খেলোয়াড়দের ছবি-নাম ও ক্লাবের লোগোযুক্ত স্পোর্টস জার্সি কেনা-বেচার বিধান

প্রশ্ন: আমি একজন স্পোর্টস পোশাকের খুচরা বিক্রেতা। বর্তমানে ইউরোপীয় ক্লাব ও জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নাম ও লোগোযুক্ত জার্সি পরার প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু ক্লাবের লোগোতে ক্রুশের চিহ্নও থাকে। এই পোশাকগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত পণ্য। আমরা দোকানদাররা এ নিয়ে বেশ বিব্রত—বিক্রি না করলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব, এমনকি দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। কারণ অন্য দোকানগুলোতে এগুলো সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমরা হালাল উপার্জনের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
নিচের বিষয়গুলোতে শরিয়তের বিধান জানতে চাই:
১. ইউরোপীয় ক্লাবের জার্সি কেনা, বিক্রি করা ও পরার হুকুম কী? এই জার্সিতে খেলোয়াড়ের নাম লেখা থাকলে তা পরে নামাজ পড়া যাবে কি?
২. শুধু নম্বরযুক্ত (নামবিহীন) জার্সির হুকুম কী?
৩. নাম ও নম্বর কিছুই নেই—এমন ইউরোপীয় ক্লাবের জার্সি বিক্রির হুকুম কী?
৪. যে জার্সির লোগো থেকে ক্রুশচিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে তা বিক্রির হুকুম কী?
৫. এটি কি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত বিষয় হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রত্যেকে নিজ নিয়তের ওপর দায়বদ্ধ থাকবে? এটি কি হারাম নাকি মাকরুহ?
৬. এই বিক্রয় জায়েজ না হলে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের করণীয় কী?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর।
🔸প্রথমত: আজকের যুগে ফুটবলের প্রতি মানুষের আসক্তি এবং খেলোয়াড় ও ক্লাবগুলোর প্রতি একধরনের গভীর অনুরাগ ও তাজিম (সম্মান) যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা কারো অজানা নয়। জার্সি পরিধান, খেলোয়াড়দের নাম ও নম্বর ব্যবহার এবং তাদের অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ—সবই এই তীব্র আসক্তির বহিঃপ্রকাশ।
শায়খ যিয়াব আল গামিদি তাঁর “হাকিকাতু কুরাতিল কাদাম” গ্রন্থে ফুটবলের ক্ষতিকর দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যারা এ খেলার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানতে চান তারা গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
🔸দ্বিতীয়ত: প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়টি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি বড় দিক। মুসলিমরা অমুসলিম বিবেকহীন ও বিশৃঙ্খল সমর্থকদের অন্ধ অনুকরণ করে ওই খেলা ও খেলোয়াড়দের প্রতি মুগ্ধতায় ডুবে আছে। অথচ খেলোয়াড়রা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সতর প্রকাশ করে এবং তাদের জীবনযাপন অশ্লীল ও ফাসেকিপূর্ণ, যা একজন মুসলিমের জন্য কাম্য নয়।
🔸তৃতীয়ত: কোনো মুসলিমের জন্য এমন পোশাক পরা বৈধ নয়, যাতে কাফের বা তাদের ক্লাবের প্রতি সম্মান বা তাজিম ফুটে ওঠে। তাই জার্সিতে খেলোয়াড়ের নাম, ক্লাবের নাম বা নম্বর থাকা অবস্থায় তা পরিধান করা জায়েজ নয়। একইভাবে কোনো খেলোয়াড়ের ছবি বা লোগো রাখা উচিত নয়।
▪️লাজনাহ দায়িমাহ (সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি)-এর আলেমগণ কাফেরদের লোগোবাহী পোশাকের বিষয়ে বলেন:
«الملابس التي تحمل شعارات الكفار فيها تفصيل كما يلي:
١. إن كانت هذه الشعارات ترمز إلى ديانات الكفار كالصليب، ونحوه: ففي هذه الحالة لا يجوز استيراد هذه الملابس، ولا بيعها، ولا لبسها.
٢. إن كانت هذه الشعارات ترمز إلى تعظيم أحدٍ من الكفار، بوضع صورته، أو كتابة اسمه، ونحو ذلك: فهي أيضاً حرام، كما سبق.
٣. إذا كانت هذه الشعارات لا ترمز إلى عبادة، ولا تعظيم شخص، وإنما هي علامات تجارية مباحة، وهي ما يسمى بـ “الماركات”: فلا بأس بها»
“কাফিরদের লোগোযুক্ত পোশাকের বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
১. যদি এই লোগোগুলো কাফিরদের ধর্মের প্রতীক হয়—যেমন ক্রুশ বা তদ্রূপ কিছু—তাহলে এই পোশাক আমদানি করা, বিক্রি করা বা পরা কোনোটিই জায়েজ নেই।
২. যদি এই লোগোগুলো কোনো কাফিরকে সম্মান জানানোর প্রতীক হয়—যেমন তার ছবি রাখা বা তার নাম লেখা—তাহলে তা-ও হারাম।
৩. যদি লোগোটি কোনো ইবাদত বা ব্যক্তি-তাজিমের প্রতীক না হয়, বরং নিছক একটি বৈধ ট্রেডমার্ক বা ব্র্যান্ড হয়—তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। [ফাতাওয়া আল লাজনাহ আদ দায়িমাহ, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২৪-২৫]
▪️শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) খেলোয়াড়দের ছবিযুক্ত পণ্য সম্পর্কে বলেন:
«أرى أن هذه البضاعة التي عليها صور اللاعبين: تُهجر، وتقاطع؛ لأننا نسأل: ما فائدة الإسلام والمسلمين من بروز هذا اللاعب وظهوره على غيره؟ أعتقد أن كل إنسان سيكون جوابه بالنفي: لا فائدة من ذلك، فكيف نعلن عن أسماء هؤلاء، وننشر صورهم، وما أشبه ذلك؟! وكان الذي ينبغي أن يعدل عن هذا إلى مناصحة اللاعبين بالتزام الآداب الإسلامية: من ستر العورة، والمحافظة على الصلاة في الجماعة، وعدم التنافر فيما بينهم، وعدم التشاتم، وألا يستولي عليهم تعظيم الكافر إذا نجح في هذه اللعبة على غيره، هذا الذي ينفع. فأرى أن تهجر هذه البضاعة، وتقاطع»
“আমার মতে, খেলোয়াড়দের ছবিযুক্ত এই পণ্যগুলো বর্জন ও বয়কট করা উচিত। কারণ আমরা প্রশ্ন করতে পারি—এই খেলোয়াড়ের অন্যদের উপর বিজয়ী হওয়ায় ইসলাম ও মুসলিমদের কী উপকার হচ্ছে? সবার উত্তর হবে—কোনো উপকার নেই। তাহলে কেন আমরা তাদের নাম প্রচার করব এবং তাদের ছবি ছড়িয়ে দেব?! বরং উচিত হলো, খেলোয়াড়দের ইসলামি আদব মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া। তাই আমি মনে করি এই পণ্যগুলো বর্জন ও বয়কট করা উচিত।” [মাজমুউ ফাতাওয়া আশ শায়খ আল উসাইমিন, খণ্ড ১২, প্রশ্ন নং ২৫৮]
🔸চতুর্থত: খেলোয়াড়দের নাম বা ছবিযুক্ত জার্সি পরা হারাম হলেও কেউ ভুলবশত বা অজ্ঞতাবশত তা পরে নামাজ পড়লে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। তবে তা গুনাহের কাজ।
🔸পঞ্চমত:এই পোশাকের ব্যাপক প্রচলন এটিকে হালাল করে দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ ۚ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِّنْهُ ۖ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“যারা আল্লাহ ও আখিরাতের দিনের প্রতি ইমান রাখে, তাদের তুমি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে না—তারা সেই বিরোধিতাকারীদের বাবা, সন্তান, ভাই বা গোত্রের লোক হলেও না। এরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ ইমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদের নিজ পক্ষ থেকে রুহ দিয়ে সাহায্য করেছেন। তিনি তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয় তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এরাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম।” [সুরা মুজাদালাহ: ২২]
▪️শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন:
«قد يكون هذا ليس من موالاة الكفار ظاهراً، لكن من فعله: فإن في قلبه من تعظيم الكفار ما ينافي الإيمان، أو كمال الإيمان، والواجب علينا نحن المسلمين أن نقاطع مثل هذه الألبسة وألا نشتريها؛ وفيما أحل الله لنا من الألبسة شيء كثير؛ لأننا إذا أخذنا بهذه الألبسة: صار فيها عزٌّ للكفار، حيث أصبحنا نفتخر أن تكون صورهم، أو أسماؤهم، ملبوساً لنا، هم يفتخرون بهذا، ويرون أن هذا من إعزازهم وإكرامهم. ثانياً: هم يسلبون أموالنا بهذه الألبسة، مصانعهم حامية، وجيوبنا منفتحة لبذل الدراهم لهم، وهذا خطأ»
“এটা প্রকাশ্য মুওয়ালাত (বন্ধুত্ব) না-ও হতে পারে। কিন্তু যে এটা করে তার অন্তরে কাফিরদের প্রতি এমন তাজিম (বিশাল ভালোবাসা পূর্ণ সম্মান) রয়েছে যা ইমানের পরিপন্থী। এই ধরনের পোশাক ব্যবহার করলে কাফিরদের সম্মান বাড়ে—আমরা তাদের ছবি বা নাম বুকে ধারণ করে গর্ব করছি। আর এই পোশাকের মাধ্যমে তারা আমাদের সম্পদ লুট করছে। এটা নিতান্তই ভুল। [আল-লিকাউশ শাহরি, খণ্ড ২, প্রশ্ন নং ১১]
সারসংক্ষেপ: খেলোয়াড়দের ছবি, নাম, ক্লাবের নাম বা লোগোযুক্ত স্পোর্টস জার্সি কেনা ও বিক্রি করা কোনোভাবেই জায়েজ নেই। বিক্রেতাদের উচিত এই ধরনের ব্যবসা পরিহার করে হালাল বিকল্পের দিকে মনোনিবেশ করা। আল্লাহ তাআলা সবাইকে হালাল উপার্জনের তওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম। সবচেয়ে ভালো জানেন। [সূত্র: Islamqa info]
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
Share: