প্রশ্ন: আমি পড়েছি যে, মুয়াবিয়া আহলে বাইতকে হত্যার কারণ ছিলেন। তাই তাঁর প্রতি আমার মনে ঘৃণা কাজ করে। আহলে বাইতকে বাদ দিয়ে তিনি নিজে কীভাবে রাজা হওয়াকে বৈধ মনে করলেন? আমার কাছে তাঁর ভালো কাজ থাকল কি না-তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস সেই মহিলার ব্যাপারে স্পষ্ট—যে অনেক ভালো কাজ করত কিন্তু তার উদ্দেশ্য বা অন্তর ভালো ছিল না। তাই নবিজি বলেছিলেন: “সে জাহান্নামি।” আমার মনে হয় একই কথা মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমি আরও মনে করি, যারা তাঁদের অভিশাপ (লানত) দেয় তারা সঠিক। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁদের অভিশাপ দেই না। কারণ এটি নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ ছিল না। তো আসলে মুয়াবিয়া, ইয়াজিদ এবং আহলে বাইতের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল তা কি আমাকে জানানো সম্ভব?
উত্তর:
الحَمْدُ لِلَّهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَبَعْدُ:
হে প্রশ্নকারী, আপনার কথার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ভুল করেছেন। যা প্রতীয়মান হয়, আপনি আহলে সুন্নাতের কিতাব পড়া বা তাদের থেকে শোনার তাওফিক পাননি। বরং যা পড়েছেন বা শুনেছেন তা সম্ভবত শিয়া-রাফিজি ও তাদের অনুসারীদের নিকট থেকে হয়েছে। তাই আপনার কাছ থেকে এসব ভুল তথ্য এসেছে। আমরা আপনার সামনে কয়েকটি জ্ঞান ভিত্তিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করব। এগুলো মনোযোগ সহকারে পড়লে আশা করি, উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই ওয়েবসাইটের প্রতি সুধারণা পোষণ ও আস্থা রাখার জন্য আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
❑ ১. আপনি ‘মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান’ ও তার ছেলে ‘ইয়াজিদ’-কে একই বিচারে ফেলেছেন, যা একটি বড় অন্যায় ও জুলুম। কেননা মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একজন মর্যাদাবান সাহাবি, যার জন্য আহলে সুন্নাত ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন) এই দুআ করে থাকে। তার মাধ্যমে আহলে বাইতের কারও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি বা তাদের বিরুদ্ধে কোনও যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তার ছেলে ইয়াজিদ সাহাবি নয়। তার খিলাফতকালেই হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। আহলে সুন্নাতের কেউ কেউ তাকে লানত (অভিসম্পাত) করেন। কিন্তু তার ব্যাপারে মধ্যপন্থি মত হলো, আমরা তাকে ভালোবাসি না এবং অভিশাপও করি না।
❑ ২. মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একজন মর্যাদাবান সাহাবি, মহামান্য রাজা, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নাজিলকৃত ওহি (কুরআন) লেখকদের অন্যতম, ইসলামের গভীর জ্ঞান সম্পন্ন ফকিহ সাহাবি—যার সাক্ষ্য দিয়েছেন ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)। এবং আহলে সুন্নাতের বড় আলেমরা তার মর্যাদা ও ন্যায়পরায়ণতা স্বীকার করেছেন। যেমন━
✪ ক. আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. বেশি উত্তম নাকি উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহ.?
তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! মুআবিয়ার নাকে যে ধুলো রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে প্রবেশ করেছিল তা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ-এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি উত্তম। মুআবিয়া রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পেছনে নামাজ পড়েছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (আল্লাহ শুনেন তার কথা যে তার প্রশংসা করে); তখন মুআবিয়া বললেন: رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ (হে আমাদের রব, সব প্রশংসা তোমারই)। এর পর আর কী বলা যায়! [‘ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান’, ইবনে খাল্লিকান, ৩/৩৩]
✪ খ. জাররাহ আল মাওসিলি বলেন: আমি এক ব্যক্তিকে মু‘আফা ইবনে ইমরানকে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম: হে আবু মাসউদ! উমর ইবনে আব্দুল আজিজ মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের তুলনায় কেমন?
তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে বললেন: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোনো সাহাবির সাথে অন্য কাউকে তুলনা করা যায় না। মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার লেখক, সাহাবি, জামাতা এবং তার ওহির আমিন (বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য)।” [‘আশ শারি‘আহ’ লিল আজুররি, ৫/২৪৬৬-২৪৬৭]
✪ গ. আ‘মাশ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ ও তার ন্যায়বিচার উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন: যদি তোমরা মুআবিয়াকে পেতে! তারা বলল: হে আবু মুহাম্মাদ, তার সহনশীলতা বোঝাচ্ছেন? তিনি বললেন: না, আল্লাহর কসম বরং তার ন্যায়বিচার।” (অর্থাৎ মুআবিয়া (রা.)-এর ন্যায়বিচার অত্যন্ত উচ্চমাত্রার ছিল — যা সাধারণভাবে লোকেরা কল্পনাও করতে পারে না। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ ন্যায়পরায়ণ খলিফা ছিলেন। কিন্তু ইমাম আ‘মাশ বলছেন, মুআবিয়ার ন্যায়বিচার ছিল আরও ব্যাপক ও গভীর।) [‘আস সুন্নাহ’ লিল খাল্লাল, ১/৪৩৭]
✪ ঘ. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
“কেননা মুআবিয়া সম্পর্কে তাওয়াতুর তথা অসংখ্য বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত নিশ্চিত সনদের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন যেমন অন্যদের নিযুক্ত করেছিলেন, তিনি তার সঙ্গে জিহাদ করেছেন, তিনি তার কাছে ওহি লেখার জন্য আমিন (বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য) ছিলেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহি লেখাতে কখনো তার প্রতি সন্দেহ করেননি। আর উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)—যিনি লোকজনের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী—তাকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ সত্যকে উমরের জবান ও অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি তার শাসনকালে কখনো তার প্রতি সন্দেহ করেননি।” [‘মাজমু‘ ফাতাওয়া’, ৪/৪৭২]
❑ ৩. মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা শরয়ি বিধান নয়। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলি বিন আবি তালিব ও মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)মা)-এর মধ্যে ঘটে যাওয়া ফিতনা বা যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন এবং উভয় পক্ষকেই মুমিন ও সত্যপন্থী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যদিও আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীরা সত্যের অধিক নিকটবর্তী ছিলেন বলে সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর বাতিলের সিল মারা হয়নি। বরং বরং তারা নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সত্যের অনুসন্ধানে ছিলেন — অর্থাৎ তারা উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছিলেন।
◆ ক. আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَقْتَتِلَ فِئَتَانِ دَعْوَاهُمَا وَاحِدَةٌ
“কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতক্ষণ না দুটি দল যুদ্ধ করে যাদের দাবি এক।” [বুখারি ৩৪১৩, মুসলিম ১৫৭]
◆ খ. আবু সাঈদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
تَمْرُقُ مَارِقَةٌ عِنْدَ فُرْقَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَقْتُلُهَا أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بِالْحَقِّ
“মুসলিমদের মধ্যে একটি বিভক্তির সময় একটি দল বেরিয়ে যাবে (বিদ্রোহ করবে); যে দলটি তাদের হত্যা করবে সে দলটিই হকের অধিক নিকটবর্তী হবে।” [মুসলিম ১০৬৪]
➧ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: এই সহিহ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধরত উভয় পক্ষ—আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীগণ এবং মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীগণ—সত্যের ওপর ছিলেন। তবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীদের চেয়ে সত্যের অধিক নিকটবর্তী ছিলেন। কারণ আলি বিন আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ই সেই ‘মারিকিন’ বা দলছুটদের (হারুরিয়া খারিজি) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, যারা একসময় আলির দলেই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আলির পক্ষ ত্যাগ করে তাঁকে ও তাঁর সমর্থকদের কাফির সাব্যস্ত করে এবং তাঁর সঙ্গে চরম শত্রুতা ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়।” [মাজমুউল ফাতাওয়া” [৪/৪৬৭]
➧ ইবনে কাসির (রাহ.) বলেছেন: “এই হাদিসটি নবুওয়াতের অন্যতম এক নিদর্শন। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিষয়টি ঠিক সেভাবেই ঘটেছে। এতে সিরিয়াবাসী ও ইরাকবাসী—উভয় পক্ষকেই মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাফেজি (চরমপন্থী শিয়া) ও মূর্খ লোকেরা সিরিয়াবাসীদের কাফির বলে যে দাবি করে, এটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই হাদিস থেকে আরও বোঝা যায় যে, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গীগণ সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাও এটিই—আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ই সঠিক সিদ্ধান্তে ছিলেন। যদিও মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ও ইজতিহাদ (তথা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) করেছিলেন এবং ইনশাআল্লাহ তিনি এ জন্য সওয়াব পাবেন। তবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন বৈধ ইমাম তাই তিনি দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। যেমনটি সহিহ বুখারিতে আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا اجْتَهَدَ الْحَاكِمُ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا اجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ
“যখন কোনো বিচারক ইজতিহাদ করেন এবং তার সিদ্ধান্ত সঠিক হয় তবে তিনি দুটি সওয়াব পাবেন। আর যদি তিনি ইজতিহাদ করে ভুল করেন তবে তিনি একটি সওয়াব পাবেন।” (সহিহ বুখারি)।”
[আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৭/৩১০]
❑ ৪. মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুদ্ধ খিলাফত বা রাজত্বের জন্য ছিল না; বরং তা ছিল উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হত্যাকারীদের বিচার ও কিসাস (হত্যা প্রতিশোধ) নিশ্চিত করার দাবিতে। অন্যদিকে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অবস্থান ছিল—খিলাফত ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সুসংহত হওয়ার আগে এই বিচার সম্ভব নয়।
➧ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন:
“মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আলির সাথে যুদ্ধ করার সময় খিলাফতের দাবি করেননি এবং তাঁর জন্য খিলাফতের বায়আতও নেওয়া হয়নি। তিনি নিজেকে খলিফা হিসেবে বা খিলাফতের যোগ্য মনে করে লড়াই করেননি—মুয়াবিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা এটি স্বীকার করতেন এবং কেউ তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি নিজেও তা মেনে নিতেন। মুয়াবিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা আলি ও তাঁর বাহিনীর ওপর প্রথমে আক্রমণ করাকে উচিত মনে করেননি এবং তাঁরা তা করেনওনি। বরং যখন আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সঙ্গীরা দেখলেন যে, যেহেতু মুসলিমদের খলিফা একজনই হবেন তাই মুয়াবিয়াদের ওপর তাঁর আনুগত্য ও বায়আত করা ওয়াজিব। আর তাঁরা এই ওয়াজিব পালন না করে আনুগত্যের বাইরে অবস্থান করছেন—তখন তিনি (আলি) তাদের সাথে লড়াই করা সমীচীন মনে করলেন যাতে আনুগত্য ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে তাঁরা (মুয়াবিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা) বলছিলেন যে, এই বায়আত তাঁদের ওপর ওয়াজিব নয়। আর যদি এই কারণে তাঁদের সাথে যুদ্ধ করা হয় তবে তাঁরা মজলুম বা অন্যায়ের শিকার হবেন। তাঁদের যুক্তি ছিল: উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মজলুম হিসেবে শহিদ হয়েছেন—এ বিষয়ে মুসলিমরা একমত। আর তাঁর হত্যাকারীরা আলি (রা.)এর বাহিনীতে রয়েছে এবং তাঁরা প্রভাবশালী। আমরা যদি বায়আত করতে অস্বীকার করি তবে তারা আমাদের ওপর জুলুম করবে। আর আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)তাদের ঠেকাতে পারবেন না,-যেমনটি তিনি উসমানকেও রক্ষা করতে পারেননি। আমাদের ওপর কেবল এমন খলিফাকে বায়আত করা আবশ্যক, যিনি আমাদের ইনসাফ দিতে পারবেন এবং আমাদের ওপর ইনসাফ কায়েমে সক্ষম…।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া-৩৫/৭২, ৭৩] সুতরাং মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আহলে বাইতের প্রতি কোনো শত্রুতা পোষণ করতেন না এবং তাঁদের প্রতি তাঁর মনে কোনো বিদ্বেষও ছিল না। বরং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের মতোই তিনি আহলে বাইতকে শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দান করতেন।
➧ ইবনে কাসির রাহ. ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ [৮/১৩৩] গ্রন্থে মুগিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন: যখন মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাতের খবর পৌঁছাল তখন তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি তাঁর জন্য কাঁদছেন অথচ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন?” তখন তিনি বললেন, “তোমার ধ্বংস হোক! তুমি জানো না মানুষ আজ কতটা শ্রেষ্ঠত্ব, ফিকহ এবং ইলম হারাল।”
❑ ৫. সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যের (ইজমা) মাধ্যমেই মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বর্তমান থাকা সত্ত্বেও কেউ তাঁর শাসনের বিরোধিতা করেননি।
➧ ইমাম ইবনে হাজম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: “প্রথমে হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে বায়আত হয়। এরপর তিনি মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তাঁদের দুজনের চেয়েও উত্তম ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা বেঁচে ছিলেন—যারা মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ ও জিহাদ করেছিলেন। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলেই মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর ইমামত বা নেতৃত্ব মেনে নেন। এটি একটি নিশ্চিত ইজমা (সাহাবিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত)। এটি এ বিষয়েরও প্রমাণ যে, কোনো শ্রেষ্ঠতর ব্যক্তি থাকা অবস্থায় তাঁর চেয়ে কম মর্যাদার কাউকে নেতা বানানো বৈধ। পরবর্তীতে এমন কিছু মানুষের উদ্ভব হয়েছে যাদের আল্লাহর কাছে কোনো ওজন নেই; তারা নিজেদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দিয়ে কোনো দলিল ছাড়াই এই ইজমা লঙ্ঘন করেছে। আমরা আল্লাহর কাছে লাঞ্ছনা থেকে আশ্রয় চাই।” [আল ফিসাল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল ৪/১২৭]
❑ ৬. আপনি বলেছেন, “তিনি কীভাবে নিজেকে ‘আহলে বাইতকে বাদ দিয়ে রাজা হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন?”—এর উত্তরে আগেই বলেছি যে, শাসনকর্তা হওয়ার জন্য লোকেদের মধ্যে সর্বোত্তম হওয়া শর্ত নয়; বরং কম উত্তম ব্যক্তি উত্তম ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও শাসন করতে পারেন। আর উপরন্তু, আহলে বাইতই সর্বোত্তম মানুষ নন। তাছাড়া মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপার ছিল ভিন্ন। স্বয়ং হাসান ইবনে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)—যিনি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত—মুআবিয়ার পক্ষে খিলাফত ছেড়ে দেন এবং সকল সাহাবি—আহলে বাইতসহ—তাঁর বাইয়াত করেন। এতে করে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়, যাতে তিনি হাসানের প্রশংসা করে বলেন যে, আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলমানদের দুটি দলের মধ্যে সন্ধি করাবেন। আবু বাকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন হাসানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বের করে মিম্বারের ওপর উঠালেন এবং বললেন:
ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“আমার এই পুত্র সর্দার। আশা করা যায়, আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলমানদের দুটি দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেবেন।” [বুখারি ৩৪৩০ ও ২৫৫৭]
হাফিজ ইবনে হাজার (রাহ.) বলেছেন: এই ঘটনার উপকারিতার মধ্যে রয়েছে, নবুওয়াতের নিদর্শন এবং হাসান ইবনে আলি রা.-এর মর্যাদা। কারণ তিনি রাজত্ব ত্যাগ করেছিলেন দুর্বলতা, লাঞ্ছনা বা কোনো ত্রুটির কারণে নয় বরং আল্লাহর কাছে যা আছে তার প্রতি আগ্রহ ও মুসলমানদের রক্ত রক্ষার জন্য—যাতে তিনি দ্বীনের বিষয় ও উম্মতের কল্যাণ লক্ষ্য রাখেন। এতে খারিজিদের প্রতিও উত্তর রয়েছে, যারা আলি ও তাঁর সঙ্গী এবং মুআবিয়া ও তাঁর সঙ্গীদের তাকফির করত (কাফের বলত)। অথচ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, উভয় দলই মুসলিম। … আর এতে প্রমাণিত হয় যে, উত্তম ব্যক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কম উত্তম ব্যক্তির খিলাফত বৈধ। কারণ হাসান ও মুআবিয়া উভয়েই খিলাফত লাভ করলেন অথচ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. ও সাঈদ ইবনে যায়িদ রা. (যিনি ছিলেন একজন বদরি সাহাবি) জীবিত ছিলেন।” [‘ফাতহুল বারী’, ১৩/৬৬-৬৭]
সুতরাং হে প্রশ্নকারী ভাই! মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে আপনার বিচার পুনর্বিবেচনা করুন। আপনি তাঁর সম্পর্কে যা বলেছেন, তা চরম জুলুম। মুআবিয়ার মর্যাদা ও ফজিলতের কিছু অংশ আমরা এখানে উল্লেখ করেছি এবং উম্মাতের আলেমদের থেকে তা উদ্ধৃত করেছি। আহলে সুন্নাতের কেউ কখনো মুআবিয়া রা. সম্পর্কে আপনার উক্তির সাথে একমত হবে না। সুতরাং এখন আপনার উক্তি থেকে তওবা করা এবং এই মর্যাদাবান সাহাবিকে তার যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি মুসলিম রাজাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাঁর হাতে ও তাঁর সময়ে অনেক দেশ বিজিত হয়েছে এবং এ কারণে আল্লাহর দ্বীনে বহু লোক দলে দলে প্রবেশ করেছে।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আপনাকে হক ও সঠিক পথের দিশা দান করুন এবং আপনাকে হিদায়াতকারী ও হিদায়াতপ্রাপ্ত বানান।
❖ আমরা আপনাকে নিম্নের বইগুলো পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি:
১. شبهات وأباطيل حول معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنهما
( শুবহাতুন ওয়া আবাতিলু হাওলা মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)মা।)
“মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে বিভিন্ন সংশয় ও অসার ধারণার খণ্ডন।”
২. سل السِّنان في الذب عن معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنه
( সাল্লুস সিনানি ফিদ দিফা-ই আন মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান [রাদিয়াল্লাহু আনহু])
“মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতিরক্ষায় উন্মুক্ত তলোয়ার।”
৩. من فضائل وأخبار معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنه
( মিন ফাদায়িলি ওয়া আখবারি মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান [রাদিয়াল্লাহু আনহু])
“মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মর্যাদা ও ঘটনাবলি।”
৪. الأحاديث النبوية في فضائل معاوية بن أبي سفيان
(আল আহাদিসুন নাবাউয়িয়্যাহ ফি ফাদায়িলি মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান।)
“মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের মর্যাদায় বর্ণিত নবিজি )সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম(-এর হাদিসসমূহ।”
এছাড়াও পড়ুন:
৫. “أمير المؤمنين معاوية بن أبي سفيان” – محمد مال الله
(আমিরুল মুমিনিন মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান)—মুহাম্মাদ মাল আল্লাহ।
“মুমিনদের নেতা মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা.।”
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই যা মুহাম্মাদ মাল আল্লাহ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া-এর আলোচনা থেকে সংগ্রহ, বিন্যাস ও টীকাযুক্ত করেছেন।
৬. “العواصم من القواصم” – ابن العربي المالكي
(আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম)—ইবনুল আরাবি আল মালিকি।
“পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী বিপর্যয় থেকে রক্ষাকারী ঢাল।” (ইসলামের ইতিহাসের কঠিন ফিতনাগুলো থেকে বাঁচার সুরক্ষাকবচ)।
৭. “منهاج السنة النبوية” – شيخ الإسلام ابن تيمية
(মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাউয়িয়্যাহ)—শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ।
নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম-েএর সুন্নাহর সুস্পষ্ট পথ। এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা ও সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা রক্ষায় একটি কালজয়ী বিশাল গ্রন্থ।
[islamqa info প্রশ্ন নং ১৪০৯৮৪]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।