বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এই যুগে ডোনার দ্বারা গর্ভধারণ বা টেস্টটিউব বেবি গ্রহণের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ ব্যাপারে ইসলামের শরিয়তের সঠিক অবস্থান জানা অপরিহার্য। তাই এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
ডোনার বা দাতার শুক্রাণু, ডিম্বাণু বা ভ্রূণ ব্যবহার করে সন্তান নেওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি পদ্ধতি হলেও ইসলামি শরিয়তে তা সম্পূর্ণ হারাম। স্বামী-স্ত্রীর বাইরে অন্য কারো প্রজনন উপাদান ব্যবহারের কারণে সমকালীন প্রায় সকল আলেম ও রাবেতায়ে আলম আল ইসলামের ফিকহ একাডেমি একে নিষিদ্ধ বলে স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন।
হারাম হওয়ার মূল কারণসমূহ:
১. নসব বা বংশ পরিচয়ের সংমিশ্রণ —ডোনার শুক্রাণু বা ডিম্বাণু ব্যবহার করলে সন্তানের প্রকৃত বংশপরিচয় অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে, যা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ”
“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত।” [সূরা আহযাব: ৫]
২. এটি মূলত পরনারী বা পরপুরুষের প্রজনন উপাদান স্ত্রীর গর্ভাশয়ে বা ভ্রূণে প্রবেশ করানোর শামিল, যা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বিধায় নিষিদ্ধ, যদিও এতে সরাসরি শারীরিক সংসর্গ ঘটে না।
৩. নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ”
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে তার জন্য বৈধ নয় যে সে তার পানি অন্যের চারাগাছে সিঞ্চন করবে।” [আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৮]
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, একজন পুরুষের বীর্য কেবল তার নিজ স্ত্রীর গর্ভাশয়েই বৈধ; অন্য কোনো নারীর ক্ষেত্রে নয়।
৪. এতে উত্তরাধিকার, মাহরাম নির্ধারণ, বিবাহ-নিষিদ্ধতা ইত্যাদি সংক্রান্ত জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা শরিয়তের মূল লক্ষ্য তথা বংশ সংরক্ষণের (হিফযুন নসব) সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তবে স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রজনন (আইভিএফ) বা টেস্ট-টিউব পদ্ধতিতে সন্তান লাভ করা (যেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রজনন উপাদান সংমিশ্রিত হয় না) তা বিশুদ্ধ মতানুসারে জায়েজ। কেননা তখন বংশ পরিচয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
মোটকথা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।কিন্তু ডোনার কনসেপশনের মতো পদ্ধতি বংশ পরিচয়ের সংমিশ্রণ ও শরিয়তবহির্ভূত উপায়ে গর্ভধারণের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় বিধায় তা হারাম। এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের মাঝে কোন দ্বিমত নেই। আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
-আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ.
প্রশ্ন: সুলতানাত অব ওমান থেকে আমাদের এক ভাই একটি প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, প্রথমবার আপনাদের কাছে প্রশ্ন পাঠাতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। প্রশ্নটি হলো, পত্রপত্রিকায় আমরা প্রায়ই টেস্ট টিউব বা ইনজেকশনের মাধ্যমে গর্ভধারণের কথা পড়ি। কোনো কোনো হাসপাতালে নারীর গর্ভধারণের জন্য এভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষ করে স্বামী যদি অক্ষম হয় তবে ডাক্তার অন্য কোনো পুরুষের বীর্য নিয়ে ওই নারীর গর্ভে স্থাপন করে।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামে কি এই পদ্ধতি বৈধ? আর যদি বৈধ না হয় তবে যারা এটি করবে বা তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, তাদের শাস্তি কী? আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
(সম্ভবত তিনি ‘টেস্ট টিউব বেবি’র কথা বুঝিয়েছেন।)
উত্তর: এটি একটি বিস্তারিত বিষয়। মক্কার ‘ইসলামিক ফিকহ একাডেমি’ (রাবেতা)-এর সদস্যগণ অতীতে একটি সভায় এটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন এবং কোন পদ্ধতি নিষিদ্ধ আর কোনটি বৈধ তা স্পষ্ট করেছেন।
প্রশ্নকারী যে বিষয়ের কথা বলেছেন তা প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে:
ফিকহ একাডেমি যা বৈধ বলেছে, তা হল, যদি নারী বা পুরুষ বন্ধ্যা না হন কিন্তু স্ত্রীর ডিম্বাশয় বা ডিম্বাণু বহনের নালীতে কোনো রোগের কারণে গর্ভধারণে সমস্যা হয় অথবা পুরুষের বীর্য স্ত্রীর গর্ভ পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে স্বামীর শরীর থেকে বীর্য সংগ্রহ করে তা স্ত্রীর গর্ভে ইনজেকশন বা টেস্ট টিউবের মাধ্যমে স্থাপন করা যেতে পারে। আল্লাহ চাইলে এর মাধ্যমে গর্ভ সঞ্চার হতে পারে।
– উপস্থাপক: অর্থাৎ বীর্যটি স্বামীর নিজেরই হতে হবে?
– শায়খ (আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.):
হ্যাঁ, বীর্যটি অবশ্যই স্বামীর নিজের হতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা চিকিৎসিকা সম্পন্ন করবেন। যদি সম্ভব হয় তবে একজন মহিলা ডাক্তারই এটি করা উত্তম। তিনি স্বামীর শরীর থেকে সংগৃহীত বীর্য স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করবেন।
যদি মহিলা ডাক্তার পাওয়া না যায় তবে প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারও এটি করতে পারবেন। ফিকহ একাডেমি এই পদ্ধতিটিকে বৈধ বলেছে এবং এটি সফল হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। তবে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, তাই পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এটি অবশ্যই স্বামী, স্ত্রী এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের উপস্থিতিতে হতে হবে। অন্য কেউ থাকা যাবে না। কারণ এ প্রক্রিয়ায় মহিলার সতরের (লজ্জাস্থান) অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে তাই স্বামী ছাড়া অন্য কারোরই (এমনকি মাহরাম বা আত্মীয়দেরও) সেখানে উপস্থিত থাকার অনুমতি নেই। কারণ মাহরামরাও নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ দেখার অধিকার রাখেন না।
সুতরাং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যদি মনে করেন যে, এটিই গর্ভধারণের একমাত্র উপায় এবং স্বামী-স্ত্রীর অন্য কোনো সমস্যা নেই তবেই কেবল এটি করা যেতে পারে।
তবে আমি বলব, এটি বৈধ হওয়া সত্ত্বেও সতর্কতা হিসেবে তা বর্জন করাই উত্তম; যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়।
– উপস্থাপক: স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে হলেও কি বর্জন করা উত্তম?
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে হলেও এটি বর্জন করা শ্রেয়। কারণ এতে অনেক জটিলতা বা শঙ্কার অবকাশ থাকে। মানুষ অসাবধানতাবশত ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। তাই আলেমদের মতে, পূর্ণ সতর্কতা ছাড়া এটি না করাই ভালো।
আর যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর বাইরের অন্য কোনো পুরুষের বীর্য গ্রহণ করে তবে তা মুসলিমদের ঐকমত্যে হারাম ও অবৈধ। এটি ব্যভিচারের শামিল। এ ধরণের কাজ জঘন্য অপরাধ। যদি এমনটি প্রমাণিত হয় তবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো, যারা এর সাথে জড়িত অর্থাৎ যারা তা করেছে এবং যারা এতে সন্তুষ্ট ছিল তাদের সবাইকে যথাযথ শাস্তি (তাজির) দেওয়া, যেন ভবিষ্যতে এমন দুঃসাহস আর কেউ না করে।
তৃতীয় চিত্র: এটি ফিকহ একাডেমির বৈধতার তালিকার দ্বিতীয় পদ্ধতি। অর্থাৎ স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের বীজ (বীর্য ও ডিম্বাণু) সংগ্রহ করে একটি টেস্ট টিউবে নির্দিষ্ট নিয়মে মিশিয়ে তা স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা। এটি প্রথম পদ্ধতির চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চিকিৎসকদের গবেষণাগারে অনেক সময় বিভিন্ন মানুষের নমুনা রাখা থাকে। ফলে বিভ্রান্তি বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের আশঙ্কা থেকে যায়।
সারকথা হলো, ফিকহ একাডেমির অধিকাংশ সদস্য উল্লিখিত দুটি পদ্ধতিকে (স্বামীর বীর্য স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা অথবা উভয়ের মিশ্রণ টেস্ট টিউবে রেখে পরে স্থাপন করা) বৈধ বলেছেন।
তবে কিছু সদস্য এতে সতর্কাবস্থান নিয়েছেন বা নিষিদ্ধ বলেছেন। আমিও এ ব্যাপারে সতর্কাবস্থান নিয়েছি। কারণ এতে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি।
সুতরাং মূল কথা হলো—এই পদ্ধতি কেবল স্বামী ও স্ত্রীর ক্ষেত্রেই বৈধ। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর বাইরের কারো বীর্য বা ডিম্বাণু ব্যবহার করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও অবৈধ। এতে কোনো বিতর্ক নেই। বিতর্কের জায়গা কেবল ওই দুই পদ্ধতিতেই, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাও তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করার শর্ত রয়েছে।
– উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন। তাহলে এর একাধিক রূপ রয়েছে এবং প্রত্যেকটির বিধান ভিন্ন।
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, ফিকহ একাডেমি কেবল ওই দুটি পদ্ধতিই বৈধ বলেছে।
– উপস্থাপক: যা স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে হয়।
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, ঠিক তাই।
– উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাদের বরকত দান করুন।
(সূত্র: শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ‘নূরুন আলাদ দারব’ অনুষ্ঠান)
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।