ই-সিগারেট বা ইলেকট্রনিক সিগারেট প্রথম ২০০৪ সালে চীনে উদ্ভাবিত হয়। এর গঠন ও স্পর্শ সাধারণ সিগারেটের মতোই। এতে একটি রিচার্জেবল লিথিয়াম ব্যাটারি থাকে, যা বিদ্যুৎ, কম্পিউটার বা গাড়ির চার্জারের মাধ্যমে চার্জ করা যায়। ব্যাটারির পাশাপাশি এতে একটি ক্যাপসুল থাকে, যার ভেতরে নিকোটিন, পানি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ও সুগন্ধি মেশানো থাকে। এর কার্যপদ্ধতি হলো, ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে নিকোটিনযুক্ত তরলকে বাষ্পে রূপান্তর করে, যা ব্যবহারকারী শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণ করেন এবং মুখ বা নাক দিয়ে ধোঁয়া হিসেবে নির্গত করেন। সিগারেটের ডগায় থাকা ছোট একটি আলো আসল সিগারেটের জ্বলন্ত অঙ্গারের আবহ তৈরি করে, যা ব্যবহারকারীকে প্রকৃত ধূমপানের অনুভূতি দেয়।
সহজ কথায় বলতে গেলে, ভ্যাপ এবং ই-সিগারেট মূলত একই জিনিসের দুটি ভিন্ন নাম। ই-সিগারেট হলো এই প্রযুক্তির দাপ্তরিক বা প্রযুক্তিগত নাম, আর ভ্যাপিং ডিভাইস হিসেবে এটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। এর বিভিন্ন আকৃতি থাকলেও মূল গঠন ও কাজ করার পদ্ধতি একই। এগুলো মূলত ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, যা বাষ্প তৈরির মাধ্যমে শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করায়।[Islamqa info]
বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের প্রচলন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেক সময় ভুল তথ্যের প্রচার চালানো হয় যে, এটি সাধারণ সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর বা ধূমপান ছাড়ার সহায়ক। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং আইন — উভয় ক্ষেত্রেই এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক হিসেবে প্রমাণিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট কেবল আসক্তিই বাড়ায় না বরং এটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। এই পণ্যগুলো বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানে তৈরি, যা ফুসফুস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। এর ব্যবহারের ফলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং ফুসফুসের কোষের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া ই-সিগারেটের ব্যাটারি বিস্ফোরণে ব্যবহারকারীর মৃত্যুঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যারা তরুণ বয়সে ভ্যাপিং শুরু করেন, পরবর্তীতে তাদের সাধারণ সিগারেটে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ই-সিগারেটের নানা রঙ ও স্বাদের বিপণন কৌশল নারী ও শিশুদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশ্বের অনেক দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এই সিগারেটের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর স্বাস্থ্যমন্ত্রীরাও এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনেক দেশ সাধারণ সিগারেটকে বৈধ রাখলেও ই-সিগারেটকে নিষিদ্ধ করেছে, যদিও সাধারণ সিগারেট প্রতি বছর বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ।
[সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো অনলাইন ভার্শন]
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে ই-সিগারেট, ইএনডিএস (ENDS), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসহ সব ধরনের বিকাশমান তামাকপণ্যকে নিষিদ্ধ করেছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এসব পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিক্রি ও ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সব ধরনের পাবলিক প্লেসে এসব দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। [ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’] [সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইন ভার্শন]
ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“আর তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫]
যেহেতু ই-সিগারেট শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি আসক্তি সৃষ্টি করে, তাই ইসলামের আলোকে এটি অবশ্যই বর্জনীয়। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০]
ইসলামি আলেমগণের মতে, যে বস্তুর মাধ্যমে শরীরের ক্ষতি হয় এবং যা নেশা উদ্রেককারী, তার ব্যবহার হারাম। আলেমগণ এ বিষয়ে বলেন:
إِنَّ كُلَّ مَا يَضُرُّ بِالْبَدَنِ ضَرَرًا مُحَقَّقًا أَوْ غَالِبًا فَإِنَّهُ يَحْرُمُ تَعَاطِيهِ، وَالسِّيجَارَةُ الإِلِكْتِرُونِيَّةُ قَدْ ثَبَتَ طِبِّيًّا أَنَّهَا تَحْتَوِي عَلَى مَوَادَّ ضَارَّةٍ وَمُسَرطِنَةٍ، فَبِنَاءً عَلَيْهِ لَا يَجُوزُ شُرْبُهَا.
অর্থ: “শরীরের জন্য নিশ্চিত বা প্রবলভাবে ক্ষতিকর যেকোনো বস্তুর ব্যবহার হারাম। যেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত হয়েছে যে ই-সিগারেটে ক্ষতিকর ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে, তাই এটি ব্যবহার করা জায়েজ নয়।”
পরিশেষে, ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং কোনো নিরাপদ বিকল্প নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ফাঁদ। শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা এবং দেশের আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এই মরণ নেশা থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সব ধরনের হারাম ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।