সাত আসমান ও সাত জমিনে আল্লাহর জায়গা হয় না, জায়গা হয় মুমিনের অন্তরে। একটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা

প্রশ্ন: “সাত আসমান সাত ও জমিনে আল্লাহর জায়গা হয় না; জায়গা হয় মুমিনের অন্তরে।” এ প্রসঙ্গে প্রচলিত হাদিসগুলার সহীহ সনদ আছে কি?
উত্তর:
এটি এবং এ জাতীয় যত কথা প্রচলিত আছে সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। সুফি-বিদআতি গোষ্ঠী এ জাতীয় বহু হাদিস তৈরি করে মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন গল্পবাজ ও ওয়াজ ব্যবসায়ী বক্তা, কথিত পীর-ফকির, বাউল এবং মুরশিদী ও আধ্যাত্মিক গানের গায়কদের মুখে শোনা যায়। বিভিন্ন কথিত ধর্মীয় বইয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে হাদিসের নামে যে সব বানোয়াট কথার্বাতা প্রচলিত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল:

১. الْـقَـلْـبُ بَـيْـتُ الـرَّبِّ
“মুমিনের কলব (হৃদয়) রবের ঘর।”

বদরুদ্দীন যারকাশী বলেন,
ليس هذا من كلام النبي صلى الله عليه وسلم
“এটি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা নয়।” [আল লাআলী আল মানছুরা: ১৪৬]
একই কথা বলেছেন, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া। [মাজমু ফাতাওয়া (ফতোয়া সমগ্র), ১৮/৩৭৬]

২. قَلْـبُ الْمُـؤْمِنِ عَـرْشُ اللهِ
“মুমিনের কলব (হৃদয়) আল্লাহর আরশ।”

ইমাম সানআনী বলেন, “এটি মাউযু বা বানোয়াট কথা।” [মাউযুআতে সানআনী: ৫০]

৩. مَا وَسِعَنِيْ أَرْضِيْ وَلاَ سَمَائِيْ وَلَكِنْ وَسِعَنِيْ قَلْبُ عَبْدِيْ الْمُؤْمِن
“আমার জমিন এবং আমার আসমান আমাকে ধারণ করতে পারে নি কিন্তু আমার মুমিন বান্দার কলব আমাকে ধারণ করতে পারে।”

মোল্লা আলী কারী বলেন, قيل لا أصل له أو بأصله موضوع “বলা হয়েছে, এটি ভিত্তিহীন বা মূলত বানোয়াট” [আল আসরারুল মারকুআহ: ৩০১]

সুফিদের তৈরি করা একটি ফারসি কবিতায়ও এই জাতীয় কথা পাওয়া যায়। কবিতাটির অনুবাদ:
(আল্লাহ বলেন-নাউযুবিল্লাহ) “আসমান ও জমিনের কোথাও আমার জায়গা হল না। কিন্তু জায়গা হল, মুমিনের কলবে (হৃদয়ে)।” বলা হয় এটি সুফি বিদআতি কবি, জালালুদ্দীন রুমির মসনবিতে আছে। যেমন: জনৈক সুফি বেদাতি বিদআতি লিখেছে,

“পরিশুদ্ধ আত্মা হচ্ছে মুমিনের দিল যেখানে রবের বসবাস। কোরআন বলে “ক্বুলুবুল মুমিনা আরশিল্লাহ”। মুমিনের কলব আল্লাহর আরশ। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি বলেন, মান্না গুনজম দার জমিনে আসমা, লিকে গুনজম দার কুলুবে মোমেনা”। আসমান জমিনের কোথাও তিনি নেই, তিনি আছেন মুমিনের কলবে।” [newsnarayanganj24]

এই লেখক তো একটি বানোয়াট হাদিসকে সরাসরি কুরআনের আয়াত বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। যারা এমন স্পর্ধা দেখাতে পারে তাদের চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَن قَالَ سَأُنزِلُ مِثْلَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ ۗ
“ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলে, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাজিল করে দেখাচ্ছি যেমন আল্লাহ নাজিল করেছেন।” [সূরা আনআম: ৯৩]

এভাবেই এসব জালেমরা পীর ও সুফি-সাধকের বেশ ধরে তথাকথিত খানকা ও দরবারগুলোকে ঈমান লুটের বাজারে পরিণত করেছে। আর মূর্খরা এসব ভণ্ডদের পায়ের কাছে, অর্থ-সম্পদ, ইজ্জত-সম্ভ্রম, জ্ঞান-বিবেক, ঈমান-আমল সব কিছু উজাড় করে রিক্ত হস্তে ফিরে আসছে। এই ডাকাতদের আখড়াগুলো কখন কে বন্ধ করবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জনেন।

🌀 আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন?

কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে অকাট্য ভাবে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তাআলা সত্ত্বাগতভাবে সপ্ত আসমানে আরশে আজিমের উপরে রয়েছেন। কিন্তু সমগ্র সৃষ্টিলোকের ঊর্ধ্বে অবস্থিত আরশের উপর থেকেই তিনি সবকিছু দেখেন, শুনেন ও পরিচালনা করেন। বিশ্ব জগতের সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য তার হাতেই ন্যস্ত রয়েছে। কিন্তু মুমিনের হৃদয় জুড়ে রয়েছে আল্লাহর প্রতি ঈমান (বিশ্বাস), গভীর ভালোবাসা, ভয়, আস্থা ও নির্ভরতা।

সুতরাং যারা বলে, “মুমিনের কলবে আল্লাহর আরশ রয়েছে” তারা হল, অপব্যাখ্যাকারী ও পথভ্রষ্ট বিদআতি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন এবং যে বা যারা নানা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা দ্বারা পবিত্র দীন ইসলামে বিকৃতি সাধনের চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন। নিশ্চয় তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাশীল।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।।