আশুরার ফজিলত ও আমল বিষয়ে প্রচলিত ৫টি জাল হাদিস ও মুহাদ্দিসগণের সতর্কবার্তা

আশুরার দিনটি মহিমান্বিত। কিন্তু এই দিনকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রচলিত আছে, যা রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। দ্বীনের সুরক্ষা ও ধর্মের নামে মিথ্যাচার থেকে বাঁচতে নিচের বর্ণনাগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। নিম্নে সর্বসাধারণকে সতর্ক করার স্বার্থে আশুরা সংক্রান্ত পাঁচটি জাল বা বানোয়াট হাদিস উপস্থাপন করা হলো:
🔸 জাল হাদিস-১:
من صام يوم عاشوراء، كتب الله له عبادة ستين سنة، بصيامها وقيامها، ومن صام يوم عاشوراء، أعطي ثواب عشرة آلاف ملك…”
“যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখবে আল্লাহ তার জন্য ৬০ বছরের রোজা ও কেয়াম বা রাতের নকল নামাজের সওয়াব লিখে দেবেন…! তাকে ১০ হাজার ফেরেশতার সওয়াব দেওয়া হবে..!”
– ইমাম ইবনুল জাওযি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল মাওযুআত কিতাবে একে নিশ্চিত বানোয়াট বলেছেন।
– ইমাম সুয়ুতি একে ‘মওজু’ বা বানোয়াট আখ্যায়িত করেছেন।
– ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযিয়্যাহ জানান, এর বর্ণনাকারী ‘হাবিব বিন আবি হাবিব’ হাদিস জাল করার জন্য পরিচিত।
🔸জাল হাদিস-২:
من أحيا ليلة عاشوراء؛ فكأنما عبد الله مثل عبادة أهل السماوات السبع… ومن صلى، ومن اغتسل، ومن اكتحل، ومن مر يده على رأس اليتيم…”
“যে আশুরার রাত জেগে ইবাদত করল সে যেন সাত আসমানের অধিবাসীদের মতো ইবাদত করল…”
সেই সাথে এতে আরও যোগ করা হয়েছে:
“যে (আশুরার রাতে) সালাত আদায় করবে, গোসল করবে, সুরমা লাগাবে, এতিমের মাথায় হাত বুলাবে…”
ইমাম ইবনুল জাওযি বলেন, কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ একে বানোয়াট হওয়া নিয়ে সন্দেহ করবে না। এটি অসম্ভব সব দাবির সংমিশ্রণ।
🔸 জাল হাদিস-৩:
من اكتحل بالإثمد يوم عاشوراء لم يرمد أبدا.”
“যে ব্যক্তি আশুরার দিন সুরমা লাগাবে তার চোখে কখনো ব্যথা হবে না। (বা চক্ষু রোগে আক্রান্ত হবে না)”
প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ ইবনুল জাওযি ও সুয়ুতি একে বানোয়াট হাদিসের তালিকায় স্থান দিয়েছেন। অর্থাৎ এটিও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোনো বাণী নয়।
🔸জাল হাদিস-৪:
رآني رسول الله صلى الله عليه وسلم وعلى يدي صرد فقال: هذا أول طير صام عاشوراء.”
“রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার হাতে একটি পাখি দেখে বললেন, এটিই প্রথম পাখি যে আশুরার দিন রোজা রেখেছিল।”
হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এই বর্ণনার সনদে অজ্ঞাত ও অবিশ্বস্ত ব্যক্তি রয়েছে।
সুতরাং এটি কোনোভাবেই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য নয়।
🔸জাল হাদিস: ৫
من وسع على أهله يوم عاشوراء وسع الله عليه سائر سنته.”
“যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবারের ওপর খরচ বা খাবার প্রশস্ত করবে আল্লাহ সারা বছর তার ওপর প্রশস্ততা দান করবেন।”
ইমাম উকাইলিসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ একে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলেছেন। কারণ এর বর্ণনাকারী অজ্ঞাত এবং এই বর্ণনাটি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
⚠️সতর্কবার্তা:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল।” [সহিহ বুখারি]।
সুতরাং জেনে-বুঝে মানুষকে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া এই সকল তথাকথিত হাদিস বর্ণনা করা হারাম ও কবিরা গুনাহ।
▪️আশুরার দিনের প্রকৃত ফজিলত কী?
এটি হলো, মুসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর অনুসারী বনী ইসরাইলদের মুক্তির দিন যারা অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে এই দিন রক্ষা পেয়েছিলেন। সে কারণে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা হিসেবে তাঁরা এই দিনটি রোজা রাখতেন।
তারাই ধারাবাহিকতায় রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম) এবং সাহাবিগণ এই দিন রোজা রাখতেন।
এর বিশেষ মর্যাদার ব্যাপারে হাদিসে এসেছে যে, এটি বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«… وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يكفر السنة التي قبله»
“আর আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে, আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, তা তার পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (গুনাহ মোচনকারী) হবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬২]
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার এবং ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রচার থেকে বিরত থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: