আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের অপরিহার্যতা ও পদ্ধতি

প্রশ্ন: কীভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য উত্তম উপায়ে শুকরিয়া আদায় করতে পারি? যে নিয়ামতগুলোর মধ্যে আছি, সুন্দরভাবে শুকরিয়া আদায় করলে অন্তর প্রশান্ত হবে? জাযাকাল্লাহু খাইরান।
উত্তর: আল্লাহতালা অসংখ্য নেয়ামত দ্বারা আমাদের জীবনকে ঋদ্ধ করেছেন। আমরা প্রতি মুহূর্তে তার নেয়ামত ভোগ করছি। তাই আমাদের কর্তব্য, মহান রবের দরবারে কৃতজ্ঞতা আদায় করা।
আমরা আল্লাহর যত বেশি শুকরিয়া আদায় করব তিনি তত বেশি আমাদেরকে দান করবেন। কিন্তু অকৃতজ্ঞ হলে রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
” যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের (নিয়ামত) বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।” [সূরা ইব্রাহিম: ৭]
মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ এবং অকৃতজ্ঞ হওয়া থেকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
“অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [সূরা বাকারা: ১৫২]
সুতরাং বান্দার জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা ফরজ এবং অকৃতজ্ঞতা হওয়া হারাম ও কবিরা গুনাহ। কিন্তু আমরা কীভাবে আমাদের মহান দয়ালু ও দাতা আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা আদায় করব এ বিষয়ে নিম্নে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:
আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করব প্রধানত তিনভাবে।‌ যথা: অন্তরে, মুখে এবং কর্মের মাধ্যমে।
❑ ১. অন্তরে শুকরিয়া:
অন্তরে মহান আল্লাহর নেয়ামতরাজীর স্বীকৃতি প্রদান এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করা আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের প্রথম ধাপ। অর্থাৎ অন্তরে আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি প্রদান করা এবং এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, এই আমরা এই জীবনে যা কিছু অর্জন করেছি এবং যত নিয়মত ভোগ করছি সবই আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহের ফল এবং সবকিছু একচ্ছত্রভাবে তাঁরই দান। ‌আমাদের ব্যক্তিগত কোন মেধা, যোগ্যতা বা পরিশ্রমের ফলে আমরা কোনো কিছুই অর্জন করিনি। এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য:
◆ ক. অল্পে তুষ্ট থাকা। অর্থাৎ আল্লাহ যে অবস্থায় রেখেছেন এবং যতটুকু দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। অতিরিক্ত পাওয়ার জন্য হাহাকার না করা। এটি তাকওয়ার পরিচায়ক।
◆ খ. দুনিয়াবি ক্ষেত্রে, যেমন: ধন-সম্পদ, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি বিষয়ে নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত এবং দুর্বল মানুষের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। এটি অন্তরের হাহাকার দূর করে নিয়ামতের কদর বাড়িয়ে দেয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
“তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের লোকদের দিকে তাকাও এবং তোমাদের চেয়ে উপরের লোকদের দিকে তাকাও না। কারণ এটাই বেশি উপযোগী যে, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৬৩]
❑ ২. মুখে আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি প্রদান এবং শুকরিয়া জ্ঞাপন:
এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য:
◆ ক. অন্তরে মহান রবের নেয়ামতের স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি মৌখিকভাবে কৃতজ্ঞতা আদায় করা। যেমন: আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করে বা ভালো কিছু অর্জন করে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা বা মাসনুন দোয়াগুলো পাঠ করা।
◆ খ. খাওয়া-পান করা, পোশাক পরিধান ইত্যাদি সকল হালাল কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে (বিসমিল্লাহ বলে) শুরু করা।
◆ গ. এ ক্ষেত্রে আরো করণীয় হলো, আল্লাহর নিয়ামতগুলোর কথা মুখে স্বীকার করা, লোক সম্মুখে আলোচনা করা বা সেগুলোর প্রকাশ ঘটানো এবং মহান দয়ালু ও দাতা রাব্বুল আলামিনের গুনাগুন বর্ণনা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
“আর আপনার রবের নিয়ামতের কথা আপনি আলোচনা করুন।” [সূরা দুহা: ১১]
◆ ঘ. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে বিশেষ করে নিম্নোক্ত দোয়াটা পড়া:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা আ’ইন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা।
“হে আল্লাহ! আপনার জিকির, আপনার শুকরিয়া এবং আপনার উত্তম ইবাদত করার জন্য আমাকে সাহায্য করুন।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫২২; সহিহ (আলবানি)]
❑ ৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার বা কাজের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায়:
আল্লাহ যে নিয়ামত দিয়েছেন তা তাঁর পছন্দনীয় এবং নির্দেশিত কাজে ব্যবহার করাই প্রকৃত শুকরিয়া। এই ক্ষেত্রে করণীয় হলো:
◆ বিশেষ নিয়ামত লাভ করলে বা খুশির খবর পেলে সেজদায়ে শোকর দেওয়া।
◆ চোখ, কান, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুনাহ বা অন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার না করা।
◆ হারাম কাজে অর্থ ব্যয় না করা।
◆ নিয়ামতের অপব্যবহার না করা।
◆ অপচয় থেকে বিরত থাকা।
◆ আল্লাহর দেওয়া সম্পদ ইসলামের প্রয়োজনে ব্যয় করা।
◆ গরিব-অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা।
◆ সম্পদের হক আদায় করা। যেমন: জাকাত ও ফিতরা আদায়, দ্বীনের কাজে ব্যয়, পিতা-মাতার স্ত্রী-সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করা ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর শোকরগুজার বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: