কুরআন ও হাদিসের দুআর মধ্যে শব্দ পরিবর্তন ‌এবং সংযোজন-বিয়োজনের বিধান

প্রশ্ন: কুরআন-হাদিসের দুআ সমূহে পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, এক বচন, বহুবচন ইত্যাদি ক্ষেত্রে শব্দ পরিবর্তন অথবা তাতে প্রয়োজনীয় কোনও শব্দ সংযোজন বা বিয়োজন করা কি জায়েজ? দুআয়ে কুনুত বা অন্যান্য সময় দুআর ক্ষেত্রে ইমাম ও আলেমদের এমনটি করতে দেখা যায়। ইসলাম এ ব্যাপারে কী বলে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: কুরআনের দুআগুলোকে যখন দুআর নিয়তে পড়া হবে (তিলাওয়াতের নিয়তে নয়) তখন তাতে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সর্বনাম পরিবর্তন (এক বচন, দ্বিবচন, বহু বচন) অথবা প্রয়োজনীয় শব্দ সংযোজন-বিয়োজন করা জায়েজ। এটি একটি প্রসিদ্ধ মাসআলা। আপনারা লক্ষ্য করবেন, হারামাইনের সম্মানিত ইমামগণ রমজান মাসে বিতির সালাতের শেষ রাকাতে সম্মিলিত মুনাজাতে কুরআনের দুআ সংক্রান্ত আয়াতগুলোতে এক বচনের স্থানে বহু বচন এবং প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কিছু শব্দ পরিবর্তন করে থাকেন।

নিম্নে এ বিষয়ে হাদিসের দলিল ও আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করা হল:

❑ কতিপয় দলিল:

◆ ১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের দুআ “রাব্বানা আ-তিনা ফিদদুনিয়া…” এর মধ্যে “আল্লাহুম্মা” শব্দ সংযোজন করে বলেছেন, “আল্লাহুম্মা রাব্বানা আতিনা ফিদদুনিয়া…”। কারণ তিনি তা দুআ হিসেবে পড়েছেন; তিলাওয়াত হিসেবে নয়।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أنَّ رَسولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ عَادَ رَجُلًا مِنَ المُسْلِمِينَ قدْ خَفَتَ فَصَارَ مِثْلَ الفَرْخِ، فَقالَ له رَسولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ: هلْ كُنْتَ تَدْعُو بشَيءٍ، أَوْ تَسْأَلُهُ إيَّاهُ؟ قالَ: نَعَمْ؛ كُنْتُ أَقُولُ: اللَّهُمَّ ما كُنْتَ مُعَاقِبِي به في الآخِرَةِ، فَعَجِّلْهُ لي في الدُّنْيَا، فَقالَ رَسولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ: سُبْحَانَ اللهِ! لا تُطِيقُهُ -أَوْ لا تَسْتَطِيعُهُ- أَفلَا قُلْتَ: اللَّهُمَّ آتِنَا في الدُّنْيَا حَسَنَةً، وفي الآخِرَةِ حَسَنَةً، وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ، قالَ: فَدَعَا اللهَ له، فَشَفَاهُ.
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মুসলিম রোগীকে সেবা করতে গেলেন। সে (অসুখে কাতর হয়ে) অত্যন্ত নিস্তেজ হয়ে পাখির ছানার মতো হয়ে গেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি কোন বিষয় প্রার্থনা করছিলে অথবা আল্লাহর নিকট বিশেষভাবে কিছু চেয়েছিল? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহ, আপনি পরকালে আমাকে যে সাজা দিবেন তা এ ইহকালেই দিয়ে দিন।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সুবহানাল্লাহ! তোমার এমন ক্ষমতা নেই যে, তা সহ্য করবে (অথবা বললেন, তুমি তা সহ্য করতে পারবে না।) তুমি এমনটি বললে না কেন?
اللَّهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা আ-তিনা ফিদদুনিয়া…”
“হে আল্লাহ, আমাদেরকে কল্যাণ দান করো দুনিয়ায় এবং কল্যাণ দান করো আখিরাতে। আর জাহান্নামের আগুনের শাস্তি থেকে আমাদেরকে রক্ষা করো।”
তিনি (বর্ণনা কারী) বলেন, তখন তিনি তার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করেন ফলে আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দেন। [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), অধ্যায়: ৪৯। জিকর, দুআ, তওবা ও ক্ষমা প্রার্থন, পরিচ্ছেদ: ৭. দুনিয়াতে শাস্তি কার্যকরের জন্য দুআ করা অ পছন্দনীয়]
লক্ষণীয়: কুরআনের আয়াতে ‘রাব্বানা’ শব্দটি আছে; ‘আল্লাহুম্মা’ শব্দটি নেই। কিন্তু আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে ‘রব্বানা’ শব্দের পরিবর্তের ‘আল্লাহুম্মা’ শব্দটি যুক্ত করেছেন।

◆ ২. এছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত শুরুর দুআ (দুআউল ইস্তিফতাহ)-এর মধ্যে কুরআনের আয়াত থেকে এক জায়গায় “ইন্নী” শব্দ, অন্য জায়গায় “কুল” শব্দ বিয়োজন করেছেন। যেমন:

وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
অথচ কুরআনে আছে,
إِنِّي وَجَّهْتُ…
অর্থাৎ এখানে তিনি ’ইন্নী’ শব্দটি বিয়োজন করেছেন।

◆ ৩. একই দুআর মধ্যে তিনি পড়েছেন,

إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অথচ কুরআনে আছে,
قل إِنَّ صَلَاتِي
অর্থাৎ এখানে তিনি ‘কুল’ শব্দ বিয়োজন করেছেন।

❑ আলেমদের ফতোয়া:

◈ ১. শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াকে এক মহিলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় যে, সে হাদিসে শুনেছে:
اللهم إني عبدك وابن عبدك، ناصيتي بيدك…. إلى آخره
আল্লাহুম্মা ইন্নী আব্দুকা ওয়াবনু আমাতিকা, নাসিয়াতি বিইয়াদিকা…। (“হে আল্লাহ, আমি তোমার দাস, তোমার দাসের ছেলে, আমার কপাল (ভাগ্য) আপনার হাতে…।”) ফলে সে সবসময় এই শব্দেই দুআ পাঠ করে থাকে। তখন তাকে বলা হল, তুমি এভাবে বলো, اللهم إني أمتك بنت أمتك إلى آخره “আল্লাহুম্মা ইন্নি আমাতুকা বিনতু আমাতিকা…।” (আমি তোমার দাসী, তোমার তোমার দাসীর মেয়ে…)। কিন্তু তিনি হাদিসে বর্ণিত শব্দ ছাড়া অন্য কিছু পাঠ করতে অস্বীকার করেছে। এটা একটা বিপদ কি না?
উত্তরে তিনি (ইবনে তাইমিয়া রহ.) বলেন, তার উচিৎ ছিল, এভাবে বলা:
اللهم إني أمتك بنت عبدك ابن أمتك
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আমাতুকা বিনতু আবদিকাবনু আমাতিকা” (আমি তোমার দাসী, তোমার দাসের মেয়ে,‌ তোমার দাসীর মেয়ে…)। এটাই অধিক উপযুক্ত ও উত্তম। যদিও আরবি ভাষায় عبدك ابن عبدك “আব্দুকাবনু আবদিকা” বলারও সুযোগ আছে-যেমনটি الزوج (সঙ্গী বা জোড়া) শব্দের ক্ষেত্রে।” [মাজমু ফতাওয়া ইবনে তায়মিয়া, ২/১৭৭]

◈ ২. সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ও বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, মহিলা কি আব্দুকা (তোমার দাস) বলবে নাকি আমাতুকা (তোমার দাসী) বলবে?

তিনি উত্তরে বলেন, বিষয়টি প্রশস্ত ইনশাআল্লাহ। তবে উত্তম হল, মহিলা এভাবে বলবে,
اللهم إني أمتك وابنة عبدك وابنة أمتك… إلخ
“আল্লাহুম্মা ইন্নী আমাতুকা ওয়াবনাতু আবদিকা ওয়াবনাতু আমাতিকা…। (হে আল্লাহ, আমি তোমার দাসী, তোমার দাসের মেয়ে এবং তোমার দাসীর মেয়ে…)। এভাবে বলাই অধিক সঙ্গত ও যৌক্তিক। তবে যদি‌ হাদিসে যে শব্দটি এসেছে সে শব্দ দ্বারাই দুআ করে তাহলেও কোনও ক্ষতি নেই ইনশাআল্লাহ। কারণ সে আমাহ (দাসী) হলেও সে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন বান্দা। [মাজমুউল ফাতওয়া, ফতোয়া নম্বর: ৭১০১]

◈ ৩. বিশ্ববিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েব সাইট islamweb-এ প্রশ্ন করা হয়:

প্রশ্ন: সে ব্যক্তির বিধান কী যে ব্যক্তি কুরআন থেকে দুআ নিয়ে তাতে পরিবর্তন ঘটায়-যদিও একটি অক্ষর হয়? কিন্তু হয়ত তাতে কুরআনের মধ্যে বিকৃতি সাধনের উদ্দেশ্য থাকে না।
উত্তর: “দুআ কারী এবং যার জন্য দুআ করা হয় তার অবস্থার আলোকে সর্বনামকে একবচন অথবা দ্বিবচন থেকে বহুবচন এবং পুরুষ লিঙ্গ থেকে স্ত্রী লিঙ্গে পরিবর্তন করা শুদ্ধ-তাতে কোনও সমস্যা নেই। যে ব্যাপারে একাধিক আলেম সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। কারণ দুআর বিষয়টি প্রশস্ত-যেমনটি ইমাম নওবি আযকার গ্রন্থে বলেন, “জেনে রাখো যে, দুআর বিষয়টি প্রশস্ত।” [islamweb-দুআ ও জিকিরের আদব, ফতোয়া নম্বর: ২৪২৫০৬]
আল্লাহু আলাম।

মোটকথা, হাদিসে বর্ণিত দুআ কিংবা কুরআনের দুআ সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে দুআর নিয়তে পড়ার সময় প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির আলোকে এক বচনের স্থানে বহু বচন এবং বহু বচনের স্থানে একবচন, পুরুষ লিঙ্গের স্থানে স্ত্রীলিঙ্গ এবং স্ত্রীলিঙ্গের স্থানে পুরুষ লিঙ্গ কিংবা অবস্থা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত শব্দ সংযোজন বা বিয়োজন করা নাজায়েজ নয়-যদি তাতে বিকৃতি সাধনের উদ্দেশ্য না থাকে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◈◍◈▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
(মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সউদি আরব।

Share On Social Media