আল আসাদিয়্যাহ (রা.)। তিনি জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত মহিলা সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত।
✪ ১০. দৃষ্টিশক্তি হারানোর বা অন্ধত্বের উপর ধৈর্য ধারণের পুরস্কার:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন:
يَقُولُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: مَنْ أَذْهَبْتُ حَبِيبَتَيْهِ فَصَبَرَ وَاحْتَسَبَ لَمْ أَرْضَ لَهُ ثَوَابًا دُونَ الْجَنَّةِ
“আমি যার দুটি প্রিয় বস্তু (দুটি চোখ বা দৃষ্টিশক্তি) কেড়ে নিই এবং সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে ও সওয়াবের আশা রাখে তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কোনও কম প্রতিদানে আমি সন্তুষ্ট হই না।” [সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৪০১; মুসনাদ আহমদ; সহিহুল জামে, হাদিস ৮০৭৫]
◈ ১১. অসুস্থ ব্যক্তির কষ্টের কথা গোপন রাখার সওয়াব:
রোগের কষ্টে অধৈর্য না হয়ে এবং মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ না করে যারা নীরবে পরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে তা সহ্য করেন আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত করে দেন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَرْسَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ مَلَكَيْنِ، فَقَالَ: انْظُرُوا مَا يَقُولُ لِزُوَّارِهِ؟ فَإِنْ هُوَ حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ إِذَا جَاءوهُ، رَفَعَ ذَلِكَ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَهُوَ أَعْلَمُ، فَيَقُولُ: لِعَبْدِي عَلَيَّ إِنْ تَوَفَّيْتُهُ أَنْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ، وَإِنْ شَفَيْتُهُ أَنْ أُبْدِلَهُ لَحْمًا خَيْرًا مِنْ لَحْمِهِ، وَدَمًا خَيْرًا مِنْ دَمِهِ، وَأَنْ أُكَفِّرَ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ
“বান্দা যখন অসুস্থ হয় তখন আল্লাহ তার কাছে দুজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন এবং বলেন: দেখো, সে তার দেখতে আসা মানুষদের কী বলে? যদি সে তাদের কাছে আল্লাহর প্রশংসা করে ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তবে তা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা হয় (যদিও আল্লাহ সব জানেন)। তখন আল্লাহ বলেন, আমার এই বান্দার ওপর আমার হক হলো—যদি আমি তার মৃত্যু দিই তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো আর যদি তাকে সুস্থ করে দিই তবে তার আগের রক্ত-মাংসের পরিবর্তে আরও উত্তম রক্ত-মাংস দান করবো এবং তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবো।” [মুওয়াত্তা মালেক, হাদিস নং ৫৪৩; মুসনাদ আহমদ, সহিহুত তারগিব, হাদিস নং ৩৪২৪]
পরিশেষে রোগব্যাধি ও শারীরিক কষ্ট মুমিনের জীবনের দুর্ভোগ নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, পাপ মোচন, রবের নৈকট্য অর্জন এবং আখিরাতে সুউচ্চ মর্যাদা লাভ এবং এক অমূল্য সুযোগ। তাই আসুন, অসুস্থতার কঠিন মুহূর্তে অস্থির বা হতাশ না হয়ে চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে তাকদিরের ফয়সালা মেনে নিই এবং সুন্নাহসম্মত উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে আল্লাহর দরবারে অবনত হই। হে পরম দয়াময় আল্লাহ! আপনি আমাদের সকল রোগ-শোকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন এবং আমাদের প্রতিটি কষ্টকে পাপ মোচন ও জান্নাত লাভের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: