ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পাঠ করলে কি মনের আশা পূরণ হয়

প্রশ্ন: ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পাঠ করা একটি প্রচলিত আমল। বলা হয়, এটি একটি “পরীক্ষিত আমল” এবং এর মাধ্যমে মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। আবার অনেকে একে বিদআত বলে থাকেন। এই আমল সম্পর্কে এবং হাজত পূরণের বিশুদ্ধ পন্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর: জানা জরুরি যে, “পরীক্ষিত আমল” কোনও শরয়ি মানদণ্ড নয়। কোনও আমল দ্বীনে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ফল পাওয়া গেছে বলেই কোনও আমলকে দ্বীনি বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।
◈ ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পড়ার হাদিসটি কি সহিহ?
সুনানে দারিমিতে (হাদিস নং ৩৪৬১, ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়) বর্ণিত আছে—
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَرَأَ يس فِي صَدْرِ النَّهَارِ قُضِيَتْ حَوَائِجُهُ»
“আতা ইবনে আবি রাবাহ (রাহ.) বলেন, আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দিনের শুরুতে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে, তার প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা হবে।'” [সুনানে দারিমি: ৩৪৬১]
এই হাদিসটি সনদগতভাবে জইফ (দুর্বল) ও মুরসাল। বর্ণনাকারী আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.) একজন তাবেয়ি, সাহাবি নন। তিনি নিজেই “بَلَغَنِي” (আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে) বলেছেন—অর্থাৎ মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী কে ছিলেন (কোনও সাহাবি নাকি অন্য কোনও তাবেয়ি) তা উল্লেখ না করেই সরাসরি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে সম্বন্ধ করেছেন। ফলে সনদে বিচ্ছিন্নতা (انقطاع) সৃষ্টি হয়েছে। অথচ হাদিস বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সনদে অবিচ্ছিন্নতা (اتصال) হওয়া আবশ্যক। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ একে “إسناده ضعيف مرسل” (সনদ দুর্বল ও মুরসাল) বলে চিহ্নিত করেছেন।
আল্লামা আলবানি (রহ.) এ হাদিস প্রসঙ্গে বলেন—
«وَهَذَا أَثَرٌ مُرْسَلٌ -كَمَا رَأَيْتَ- لِأَنَّ عَطَاءً لَيْسَ مِنَ الصَّحَابَةِ قَطْعًا، فَالْأَثَرُ إِذَنْ ضَعِيفٌ. رِجَالُهُ ثِقَاتٌ فَهُوَ قَوِيٌّ لَوْلَا الْإِرْسَالُ»
“এটি একটি মুরসাল বর্ণনা—যেমনটি আপনি দেখলেন। কারণ আতা নিশ্চিতভাবেই সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত নন। সুতরাং বর্ণনাটি দুর্বল। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য (সিকাহ); সনদ বিচ্ছিন্ন না হলে এটি শক্তিশালী হতো।” [হিদায়াতুর রুওয়াত: ২/১১৮]
অর্থাৎ এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য হলেও সনদ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণেই এটি জইফ (দুর্বল) বলে গণ্য। কিছু আলেমের মতে, যেহেতু আতা ইবনে আবি রাবাহ একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন তাবেয়ি ছিলেন তাই তাঁর তার বর্ণনা মুরসাল হলেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, যেকোনো মুরসাল বর্ণনাই মূলনীতিগতভাবে জইফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, যতক্ষণ না অন্য সনদে তা সমর্থিত হয়। এখানে যেহেতু এই মতনের কোনও সমর্থক সনদ পাওয়া যায় না তাই সতর্কতা হলো একে দুর্বল হিসেবেই গণ্য করা।
◈ এটি কি আমলযোগ্য?
সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের অংশ হিসেবে ফজরের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সূরা ইয়াসিন পড়া সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন: ৪১ বার), নির্দিষ্ট আয়াত বারবার পড়া বা দলবদ্ধভাবে বিশেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করলে তা বিদআত হবে। কারণ শরিয়তে এর কোনও ভিত্তি নেই। অনুরূপভাবে যেহেতু “হাজত পূরণ হবে” মর্মে বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল। তাই একে নিশ্চিত ফলদায়ক হিসেবে আমল না করাই উত্তম। এর পরিবর্তে হাজত পূরণের জন্য বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত পন্থাগুলো অবলম্বন করা কর্তব্য। যেমন:
১. আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ওসিলায় এবং বিশেষ করে ইসমে আজমের মাধ্যমে দোয়া করা।
২. অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পাঠ করা।
৩. অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা।
৪. সিজদা ও শেষ তাশাহহুদে বেশি বেশি দোয়া করা।
৫. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত নেক আমলের ওসিলা ধরে দোয়া করা।
৬. দোয়া কবুলের নির্ধারিত সময় ও সুযোগগুলো কাজে লাগানো (যেমন: রাতের শেষ প্রহর, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় এবং জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্ত ইত্যাদি)।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: