প্রশ্ন: ইসলামে কি সাময়িক বিয়ে বা মুতা বিয়ের অস্তিত্ব আছে?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। অতঃপর “মুতা” বা “সাময়িক বিয়ে” হলো— কোনো পুরুষ কর্তৃক নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে কোনো নারীকে বিয়ে করা। ইসলামে বিয়ের মূল ভিত্তি হলো স্থায়িত্ব এবং নিরবচ্ছিন্নতা। সাময়িক বিয়ে বা মুতা বিয়ে ইসলামের শুরুর দিকে বৈধ ছিল। পরবর্তীতে সেই বৈধতা মানসুখ (রহিত) করা হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
◆ আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ نِكَاحِ الْمُتْعَةِ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ زَمَنَ خَيْبَرَ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারের যুদ্ধের সময় মুতা বিয়ে এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন।” [সহিহ বুখারি: ৩৯৭৯, সহিহ মুসলিম: ১৪০৭]
◆ রুবাই ইবনে সাবরা আল জুহানি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ كُنْتُ أَذِنْتُ لَكُمْ فِي الِاسْتِمْتَاعِ مِنَ النِّسَاءِ وَإِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ ذَلِكَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ مِنْهُنَّ شَيْءٌ فَلْيُخَلِّ سَبِيلَهُ وَلَا تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের নারীদের সাথে মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমাদের কাছে যদি এমন কোনো নারী থাকে তবে তাকে ছেড়ে দাও এবং তোমরা তাদের যা প্রদান করেছ তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।” [সহিহ মুসলিম: ১৪০৬]
আল্লাহ তাআলা বিয়েকে তাঁর এমন এক নিদর্শন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন যা চিন্তা ও গবেষণার দাবি রাখে। তিনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন এবং স্ত্রীকে স্বামীর জন্য প্রশান্তির আবাস বানিয়েছেন। আল্লাহ সন্তান লাভের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং নারীর জন্য ইদ্দত ও উত্তরাধিকার (মিরাস) নির্ধারণ করেছেন। অথচ এই নিষিদ্ধ মুতা বিয়ের ক্ষেত্রে এর কোনো কিছুই বিদ্যমান নেই। রাফেজি বা শিয়া সম্প্রদায় যারা মুতা বিয়েক বৈধ মনে করে। তাদের নিকট মুতা করা নারী স্ত্রী হিসেবেও গণ্য নয়-আবার দাসী হিসেবেও নয়। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ . إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ
“এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে হেফজত করে। তবে তাদের স্ত্রী অথবা মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্রে তারা তিরস্কৃত হবে না।” [সূরা মুমিনুন: ৫-৭]
❒ শিয়া-রাফেজিদের খণ্ডণ:
রাফেজিরা মুতা বৈধ করার পক্ষে কিছু দলিল উপস্থাপন করে যা প্রকৃতপক্ষে দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন:
✪ ১. আল্লাহ তাআলার বাণী:
فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً
“তাদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা সহবাস (ইস্তিমতা) করেছ, তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর প্রদান করো।” [সূরা নিসা: ২৪]
তারা দাবি করে যে, এখানে ‘ইস্তিমতা’ (উপভোগ) শব্দটির অর্থ মুতা বিয়ে এবং ‘উজরত’ (পারিশ্রমিক) শব্দটি মুতা বিয়ের অর্থের প্রতি ইঙ্গিত দেয়।
➧ এর জবাব হলো—আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের আগে যাদের সাথে বিয়ে হারাম তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর এই আয়াতে যাদের সাথে বিয়ে বৈধ তাদের কথা বলেছেন এবং বিবাহিত স্ত্রীকে মোহর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। বিয়ের মাধ্যমে যে আনন্দ ও উপভোগ অর্জিত হয় এখানে তা বোঝাতেই ‘ইস্তিমতা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
الْمَرْأَةُ كَالضِّلَعِ إِنْ أَقَمْتَهَا كَسَرْتَهَا ، وَإِنِ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَفِيهَا عِوَجٌ
“নারী পাঁজরের হাড়ের মতো। তাকে সোজা করতে গেলে ভেঙে ফেলবে। আর যদি তাকে নিয়ে উপভোগ করতে চাও (ইস্তিমতা) তবে তার বক্রতা নিয়েই তা করতে হবে।” [সহিহ বুখারি: ৪৮৮৯, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮]
এখানে ‘অজর’ বা পারিশ্রমিক বলতে ‘মোহর’ বোঝানো হয়েছে; মুতা বিয়ের বিনিময় নয়। কুরআনের অন্যত্রও মোহরকে ‘অজর’ বলা হয়েছে। যেমন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّاتِي آتَيْتَ أُجُورَهُنَّ
“হে নবী! আমি আপনার জন্য আপনার সেই স্ত্রীদের বৈধ করেছি, যাদের মোহর (অজর) আপনি প্রদান করেছেন।” [সূরা আহযাব: ৫০]
সুতরাং বোঝা গেল, এই আয়াতে মুতা বিয়েরর পক্ষে কোনো দলিল নেই। আর তর্কের খাতিরে যদি আয়াতে মুতার ইঙ্গিত আছে বলে ধরেও নেওয়া হয় তবুও তা সহিহ সুন্নাহর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত হারাম হওয়ার কারণে মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।
✪ ২. কিছু সাহাবি বিশেষ করে ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে এর বৈধতার বর্ণনা পাওয়া যায়।
➧ এর জবাব হলো—এটি রাফেজিদের প্রবৃত্তি পূজার একটি অংশ। তারা একদিকে সাহাবিদের কাফের বলে গালি দেয়। আবার নিজেদের স্বার্থে এখানে তাঁদেরই কর্ম থেকে দলিল গ্রহণ করে!
বাস্তবতা হলো, যাদের থেকে মুতা বৈধ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তাদের নিকট মূলত মুতা হারাম হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়নি। এ কারণেই আলি ইবনে আবি তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো সাহাবিগণ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ মতের কঠোর প্রতিবাদ করেছিলেন। আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন শুনলেন যে, ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুতা বিয়ের ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করছেন তখন তিনি বললেন:
مَهْلًا يَا ابْنَ عَبَّاسٍ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْهَا يَوْمَ خَيْبَرُ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْإِنْسِيَّةِ
“থামুন হে ইবনে আব্বাস! নিশ্চয়ই রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারের দিন এটি এবং গৃহপালিত গাধার গোশত নিষিদ্ধ করেছেন।” [সহিহ মুসলিম: ১৪০৭]
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। [উৎস: islamqa info]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।