হালাল-হারাম পণ্যের মিশ্রণে ব্যবসা

প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি দোকানে মুদি মালামাল ও ফলের পাশাপাশি মদ বা এ জাতীয় পানীয়ও বিক্রি করলে তার আয় কি হালাল হবে, নাকি হারাম?
উত্তর: হালাল পণ্য বিক্রির আয় হালাল থাকবে, আর মদ, বিড়ি-সিগারেট বা অশ্লীল ম্যাগাজিনের মতো হারাম পণ্য বিক্রির আয় হারাম হবে। তবে হারাম পণ্যের ব্যবসা নিজেই বড় গুনাহ। একই দোকানে হালাল পণ্য থাকলেও এই গুনাহ থেকে মুক্তি মেলে না।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে সফল হতে পারো।” [সূরা মায়িদা: ৯০]
✪ জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর তিনি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন:
إِنَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالْمَيْتَةِ وَالْخِنْزِيرِ وَالْأَصْنَامِ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তি বিক্রি হারাম করেছেন।” [সহিহ বুখারি: ২২৩৬; সহিহ মুসলিম: ১৫৮১]
✪ হারাম পণ্য বিক্রি মানুষকে হারাম কাজে সহায়তার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
✪ হালাল-হারামের ব্যাপারে সতর্ক করে নুমান ইবনে বাশির (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ، وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الْمُشَبَّهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ، كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيهِ، أَلَا وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى، أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ
“হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট। এ দুয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্দেহজনক বিষয়, যা অনেক মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকল, সে তার দ্বীন ও সম্মান নিরাপদ রাখল। আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ল, সে হারামে পতিত হলো; যেমন কোনো রাখাল সংরক্ষিত চারণভূমির আশপাশে পশু চরায়, আশঙ্কা থাকে সে তাতে ঢুকে পড়বে। সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহর একটি সংরক্ষিত এলাকা থাকে। আর আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর হারামকৃত বিষয়সমূহ।” [সহিহ বুখারি: ৫২; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯]
❑ বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া:
✪ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতওয়া কমিটি (আল-লাজনা আদ-দায়িমা)-এর আলেমগণ বলেন:
لَا يَجُوزُ الْمُتَاجَرَةُ فِيمَا حَرَّمَ اللَّهُ مِنَ الْأَطْعِمَةِ وَغَيْرِهَا، كَالْخُمُورِ وَالْخِنْزِيرِ وَلَوْ مَعَ الْكَفَرَةِ؛ لِمَا ثَبَتَ عَنْهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ»؛ وَلِأَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «لَعَنَ الْخَمْرَ وَشَارِبَهَا وَبَائِعَهَا وَمُشْتَرِيَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ وَآكِلَ ثَمَنِهَا وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا»
“আল্লাহ যেসব খাদ্য ও অন্যান্য বস্তু হারাম করেছেন, যেমন মদ ও শূকর, তার ব্যবসা করা জায়েজ নয়, এমনকি কাফিরদের সঙ্গে হলেও। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো কিছু হারাম করেন, তার মূল্যও হারাম করেন।’ আর তিনি মদ, মদপানকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, বহনকারী, যার কাছে বহন করা হয়, মদের মূল্য ভক্ষণকারী, নিংড়ানো ব্যক্তি ও যার জন্য নিংড়ানো হয়, সবাইকে লানত করেছেন।” [ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, ১৩/৪৯]
✪ মিসরের দারুল ইফতা বলেছে:
وَكَمَا تَحْرُمُ التِّجَارَةُ فِي هَذِهِ الْخَبَائِثِ فَإِنَّ الرِّبْحَ النَّاتِجَ عَنْهَا مَالٌ حَرَامٌ خَبِيثٌ
“এসব নিকৃষ্ট বস্তুর ব্যবসা যেমন হারাম, তেমনি এর লভ্যাংশও হারাম ও নিকৃষ্ট সম্পদ।” [দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যা, ফতওয়া নং ২৮৮৮, শাইখ ড. শাওকি ইবরাহিম আল্লাম]
একজন মুমিনের উচিত ব্যবসা বা চাকরি, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলা। হারামের সঙ্গে হালাল মিশিয়ে ফেললে আখিরাত ধ্বংসের জন্য তা-ই যথেষ্ট। হারাম পণ্য বিক্রি বন্ধ করে তওবা করা এবং হারাম আয় থেকে মুক্ত হওয়াই এর সমাধান।
✪ আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ):
মুদি দোকানে সিগারেট বিক্রি করা হলে কি দোকানের সম্পূর্ণ উপার্জন হারাম? এ ধরনের দোকান বয়কট করার বিধান
প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি তার মুদি দোকানে সিগারেট বিক্রি করলে কি তার সব উপার্জনই হারাম হয়ে যায়, নাকি উপার্জন মিশ্রিত থাকে?
উত্তর:
يَحْرُمُ بَيْعُ الدُّخَانِ، أَمَّا مَا عَدَاهُ مِنَ الطَّيِّبَاتِ فَلَا مَانِعَ
“সিগারেট বিক্রি করা হারাম। তবে এর বাইরে দোকানে থাকা অন্য হালাল পণ্যগুলো বিক্রিতে কোনো বাধা নেই।”
উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন! যে মুদি দোকানে সিগারেট বিক্রি হয়, সেই দোকান বর্জন করা এবং অন্যদেরকেও তা বর্জন করার আহ্বান জানানো কি জায়েজ?
শাইখ:
يَجِبُ مُنَاصَحَتُهُ، فَيُقَالُ لَهُ: هَذَا خَبِيثٌ وَحَرَامٌ، ثَمَنُهُ حَرَامٌ، فَيُنَاصَحُ فِي هَذَا، فَإِذَا لَمْ يَمْتَثِلْ وَكَانَ فِي مُقَاطَعَتِهِ زَجْرٌ لَهُ يُهْجَرُ
“ওই দোকানদারকে নসিহত করা ওয়াজিব। তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে, এটি নিকৃষ্ট ও হারাম জিনিস এবং এর থেকে আসা উপার্জনও হারাম। এরপরও যদি সে না মানে এবং তাকে বর্জন করলে তার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে বা সে সতর্ক হয়, তবে তাকে বর্জন করা যেতে পারে।” [ইউটিউব চ্যানেল: العلامة الدكتور صالح الفوزان]
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: