আজান ও ওজু এবং সালাত সংক্রান্ত সমাজে প্রচলিত কতিপয় বিদআত

এ কথা অনস্বীকার্য যে, সময়ের ব্যবধানে আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দ্বীনের নামে এমন অনেক বিষয় প্রচলিত হয়ে পড়েছে, যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা তাঁর সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত নয়; যার অপর নাম বিদআত। আমরা জানি, ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, তা সুন্নাহসম্মত হওয়া, অর্থাৎ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী সম্পাদিত হওয়া। এই শর্ত লঙ্ঘিত হলে কোনও ইবাদতই আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না; বরং বিদআত কারীর জন্য তা হাশরের ময়দানে হাউজে কাওসারের পানি পান থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হবে, যার পরিণতি জাহান্নাম।
আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার বিদআত থেকে হেফাজত করুন। আমিন। নিম্নে আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আজান, ওজু, সালাত ও দোয়া সংক্রান্ত কতিপয় বিদআত ও সুন্নাহ বিরোধী কার্যক্রম অতি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
❑ ক. আজান সংক্রান্ত বিদআত:
✪ ১. আজান শুরু করার আগে মাইকে উচ্চস্বরে দরুদ পড়া কিংবা তা সুন্নত মনে করা বিদআত। বরং সুন্নত হলো, আজান শেষে ব্যক্তিগতভাবে চুপিস্বরে দরুদ পাঠ করা, অতঃপর আজানের দোয়া পড়া।
✪ ২. আজান বা ইকামতে “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ” পড়ার পরে বা শ্রবন করে উভয় হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি চুম্বন করে তা দুই চোখে স্পর্শ করা। বিশুদ্ধ হাদিসে এর কোনও ভিত্তি নেই। এর সপক্ষে যেসব হাদিস পেশ করা হয় সেগুলো বানোয়াট, না হয় সনদগতভাবে অপ্রমাণিত।
✪ ৩. আজান বা ইকামতের সময় ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’-এর পর ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” পাঠ করা
হাদিস সম্মত নয়। ‌ সুন্নত হল, মুয়াজ্জিন আজানে যে শব্দগুলো উচ্চারণ করেন শ্রোতাও হুবহু সেগুলো উচ্চারণ করে জবাব দিবেন শুধু “হাইয়্যা ‘আলাস সালাহ…ফালাহ” ছাড়া।
এই দুই ক্ষেত্রে বলতে হবে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” হাদিসে এমনটিই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এর বাইরে কোন কিছু যুক্ত করা বৈধ নয়।
✪ ৪. আজানের দোয়ায় “ওয়াদ দারাজাতার রাফীয়াহ” অংশটি যুক্ত করা বিদআত। কেননা তা হাদিস দ্বারা সমর্থিত নয়।
❑ খ. ওজু ও তাহারাত সংক্রান্ত বিদআত:
✪ ১. প্রতিবার ওজুর পূর্বে ইস্তিনজা বা শৌচকার্য করাকে আবশ্যক মনে করা।
✪ ২. মুখে উচ্চারণ করে আরবি বা বাংলায় গৎবাঁধা নিয়ত পাঠ করা (যেমন: “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি…”)।
✪ ৩. ওজুতে নাক-মুখে পানি দেওয়া, মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করা, মাথা মাসেহ করা ইত্যাদি প্রতিটি অঙ্গের জন্য পৃথক পৃথক দোয়া পড়া।
✪ ৪. ওজু শেষে শাহাদাত অঙ্গুলি আকাশের দিকে তুলে ইশারা করে ওজুর দোয়া পাঠ করা।
✪ ৫. ওজুতে ঘাড় মাসেহ করা। অনেক আলেমের মতে এটিও বিদআত। কেননা এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো তাঁদের মতে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
❑ গ. সালাত সংক্রান্ত বিদআত:
✪ ১. জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করার পূর্বে “ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী…” দোয়া পড়া, যাকে সাধারণ মানুষ ‘জায়নামাজ পাক করার দোয়া’ বলে থাকে।
তবে তাকবিরে তাহরিমার পরে আউযুবিল্লাহ পাঠ করার পূর্বে ইস্তিফতাহ বা নামাজ শুরুর দুআ হিসেবে এটি পড়া সুন্নত সম্মত। চাই রাতের নফল নামাজে হোক কিংবা অন্যান্য ফরজ বা সু্ন্নত নামাজে হোক।
✪ ২. ফরজ, সুন্নত, নফল, ঈদ, জানাজা প্রভৃতি সালাতের শুরুতে কিবলা মুখী হয়ে দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমার পূর্বে আরবিতে বা বাংলায় নির্দিষ্ট গৎবাঁধা নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বিদআত। তবে মনে মনে নিয়ত থাকা অপরিহার্য। নিয়ত ছাড়া সালাত শুদ্ধ হবে না।
✪ ৩. ফরজ সালাতের ইকামত হওয়ার পর নতুন করে সুন্নত সালাত শুরু করা কিংবা তা অব্যাহত রাখা হাদিস পরিপন্থী কাজ। (আমাদের সমাজের মসজিদগুলোতে বিশেষত ফজরের সালাতে এ বিষয়টা বেশি দেখা যায়)।
✪ ৪. অনেক মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করে দুখুলুল মসজিদের দু রাকাত সালাত না পড়েই বসে পড়ে। অথচ হাদিস অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ। বরং জুমার খুতবা চলাকালীন সময়ও মসজিদে বসতে চাইলে হালকাভাবে দু রাকাত সালাত পড়ার ব্যাপারে তাগাদা এসেছেন।
✪ ৫. মূল খুতবার আগে পৃথকভাবে ‘বয়ান’ পেশ করাকে নিয়মে পরিণত করা।
প্রকৃতপক্ষে খুতবার মূল উদ্দেশ্য হলো, মুসল্লিদের দ্বীন ও দুনিয়া সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া, তাদের নিকট হেদায়েতের বার্তা পৌঁছানো এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে অনুপ্রাণিত করা। কিন্তু আমাদের সমাজের হানাফি মসজিদগুলোতে খুতবা কেবল আরবি ভাষায় প্রদান করা আবশ্যক—এমন ধারণা থেকেই মূল খুতবার আগে পৃথকভাবে ‘বয়ান’ দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে, যা মূলত খুতবার মধ্যে একটি সংযোজন এবং সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ-যা অবশ্যই বর্জনীয়। এর পরিবর্তে মূল খুতবার ভেতরেই মাতৃভাষায় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও দিকনির্দেশনা যুক্ত করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তুলে ধরাই অধিক বিশুদ্ধ ও সঠিক পদ্ধতি।
✪ ৬. রমজান মাসে তারাবিহ সালাতে প্রতি চার রাকাত পরপর “সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুত…” দোয়াটি নিয়মিতভাবে সম্মিলিত কণ্ঠে বা একাকী চুপিস্বরে অথবা উচ্চস্বরে পাঠ করাকে সুন্নত মনে করা কিংবা নিয়মিত পাঠ করা।
✪ ৭. রমজান মাসে সেহেরির জন্য গভীর রাত থেকে মাইকে কুরআন তিলাওয়াত, গজল, ইসলামি সংগীত বা নাশিদ পরিবেশন করা এবং কিছুক্ষণ পরপর মানুষকে ডেকে জাগানো। এসবই বিদআত। সুন্নত হল, সেহেরির জন্য পৃথক আজান দেওয়া।
✪ ৮. শবে বরাত, শবে মেরাজ প্রভৃতি উপলক্ষে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিশেষ সালাত আদায় করা। (যেমন: ‘সালাতুর রাগায়েব’ নামে একশ রাকাত সালাত)।
উল্লেখ্য যে, এসব রাত উপলক্ষে কোনও বিশেষ ইবাদত-বন্দেগি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই অধিক বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এসব রাত উদযাপন করা বিদআত।
✪ ৯. শবে কদর (লাইলাতুল কদর) উপলক্ষে রাতের নফল সালাতে বিশেষ কিছু সুরা পাঠকে সুন্নত বা আবশ্যক মনে করা; যেমন: সুরা ফাতিহার পর নির্দিষ্ট সংখ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা কদর প্রভৃতি পাঠ করা।
✪ ১০. সমস্বরে ঈদের তাকবির পাঠ করা।
❑ ঘ. সালাত পরবর্তী বিদআতসমূহ:
✪ ১. প্রতিটি ফরজ সালাতের সালাম ফেরানোর পরপরই ইমাম-মুক্তাদি সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে বা নির্দিষ্ট নিয়মে হাত তুলে নিয়মিত দোয়া-মোনাজাত করা বিদআত। জানাজা, ঈদ কিংবা অন্যান্য সালাতের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।
✪ ২. সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে ডান হাত কপালে বা মাথায় রেখে নির্দিষ্ট সংখ্যায় আল্লাহর কোনও নাম জপা বা বিশেষ কোনও দোয়া পড়া।
সুন্নত হলো, স্বাভাবিকভাবে হাদিস সম্মত দোয়া ও আজকারগুলো পাঠ করা।
✪ ৩. সালাতের পর সবাই মিলে দলবদ্ধ হয়ে নির্দিষ্ট ছন্দে শরীর দুলিয়ে উচ্চস্বরে, কিংবা গোল হয়ে বসে চোখ বন্ধ করে চুপিচুপি নির্দিষ্ট সংখ্যায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বা শুধু ‘হু হু’ পাঠ করা।
তবে নিজে নিজে সাধারণভাবে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ জিকির করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। তা যে কোনও সময় করা যায়।
✪ ৪. সালাতের পর মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে একটি মাত্র সেজদা দিয়ে বিদায় নেওয়া, যাকে অনেকে ‘শুকরিয়ার সেজদা’ বলে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়।
✪ ৫. সালাতের পর সুন্নত মনে করে ঈদ উপলক্ষে বিশেষভাবে কুলাকুলি করা বিদআত। তবে দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ হওয়া, দূর থেকে কারও সঙ্গে দেখা হওয়া, আবেগ ও ভালোবাসাবশত প্রিয়জনের সঙ্গে কুলাকুলি করা কিংবা মনোমালিন্য দূর করতে কারও সঙ্গে কুলাকুলি করায় কোনও দোষ নেই।
❑ ঙ. বিদআতের ব্যাপারে সতর্কবাণী:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন উদ্ভাবন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৬৯৭]
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিভিন্ন সময় খুতবা বা বক্তৃতার শুরুতে বলতেন,
أَمَّا بَعْدُ: فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ
“অতঃপর, সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ; সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়াদি আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।” [সহিহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ: সালাত ও খুতবা সংক্ষিপ্ত করণ]
উপসংহার: সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশিত বিশুদ্ধ পন্থায় ইবাদত পালন করাই প্রকৃত আনুগত্য। আর এটাই মুক্তির একমাত্র পথ। আর বিদআত বা দ্বীনের নব সংযোজিত প্রতিটি বিষয়ই ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের পথ। তাই মুক্তিকামী সকল মুসলিমের জন্য সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা এবং সর্ব প্রকার বিদআত থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: