প্রশ্ন: বিতর শেষ করার পর বসে বসে দুই রাকাত নামাজ পড়ার বিধান কী? এর কি কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল আছে?
উত্তর: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে:
«اجْعَلُوا آخِرَ صَلَاتِكُمْ بِاللَّيْلِ وِتْرًا»
“তোমরা রাতের সর্বশেষ নামাজ বিতর করো।” [সহিহ বুখারি: ৯৯৮] তবে সহিহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে:
«كُنَّا نُعِدُّ لَهُ سِوَاكَهُ وَطَهُورَهُ، فَيَبْعَثُهُ اللَّهُ مَا شَاءَ أَنْ يَبْعَثَهُ مِنَ اللَّيْلِ، فَيَتَسَوَّكُ وَيَتَوَضَّأُ، وَيُصَلِّي تِسْعَ رَكَعَاتٍ لَا يَجْلِسُ فِيهَا إِلَّا فِي الثَّامِنَةِ، فَيَذْكُرُ اللَّهَ وَيَحْمَدُهُ وَيَدْعُوهُ، ثُمَّ يَنْهَضُ وَلَا يُسَلِّمُ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي التَّاسِعَةَ، ثُمَّ يَقْعُدُ فَيَذْكُرُ اللَّهَ وَيَحْمَدُهُ وَيَدْعُوهُ –يعني: يَتَشَهَّدُ–، ثُمَّ يُسَلِّمُ تَسْلِيمًا يُسْمِعُنَا، ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ بَعْدَمَا يُسَلِّمُ وَهُوَ قَاعِدٌ، فَتِلْكَ إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يَا بُنَيَّ، فَلَمَّا أَسَنَّ نَبِيُّ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم– وَأَخَذَهُ اللَّحْمُ أَوْتَرَ بِسَبْعٍ، وَصَنَعَ فِي الرَّكْعَتَيْنِ مِثْلَ صَنِيعِهِ الْأَوَّلِ، فَتِلْكَ تِسْعٌ يَا بُنَيَّ، وَكَانَ نَبِيُّ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم– إِذَا صَلَّى صَلَاةً أَحَبَّ أَنْ يُدَاوِمَ عَلَيْهَا»
“আমরা তাঁর জন্য মিসওয়াক ও ওজুর পানি প্রস্তুত রাখতাম। রাতে আল্লাহ যখন চাইতেন তাঁকে জাগিয়ে দিতেন। তিনি মিসওয়াক করতেন ও ওজু করতেন। তারপর নয় রাকাত নামাজ পড়তেন। অষ্টম রাকাত ছাড়া কোনো রাকাতে বসতেন না। সেখানে আল্লাহর জিকির করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন ও দোয়া করতেন। এরপর সালাম না ফিরিয়ে উঠে দাঁড়াতেন এবং নবম রাকাত পড়তেন। তারপর বসে আল্লাহর জিকির, প্রশংসা ও দোয়া করতেন এবং আমাদের শুনিয়ে সালাম ফেরাতেন। সালামের পর বসা অবস্থায় আরও দুই রাকাত পড়তেন। হে বৎস, এই হলো এগারো রাকাত। যখন নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বয়স হলো এবং শরীর ভারী হয়ে গেল তখন তিনি সাত রাকাত বিতর পড়তেন এবং ওই দুই রাকাত আগের মতোই পড়তেন। হে বৎস, এই হলো নয় রাকাত। আর আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো নামাজ পড়লে তাতে নিয়মিত থাকা পছন্দ করতেন।” [সহিহ মুসলিম: ৭৪৬]
(الصَّوَابُ أَنَّ هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ فَعَلَهُمَا –صلى الله عليه وسلم– بَعْدَ الْوِتْرِ جَالِسًا؛ لِبَيَانِ جَوَازِ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْوِتْرِ، –يعني: وَأَنَّ الْأَمْرَ بِجَعْلِ الْوِتْرِ آخِرَ الصَّلَاةِ إِنَّمَا هُوَ لِلِاسْتِحْبَابِ لَا عَلَى سَبِيلِ الْوُجُوبِ–، وَبَيَانِ جَوَازِ النَّفْلِ جَالِسًا، وَلَمْ يُوَاظِبْ عَلَى ذَلِكَ –صلى الله عليه وسلم–، بَلْ فَعَلَهُ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ أَوْ مَرَّاتٍ قَلِيلَةً)
“সঠিক কথা হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুই রাকাত বিতরের পর বসে পড়েছেন বিতরের পর নামাজ পড়া যে জায়েজ তা বোঝানোর জন্য। অর্থাৎ বিতরকে শেষ নামাজ করার নির্দেশটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব হিসেবে নয়। পাশাপাশি বসে নফল পড়া যে জায়েজ তা স্পষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য ছিল। তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি নিয়মিত করেননি; বরং একবার, দুইবার বা অল্প কয়েকবার করেছেন।”
(وَأَمَّا صَلَاةُ الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْوِتْرِ فَهَذِهِ رَوَى فِيهَا مُسْلِمٌ فِي صَحِيحِهِ إِلَى النَّبِيِّ –صلى الله عليه وسلم– أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي بَعْدَ الْوِتْرِ رَكْعَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ، وَرُوِيَ ذَلِكَ مِنْ حَدِيثِ أُمِّ سَلَمَةَ فِي بَعْضِ الطُّرُقِ الصَّحِيحَةِ أَنَّهُ كَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا أَوْتَرَ بِتِسْعٍ، –كَأَنَّهُ يَأْتِي بِهَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ لِإِتْمَامِ الْإِحْدَى عَشْرَةَ–، فَإِنَّهُ كَانَ يُوتِرُ بِإِحْدَى عَشْرَةَ، ثُمَّ كَانَ يُوتِرُ بِتِسْعٍ وَيُصَلِّي بَعْدَ الْوِتْرِ رَكْعَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ. وَأَكْثَرُ الْفُقَهَاءِ مَا سَمِعُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ؛ وَلِهَذَا يُنْكِرُونَ هَذِهِ –هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ–، وَأَحْمَدُ وَغَيْرُهُ سَمِعُوا هَذَا وَعَرَفُوا صِحَّتَهُ، وَرَخَّصَ أَحْمَدُ أَنْ تُصَلَّى هَاتَانِ الرَّكْعَتَانِ وَهُوَ جَالِسٌ كَمَا فَعَلَ –صلى الله عليه وسلم–، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ لَمْ يُنْكَرْ عَلَيْهِ، لَكِنْ لَيْسَتْ وَاجِبَةً بِالِاتِّفَاقِ، وَلَا يُذَمُّ مَنْ تَرَكَهَا، وَلَا تُسَمَّى زِحَافَةً، –الصَّلَاةُ مِنْ جُلُوسٍ هَلْ تُسَمَّى زِحَافَةً؟ هَذَا كَلَامٌ يُمْكِنُ تَدَاوُلَهُ بَعْضُ النَّاسِ فِي وَقْتٍ مِنَ الْأَوْقَاتِ–، فَلَيْسَ لِأَحَدٍ إِلْزَامُ النَّاسِ بِهَا وَلَا الْإِنْكارُ عَلَى مَنْ فَعَلَهَا…، وَهَذَا الْحَدِيثُ الصَّحِيحُ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُدَاوِمُ عَلَيْهَا)
“বিতরের পর দুই রাকাত নামাজ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বিতরের পর বসে দুই রাকাত পড়তেন। উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদিস থেকেও কোনো কোনো সহিহ সনদে এসেছে, তিনি নয় রাকাত বিতর পড়লে এমন করতেন, যেন এই দুই রাকাত দিয়ে এগারো রাকাত পূর্ণ করতেন। কারণ তিনি প্রথমে এগারো রাকাত পড়তেন, পরে নয় রাকাত বিতর পড়ে বসে দুই রাকাত আদায় করতেন। অধিকাংশ ফকিহ এই হাদিস শোনেননি বলে এর আপত্তি করতেন। কিন্তু ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটি শুনেছেন এবং এর সহিহ হওয়া অনুধাবন করেছেন। তাই ইমাম আহমদ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মতো বসে এই দুই রাকাত পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং যে এটি পড়বে তাকে নিষেধ করা যাবে না। তবে এটি সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব নয়। তাই যে পড়ে না তাকে নিন্দাও করা যাবে না আর একে ‘অসমীচীন’ ও বলা যাবে না। ফলে মানুষকে এটি পড়তে বাধ্য করার কিংবা কেউ পড়লে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আর এই সহিহ হাদিস প্রমাণ করে যে, তিনি এটি সব সময় নিয়মিত করতেন না।”
সাধারণ অবস্থায় নফল নামাজ বসে পড়া জায়েজ। তবে সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক। সহিহ হাদিসে এসেছে:
«صَلَاةُ الْقَاعِدِ عَلَى النِّصْفِ مِنْ صَلَاةِ الْقَائِمِ»
“বসে নামাজ পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১২৩০, সহিহ বুখারি: ১১১৫]
এটি সক্ষম ব্যক্তির নফল নামাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ফরজ নামাজে সক্ষম ব্যক্তির জন্য দাঁড়িয়ে পড়া আবশ্যক (রুকন)। আর যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে দাঁড়িয়ে পড়তে অক্ষম তিনি ফরজ বা নফল যেটাই বসে পড়বেন পূর্ণ সওয়াবই পাবেন।
(الصَّوَابُ أَنْ يُقَالَ: إِنَّ هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ تَجْرِيَانِ مَجْرَى السُّنَّةِ وَتَكْمِيلِ الْوِتْرِ، فَإِنَّ الْوِتْرَ عِبَادَةٌ مُسْتَقِلَّةٌ وَلَا سِيَّمَا إِنْ قِيلَ بِوُجُوبِهِ، فَتَجْرِي الرَّكْعَتَانِ بَعْدَهُ مَجْرَى سُنَّةِ الْمَغْرِبِ مِنَ الْمَغْرِبِ، فَإِنَّهَا وِتْرُ النَّهَارِ، وَالرَّكْعَتَانِ بَعْدَهَا تَكْمِيلٌ لَهَا، فَكَذَلِكَ الرَّكْعَتَانِ بَعْدَ وِتْرِ اللَّيْلِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ)
“সঠিক কথা হলো, এই দুই রাকাত সুন্নতের মতো এবং বিতরের পরিপূরক।
বিতর একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, বিশেষত যদি এটিকে ওয়াজিব বলা হয়। তাই এর পরের দুই রাকাত মাগরিবের পরের সুন্নতের মতো কাজ করে, যা মাগরিবের পূর্ণতা যোগায়। কারণ মাগরিব হলো দিনের বিতর আর তার পরের দুই রাকাত তার পরিপূরক। ঠিক তেমনি রাতের বিতরের পরের দুই রাকাতও বিতরের পূর্ণতাদানকারী। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।”
সারসংক্ষপ হলো, বিতরের সালাতের পর দুই রাকাত সালাত আদায় করার বিষয়টি প্রমাণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বসে এই দুই রাকাত সালাত আদায় করেছেন, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
মূল: ডক্টর শায়খ আব্দুল করিম আল-খুযাইর (হাফিযাহুল্লাহ)। [সৌদি সিনিয়র ওলামা পরিষদের সাবেক সদস্য]।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।