তুহিন নামের অর্থ কী? ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই নাম রাখা যাবে কি? (ভ্রান্তি নিরসন)
প্রশ্ন: তুহিন নামের অর্থ কী? অনেক আলেম বলে থাকেন যে, এটি নাকি আরবি ‘তাওহীন’ শব্দ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘তুহিন’ হয়েছে, যার অর্থ অপমানিত বা লাঞ্ছিত করা। এ কথাটি কি সঠিক? ইসলামের দৃষ্টিতে এই নাম রাখা যাবে কি?
উত্তর: আমাদের দেশে ছেলেদের নাম হিসেবে ‘তুহিন’ নামটি বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। তবে এর অর্থ ও উৎস নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি মাঠপর্যায়ের কিছু বক্তা ও আলেমের আলোচনাতেও এর ভুল ব্যাখ্যা দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি করছে। তাই সর্বসাধারণের নিকট বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
❑ তুহিন শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ:
বাংলা অভিধান অনুযায়ী ‘তুহিন’ মূলত একটি তৎসম শব্দ (সংস্কৃত: √তুহ্+ইন)। এটি সরাসরি সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে। অভিধান মতে ‘তুহিন’ শব্দের অর্থ: বরফ, তুষার, হিম (বিশেষ্য পদ) অত্যন্ত শীতল, তুষারের মতো ঠাণ্ডা (বিশেষণ পদ)। যেমন: শীতের তুহিন রাত্রি কিংবা হিমালয়ের অপর নাম ‘তুহিনাদ্রি’ বা ‘তুহিনাচল’। [তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান ও উইকিসংকলন-বিশ্বকোষ, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১১]
বাংলা সাহিত্যে এ শব্দটি প্রয়োগের উদাহরণ:
◈ বিদ্রোহী কবি’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘সংকল্প’ কবিতায় বলেন:
“কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয়ের চূড়ে,
তুহিন মেরু পার হয়ে যায় সন্ধানীরা কিসের আশায়;”
এখানে ‘তুহিন মেরু’ বলতে অত্যন্ত শীতল বরফে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মেরুকে বোঝানো হয়েছে। তিনি তাঁর এই কালজয়ী কবিতায় অজানাকে জানার ও বিশ্বজয়ের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন।
◈ ‘রূপসী বাংলার কবি’ জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘আকাশলীন’ কবিতায় বলেছেন,
“জানি না তো কিছু, মনে হয় শুধু এমনি তুহিন চাঁদের নিচে
কত দিকে-দিকে কত কালে-কালে হয়ে গেছে কত কী যে!”
এখানে ‘তুহিন চাঁদ’ বলতে অতিশয় শীতল বা বরফের মতো ঠাণ্ডা আলো ছড়ানো চাঁদকে বোঝানো হয়েছে।
❑ আরবি ‘তাওহীন’ শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ:
অনেকে ‘তুহিন’ শব্দটিকে আরবি تَوْهِيْنٌ (তাওহীন) শব্দের অপভ্রংশ বা পরিবর্তিত রূপ মনে করেন, যা ভাষাগতভাবে একদম ভুল।
আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী تَوْهِيْنٌ (তাওহীন) শব্দটির বিশ্লেষণ হলো: মূলধাতু (রুট): وَهَنَ (ওয়াহানা – দুর্বল হওয়া)। تَفْعِيْل (তাফ‘ঈল) ওজনের মাসদার বা ক্রিয়ামূল। অর্থ: দুর্বল করা, শক্তিক্ষয় করা, হেয় করা, তুচ্ছ প্রতিপন্ন করা বা অপমানিত/লাঞ্ছিত করা।
সুসংগঠিত এই আরবি শব্দটির সাথে বাংলা ‘তুহিন’ (তুষার/শীতল) শব্দের উচ্চারণগত কিছুটা সামঞ্জস্য থাকলেও ব্যাকরণ ও অর্থগত দিক থেকে উভয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
❑ ইসলামের দৃষ্টি তুহিন শব্দ দ্বারা নাম রাখার বিধান:
যেহেতু ‘তুহিন’ শব্দটি আরবি ‘তাওহীন’ থেকে আসেনি এবং এটি মূলতঃ বাংলাভাষার একটি শব্দ। যার মূল অর্থ তুষার বা পরম শীতলতা, তাই অর্থগত দিক থেকে এতে শরিয়তবিরোধী বা আপত্তিকর কিছু নেই ফলে এই নাম রাখা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েজ।
❑ পরামর্শ:
একজন মুসলিমের ক্ষেত্রে কেবল অন্য যেকোনো ভাষার সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখার চেয়ে অর্থপূর্ণ আরবি নাম নির্বাচন করা অনেক বেশি উত্তম। বিশেষ করে যেসব নামে আল্লাহর অনুগত্য ও দাসত্ব ফুটে ওঠে। যেমন: আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, আব্দুল খালেক ইত্যাদি; কিংবা যেসব নাম নবি-রসুল, সাহাবি, তাবেয়ি, পুণ্যবান পূর্বসূরী, প্রখ্যাত বিজ্ঞ মনিষী ও দিগ্বীজয়ী মুসলিম যোদ্ধা প্রমূখদের স্মৃতি বহন করে সেসব নাম রাখা অধিক উত্তম।
এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এমন একটি নাম ধারণ করলে প্রথম পরিচয়েই একজন মানুষকে স্পষ্টত মুসলিম হিসেবে চেনা যায়। পরিচয়ের এই স্বকীয়তা বজায় রাখা সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহু আলাম-আল্লাহই ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।