সালাতে দাঁড়ালে আমার কিরাআতে ভুল হয়

প্রশ্ন: আমি কুরআন শিখছি আলহামদুলিল্লাহ। মোটামুটি তাজবিদ সহকারে পড়তে পারি। এখন সমস্যা হচ্ছে, আমি সালাতের বাইরে শুদ্ধ ভাবে কুরআন তিলাওয়াত করি কিন্তু সালাতে দাঁড়ালে আমার কিরাআতে ভুল হয়ে যায়। অর্থাৎ শয়তান আমাকে ভুলিয়ে দেয়। যেমন: আজ মাগরিবের সলাতে সুরা রদ এর ২৬ থেকে ২৯ নাম্বার আয়াত পড়েছি। তাতে “ওয়া ফারিহু বিল হায়াতিদ দুনইয়া ওয়ামাল হায়াতুদ দুনইয়া” এর স্থানে “ওয়ামাল হায়াতিদ দুনিয়া” পড়েছি-যা আমি সালাতের পরে নিশ্চিত হয়েছি। এ ধরণের ভুলের ক্ষেত্রে কী করণীয়?
উল্লেখ্য যে, আমি এ সলাতে দু জন মুসল্লি নিয়ে ইমামতি করেছিলাম।

উত্তর:
সালাতে কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ইনশাআল্লাহ কোন গুনাহ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
رَبَّنا لا تُؤاخِذنا إِن نَسينا أَو أَخطَأناّ
“হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা হঠাৎ অনিচ্ছাবশত: কোন ভুল করে ফেলি তবে আমাদেরকে ধরিও না।” [সূরা আল-বাকারা: ২৮৬]
তাছাড়া “ওয়ামাল হায়াতুদ দুনইয়া” এর স্থানে “ওয়ামাল হায়াতিদ দুনিয়া” পড়া হলে তা আরবি ব্যাকরণগত ভুল হলেও তাতে অর্থের বিকৃতি ঘটে নি। আর অর্থের বিকৃতি না ঘটলে ইনশাআল্লাহ সালাতে কোন সমস্যা হবে না।

আরেকটি বিষয় হল, হাদিসের আলোকে অধিক বিশুদ্ধ মতে সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রোকন এর অন্তর্ভূক্ত। আর পরে অন্য সূরা মিলানো সুন্নত। সুতরাং আপনি যদি কেবল সূরা ফাতিহা সঠিক ভাবে পড়ে থাকেন তাহলে সালাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। আর এর অতিরিক্ত কমপক্ষে যদি একটি অর্থ বোধক আয়াত পড়ে থাকেন তাহলে সুন্নতও পালন হয়ে যাবে। এর পরে যদি কিরাআতে ভুলও হয় তবে তা সালাত বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না ইনশাআল্লাহ।

যাহোক, সালাতে যেন কিরাআত ভুল না হয় সে জন্য কতিপয় দিক নির্দেশনা:

❖ সব মানুষেরই কমবেশি ভুল হয়। সুতরাং তা স্বাভাবিক। তাই অনিচ্ছাকৃত কিরাআতে ভুল হয়ে গেলে করণীয় হল, আল্লাহর নিকট তওবা করার পাশাপাশি আগামীতে যেন আর ভুল না হয় সে জন্য সতর্ক হওয়া।
❖ ইমামতি করার পূর্বে কুরআনের যে সূরা ও আয়াতগুলো সালাতে তিলাওয়াত করা হবে সেগুলো বারবার পড়ে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া।
❖ কুরআনের মুখস্থ কৃত অংশটুকু বারবার পড়ার পর অন্য কাউকে মুখস্থ শুনানো (এটা মুখস্থ মজবুত করার ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক)। শোনানোর মত কাউকে না পেলে মোবাইল ফোনে মুখস্থ তিলাওয়াত রেকর্ড করবেন। তারপর তা নিজে নিজে শুনে কুরআনের সাথে মিলিয়ে নিবেন।
❖ ইমামতি করার সময় সালাতে যে সূরাগুলো পড়বেন বলে ইচ্ছে করেছেন সেগুলো তাহাজ্জুদ সালাত বা সাধারণ সুন্নত ও নফল সালাতে নিজে নিজে পড়ার চেষ্টা করা।
❖ আর আপনি উপলদ্ধি করেনে যে, শয়তানি ওয়াসওয়াসার কারণে কিরাআতে জড়তা সৃষ্টি হচ্ছে তাহলে হাদিসে বর্ণিত একটি সমাধান আছে। তা হল: সালাতরত অবস্থায় শয়তানের উপস্থিতি টের পেলে শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা তথা চুপি স্বরে “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম” (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) পাঠ করা ও বাম দিকে অতি হালকা ভাবে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করা।
যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عن عُثْمَانَ بْن أَبِي الْعَاصِ رضي الله عنه أنه أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ صَلَاتِي وَقِرَاءَتِي يَلْبِسُهَا عَلَيَّ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خَنْزَبٌ ، فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهُ وَاتْفِلْ عَلَى يَسَارِكَ ثَلَاثًا قَالَ : فَفَعَلْتُ ذَلِكَ فَأَذْهَبَهُ اللَّهُ عَنِّي
উসমান ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, শয়তান আমার সালাত ও কিরাতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
তিনি বললেন: এটি হল শয়তান। যার নাম খানযাব। তুমি যদি এমনটি অনুভব কর, তবে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম পাঠ কর এবং তোমার বাম পাশে তিনবার হালকা ভাবে থুথু নিক্ষেপ কর।”
তিনি বলেন: আমি এমনটি করায় আল্লাহ তায়ালা আমার এ সমস্যা দূর করে দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম ২২০৩, মুসনাদে আহমাদ ১৭৮৯৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬১৫,)

উল্লেখ্য যে, শরীর বা কাঁধ বাম দিকে ঘুরার প্রয়োজন নাই। কেবল মাথাটা বাম দিকে সামান্য ঘুরিয়ে খুব হালকা ভাবে থুথু ফেলার মত করবে। (এতে থুথুর মত হালকা আওয়াজ হবে কিন্তু মুখ থেকে পানি নির্গত হবে না।) এমনটি করলে শয়তান লাঞ্ছিত অবস্থায় পলায়ন করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড সেন্টার, সৌদি আরব।

Share: