প্রশ্ন: ফেসবুক বা ইউটিউবে বেপর্দা নারীদের ভিডিও কিংবা অপ্রয়োজনীয় ফানি বা মজার ভিডিওতে লাইক বা “হা-হা” রিঅ্যাক্ট দেওয়ার বিধান কী? এসব ভিডিও শেয়ার করা কি জায়েজ?
উত্তর: ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের প্রতিটি ক্লিক, লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার নিছক বাতাসের সাথে মিশে যায় না। এর প্রতিটির হিসাব আমাদের দাঁড়াতে হবে মহান আল্লাহর দরবারে। স্ক্রিনে কাটিয়ে দেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর সূক্ষ্ম নজরদারিতে আছে এবং লিপিবদ্ধ হচ্ছে। তাই মুমিন হিসেবে এই ভার্চুয়াল ভুবনে আমাদের চলাফেরা হোক আরও অনেক বেশি সচেতন, পরিমিত ও সংযত—এটাই তো প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়।
নিম্নে প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর সংক্ষেপে উত্তর দেওয়া হলো:
❑ ১. বেপর্দা নারীদের ভিডিও দেখা ও তাতে লাইক, লাভ ইত্যাদি রিয়েক্ট দেওয়া
বাস্তব জীবনে বেগানা নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া এবং বেপর্দা অবস্থায় তাদের দিকে তাকানো যেমন হারাম, তেমনি ডিজিটাল জগতেও তাদের ছবি বা ভিডিও দেখা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
“(হে নবী,) আপনি মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” [সূরা নূর: ৩০]
এ ছাড়া কোনো ভিডিওতে লাইক ব লাইভ ইত্যাদি রিঅ্যাক্ট দেওয়ার অর্থ ওই বিষয়ে সমর্থন ও ভালোলাগা জানানো। আর ফেসবুকের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এটি গুনাহের কনটেন্টের ক্ষেত্রে পাপে সহযোগিতার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা পুণ্য ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
অনুরূপভাবে নাচ, গান, মিউজিক, অশ্লীলতা যুক্ত ভিডিও দেখা, লাইক বা শেয়ার করা গুনাহে সহযোগিতার শামিল। কারণ এতে তাদের ভিউ ও জনপ্রিয়তা বাড়ে, ফলে অবৈধ আয়ের পথও প্রসারিত হয়।
❑ ২. অনর্থক ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করা:
দ্বীন ও দুনিয়ার কোনও উপকার নেই এমন ভিডিও অথবা উদ্দেশ্যহীনভাবে অনর্থক ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করাও একজন মুমিনের শানের পরিপন্থী। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
“অপ্রয়োজনীয় বিষয় ছেড়ে দেওয়া একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭; হাদিসটি হাসান]
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করে বলেন:
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকে।” [সূরা মুমিনূন: ৩]
মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন বান্দার মুক্তি মেলবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার জীবন, যৌবন এবং সম্পদের হিসাব প্রতি মুহূর্তের জন্য নেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
“لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِفِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ”
“কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহর নিকট থেকে এক চুলও নড়বে না। তার জীবনকাল কোন কাজে ব্যয় করেছে, তার যৌবনকাল কোন পথে ক্ষয় করেছে, ধন-সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে এবং তা কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কি আমল করেছে?” [তিরমিজি: ২৪১৬]
❑ ৩. হাসি-তামাশা, কৌতুক বা ফানি ভিডিওতে রিঅ্যাক্ট দেওয়া:
হাসি-তামাশা ও কৌতুক এবং তাতে রিঅ্যাক্ট দেওয়া নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার। সত্য ও বাস্তবসম্মত বিষয়ে হালকা বিনোদন কিংবা মাঝেমধ্যে মুচকি হাসি-মজাক ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন থেকেও তা প্রমাণিত। একবার সাহাবিগণ তাঁকে বললেন, “আপনি তো আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন।” উত্তরে তিনি বললেন:
إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
“আমি তো সত্য ছাড়া কিছু বলি না।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯০; হাদিসটি হাসান]
তবে এসব বিষয়ে অহেতুক বেশি সময় ব্যয় করা মুমিনের মর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে, মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বা বানোয়াট গল্প তৈরি করা কঠিন গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ، وَيْلٌ لَهُ، وَيْلٌ لَهُ
“ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলে এবং তাতে মিথ্যা বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯০; জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৫; হাদিসটি হাসান]
সুতরাং মিথ্যা বা বানোয়াট কৌতুকে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করাও গুনাহের। কারণ এতে কনটেন্ট ক্রিয়েটার উৎসাহিত হয় এবং আরও বেশি পরিমাণে এ জাতীয় ভিডিও বানাতে আগ্রহী হয়। এটি তাকে গুনাহের কাজে সহায়তার শামিল। একইভাবে গুনাহের বিষয়বস্তুতে “হা-হা” রিঅ্যাক্ট দেওয়া মানে সেটিকে পছন্দ ও সমর্থন করা, তাই তা-ও জায়েজ নয়।
❑ ৪. রোস্টিং ভিডিওতে রিঅ্যাক্ট করা:
কাউকে নিয়ে অন্যায়ভাবে রোস্টিং বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা উপহাসমূলক ভিডিও বানানো, সেগুলো দেখা, লাইক বা শেয়ার করাও নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ
“হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।” [সূরা হুজুরাত: ১১]
❑ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ব্যাপারে পরামর্শ:
◆ ফিড পরিচ্ছন্ন রাখুন। সন্দেহজনক বা হারাম কনটেন্টে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার থেকে বিরত থাকুন।
◆ এমন কিছু ফিডে এলে “Not interested” নির্বাচন করুন এবং অস্বস্তিকর পেজ বা চ্যানেল আনফলো অথবা ব্লক করুন।
একজন ইমানদার ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো, সে সন্দেহজনক বিষয়কে এড়িয়ে চলবে এবং নিশ্চিত ও নিরাপদ বিষয় আঁকড়ে ধরবে। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَىٰ مَا لَا يَرِيبُكَ
“যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে এমন বিষয় গ্রহণ করো, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮; হাদিসটি সহিহ]
সুতরাং গুনাহ থেকে বাঁচতে সব ধরনের হারাম কনটেন্ট বর্জন করুন। এর পরিবর্তে দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে আসে এমন ভিডিওগুলো দেখুন এবং সেগুলো প্রচার-প্রসার করুন। এতে আপনার আমলনামায় সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, ভিডিওর বিষয়বস্তু যদি শরিয়তবিরোধী হয়, যেমন: গান-বাদ্য, অশ্লীলতা, বেপর্দা, কাউকে নিয়ে উপহাস কিংবা মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য, মিথ্যা কৌতুক ইত্যাদি তাহলে সেগুলোতে কোনো ধরনের রিঅ্যাক্ট দেওয়া, সমর্থন জানানো বা শেয়ার করা কিছুতেই জায়েজ নয়। তবে যদি এসব হারামমুক্ত হয় এবং তাতে দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর কিছু থাকে তাহলে সেগুলোতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করা দূষণীয় নয়। বরং তা সওয়াবের কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়াকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন এবং তা আল্লাহর নাফরমানির কাজে ব্যবহার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।